জয়সেনা পুরোহিতদের উদ্দেশ্যে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, তোমরা না মহারাজকে আক্রমণের শুভলগ্ন বলেছিলে? বলেছিলে মহারাজের বিজয় নিশ্চিত?
হা, রাজকুমার; আমরা তাই বলেছিলাম।
কোথায় গেল তোমাদের ভবিষ্যত বাণী? তোমরা কি শোননি, মহারাজ শুধু পরাজিত হননি, তিনি নিহত হয়েছেন! তোমরা এই আশা করতে পারো এর পরও আমি তোমাদের জীবিত ছেড়ে দেবো?
রাজকুমারের যদি এটাই নির্দেশ হয়ে থাকে তবে আমাদের মরণে আপত্তি নেই। তবে আমাদের মাথা তরবারীর আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করার আগে শুনে নিন, মহারাজের ওপর দেবদেবীদের অভিশাপ পড়েছিল। এই অভিশাপ আমাদের সবার ওপর পড়বে। আমাদের মন্দিরগুলো মুসলমানদের আস্তাবলে পরিণত হবে।
কি সেই অভিশাপ? কেন মহারাজের ওপর দেবদেবীদের অভিশাপ পড়ল?
একই মায়ের উদরে জন্মগ্রহণকারী নারী আর পুরুষে কখনো বিয়ে হতে পারে না, রাজকুমার! মহারাজ আপন সহোদরা বোনকে বিয়ে করে বিবি বানিয়ে রেখেছিলেন, বলল প্রধান পুরোহিত। কিন্তু তিনি তো বোনের সাথে ঘর সংসার করতেন না? পুরোহিত কিছু বলার আগেই আড়াল থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠ। “হ্যাঁ, আমরা কখনো স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করিনি। সবাই নারীকন্ঠের দিকে উৎসুক হয়ে তাকানোর আগেই দৃশ্যপটে এসে দাঁড়ালো মায়ারাণী। আড়াল থেকে মায়াই বলেছিল একথা। আমরা কখনো স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘরসংসার করিনি। আবারো স্বগতোক্তি করল রাণী। তবে আমার ভাই আমার জীবন যৌবন আশা আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আমার ভাই এজন্য আমাকে স্ত্রী বানিয়ে রেখেছিল, আমার যদি আর কারো সাথে বিয়ে হয় তাহলে সে ক্ষমতা দখল করে নেবে আর তাকে বনবাসে যেতে হবে।
তোমাদের মতো ঠাকুর পণ্ডিতরাই তার মধ্যে এই সংশয় জন্ম দিয়েছিল। এর চেয়ে কি আমাকে বলী দিয়ে দেয়া বেশি ভালো ছিল না? মন্দিরে আমাকে বলী দিয়ে আমার রক্ত দিয়ে কৃষ্ণ মাতার চরণ ধুয়ে দেয়া কি বেশি ভালো হতো না? তা না করে আমার ভাই বিনা ছুরি বল্পমে আমার যৌবনের সব আশা আকাংখা স্বপ্ন-সাধ, চাওয়া-পাওয়া তিলে তিলে হত্যা করেছে। আর তোমাদের মতো ধর্মের ঠিকাদাররা এমন কাজ থেকে মহারাজকে বিরত রাখার কোন চেষ্টাই করনি। মহারাজ তার রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আমার যৌবনকে বলী দিয়েছেন, কিন্তু তাতেও তো তার রাজত্ব টিকল না। হ্যাঁ, একথাই আমরা রাজকুমারকে বলতে চাচ্ছিলাম, যে কথা রাণী বলল, এটা দেবতার অভিশাপে হয়েছে, এই অভিশাপে মহারাজের রাজত্ব ধ্বংস হয়ে গেছে।
এখন তাহলে কি হবে? আমাদের কি এর পরিণতিতে কোন বলীদান করতে হবে? পুরোহিতের কাছে জানতে চাইলো রাজকুমার জয়সেনা। “না, এসবই মিথ্যা, এরই মধ্যে কয়েকজন নিরপরাধ কুমারীকে বলী দেয়া হয়েছে।” আর কোন কুমারী বলী দেয়া হবে না। চিকার করে বলল রাণী।
রাণী! রাণীকে একদিকে ঠেলে দিয়ে মহারাজের মতো গর্জে উঠল জয়সেনা। মরা এবং মারা আমাদের কাজ। তুমি তো একজন অবলা নারী মাত্র, এখানে তোমার কোন হুকুম মানা হবে না।
এখন আর কারোরই হুকুম মানা হবে না। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল রাণী। মহারাজের মৃত্যুর পর আমিই রাণী, আমিই তার স্থলাভিষিক্ত। আমার তরবারী তোমার মাথা বিচ্ছিন্ন করার আগে এখান থেকে চলে যাও রাণী! নির্দেশের স্বরে বলল জয়সেনা। তার দেহরক্ষীদের বলল, এখান থেকে ওকে সরিয়ে নাও, এ পাগল হয়ে গেছে। দু’তিন জন লোক ঝাপটে ধরে রাণীকে টেনে হেঁচড়ে মন্দিরের বাইরে নিয়ে গেল, আর তার চিৎকার শোনা গেল।
জয়সেনা যখন মায়ারাণীর মাথা ছিন্ন করার হুমকি দিচ্ছিল, বিন কাসিম তখন রাওয়া দুর্গে মালে গনীমত পর্যবেক্ষণ করছিলেন। রাওয়া দুর্গে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিন কাসিমের হস্তগত হলো। তন্মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজা দাহিরের এক তরুণী ভাগ্নি, আর রাজার ছিন্ন মস্তক। বিন কাসিমের নির্দেশে মালে গণীমতের এক পঞ্চমাংশ আলাদা করা হলো খেলাফতের জন্য। বিপুল পরিমাণ সোনাদানাসহ রাজা দাহিরের ছিন্নমস্তক ও রাজার ভাগ্নিকেও খেলাফতের অংশে রাখা হলো। খেলাফতের গোটা অংশ বিন কাসিম আলাদা করে কাব বিন মুখারিকের কাছে সোপর্দ করলেন।
ইবনে মুখারিক! খেলাফতের বদলে এই সম্পদ হাজ্জাজ বিন ইউসুফের হাতে সোপর্দ করবে এবং তাকে আমার এই পয়গাম দেবে। বিন কাসিম রাজা দাহিরকে পরাজয়ের পর হাজ্জাজের কাছে যে ঐতিহাসিক পয়গাম দিয়েছিলেন তা ছিল এই ও
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম খাদেমুল ইসলাম মুহাম্মদ বিন কাসিমের পক্ষ থেকে ইরাকের শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নামে
আসসালামু আলাইকুম
আল্লাহ তাআলার রহমত মদদ এবং আপনার দিক নির্দেশনায় সিন্ধু অঞ্চলের কেউটে সাপের মাথা কেটে দেয়া হয়েছে, ইসলামের জঘন্যতম শত্রু আরব জাহানকে পদানত করে কাবা ঘরে মূর্তি স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর রাজা দাহিরের ছিন্ন মস্তক আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং দাহিরের এক ভাগ্নি যে হিন্দুস্তানের রূপ সৌন্দর্যের প্রতীক আপনার কাছে পেশ করা হলো। এটি সেই জালেম রাজার মাথা যে আমাদের নিরপরাধ নারী-শিশু ও হজ্জযাত্রীদেরকে ডাভেলের বন্দিশালায় আটকে রেখেছিল…।
আপনি যেসব আয়াত পাঠের কথা বার বার বলতেন, আমি আপনার নির্দেশ মতো সবসময়ই ঐগুলো পাঠ করি। আমরা সব সময় আল্লাহর রহমতের জন্য মোনাজাত করি, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহর রহমতেই আমরা রাজা দাহিরকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেছি। দাহিরের ছেলে জয়সেনা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে গেছে। … এ মুহূর্তে আমি রাওয়া দুর্গে অবস্থান করছি। এখানকার সাধারণ লোকদের আমরা ক্ষমা ঘোষণা করেছি। কিন্তু যারা বিদ্রোহের পায়তারা করছিল তাদেরকে চিরদিনের জন্যে খতম করে দিয়েছি। ব্রাহ্মণবাদের দিকে অভিযান চালানোর জন্য আপনার অনুমতি চাচ্ছি। কারণ দাহিরের ছেলে জয়সেনা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। সে আমাদের মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রাহ্মণাবাদ যাওয়ার পথে আরো দুটি দুর্গ রয়েছে। এগুলোতে হিন্দু সৈন্য রয়েছে ওরা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে এজন্য এগুলো দখল করে নিতে হবে।
