বিন কাসিম যখন সিন্ধু নদীর পূর্বপাড়ের প্রায় সব দুর্গ একেরপর এক কব্জা করে নিলেন, তখন থেকেই হিন্দুদের মধ্যে বিন কাসিমের ভয় স্থায়ী হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবে বিন কাসিম যখন বিজয়ী বেশে কোন দুর্গে প্রবেশ করতেন তখন সেখানকার অধিবাসীদের মন থেকে বিন কাসিমের আতঙ্ক দূর হয়ে যেতো। তারা বুঝতে পারতো অমুসলিম রাজা মহারাজাদের মতো সামরিক বেসামরিক নির্বিশেষে সকল প্রতিপক্ষের লোকদের নির্বিচারে হত্যা করতেন না বিন কাসিম। তিনি কোথাও জনগণের সহায় সম্পদ লুট করতেন না।
বিজিত এলাকায় প্রবেশ করার সাথে সাথে সেখানকার সাধারণ অধিবাসীদের জীবন সম্পদ ও মানসম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধান করতেন তিনি। তার কোন সৈনিকের পক্ষে সাহস হতো না বিজিত অঞ্চলের কোন অবলা নারী বা তরুণির গায়ে হাত দেয়ার।
হিন্দু ঐতিহাসিকরা অভিযোগ করেছেন যে, বিন কাসিম ছিলেন খুবই নির্মম তিনি কাউকে ক্ষমা করতেন না। কথাটি আংশিক সত্য। তিনি চিহ্নিত অপরাধী, কুচক্রি, বিনা কারণে রক্তপাত ও সংঘর্ষকারীদের ক্ষমা করতেন না। যেসব হিন্দু শাসক ও সৈন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উস্কানী দিতো, যেসব হিন্দু ঠাকুর পুরোহিত ও পণ্ডিত সাধারণ নাগরিকদেরকে মুসলমানদের ব্যাপারে কুৎসা রটনা করে ভয় দেখাতো, লড়াইয়ের জন্য প্ররোচিত করত কিংবা বিদ্রোহ করত এদের তিনি ক্ষমা করতেন না। চক্রান্তকারী ও জিঘাংসাপরায়ণদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতেন। শত্রুপক্ষের নেতাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর কিন্তু সাধারণ অধিবাসী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের প্রতি তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করতেন। সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতেন জননিরাপত্তা। অবশ্য এটা শুধু বিন কাসিমের অনুসৃত নীতিই ছিল না। নিরপরাধ নাগরিকদের জানমাল ইজ্জত সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধান ইসলামের সকল মুসলিম বিজয়ীরাই করতেন।
এটা মুসলিম বিজয়ীদের জন্য অলিখিত আইনে পরিণত হয়েছিল। নিরপরাধ মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টিকে তারা আল্লাহর নির্দেশ হিসাবে গণ্য করতেন।
বিন কাসিমের প্রজা হিতৈষী নীতির ফলে হিন্দুস্তানের পরিস্থিতি এই হলো যে, যখনই তিনি কোন দুর্গে দু’চার দিন কাটাতেন দলে দলে হিন্দু লোকেরা এসে তাঁর কাছে ইসলামে দীক্ষা নিতো।
রাজা দাহিরের মরদেহ থেকে মাথা ছিন্ন করে বিন কাসিম যখন রাওয়া দুর্গে প্রবেশ করলেন, তখন পূর্ব থেকেই এই দুর্গে নিয়োজিত তার গোয়েন্দারা তাকে জানাল, এখানে দাহিরের কয়েকজন উচ্চ পদস্থ সেনাকর্মকর্তা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসা সৈন্যদেরকে পুনর্বার আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করছে। এদের কয়েকজন হিন্দু নাগরিকদের প্ররোচনা দিচ্ছে, তারা যেন আরবদের মোকাবেলায় তাদের সাথে যোগ দেয়। এদের মধ্যে দু’জন সেনাপতি এমন রয়েছে, যারা এখানে পালিয়ে আসা জয়সেনাকে এখানে না থেকে ব্রাহ্মণাবাদ গিয়ে পুনর্বার প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। ব্রাহ্মণাবাদ থেকে কয়েকজন ঠাকুরও এ লক্ষেই এখানে এসেছে। বিন কাসিমের গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী অভিযুক্ত হিন্দু সেনাকর্মকর্তা, ঠাকুর, পুরোহিত ও পণ্ডিতদের ধরে এনে এক জায়গা জড়ো
করলেন। তিনি দুর্গের অধিবাসীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে যারা বিদ্রোহ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সাধারণ নাগরিকদের প্ররোচনা দিচ্ছিল তাদের সবাইকে গ্রেফতার করলেন। লোকদের তথ্যে কিছু সংখ্যক বেসামরিক হিন্দু লোকও ধরা পড়ল। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলো বিন কাসিম এদের সবাইকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, ইতিহাসের ক্ষণজন্মা অল্প বয়স্ক সেনাপতি বেসামরিক পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের ওপর কোন ধরনের আক্রমণ করতেন না। কারণ সমাজের স্বাভাবিকতা এরাই বজায় রাখত। কৃষক, মজুর, জেলে, তাঁতী ব্যবসায়ীদের চলার গতি স্বাভাবিক না থাকলে সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন বাধাগ্রস্ত হবে, ভেঙে পড়বে সমাজের স্থিতিশীলতা। ফলে পেশাজীবী হত্যা না করার ব্যাপারে তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল। প্রমাণিত কোন অপরাধ ছাড়া তিনি কোন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতেন না।
রাজা দাহিরের নিহত হওয়ার ফলে ব্রাহ্মণাবাদ পর্যন্ত বিন কাসিমের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। দাহির পুত্র জয়সেনা দাহির বাহিনীর কয়েকজন উর্ধতন সেনা কর্মকর্তা, কয়েকজন রাজ দরবারী আর কিছুসংখ্যক বনেদী ঠাকুর রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে ব্রাহ্মণাবাদ আশ্রয় নিলো। জীবিতাবস্থায় রাজা দাহির তার ছেলে জয়সেনাকে গর্ব করে বলতো বাঘ। কিন্তু দাহিরের সেই বাঘ তার বাবার মৃতদেহ রণাঙ্গনে ফেলে শিয়ালের মতো রণাঙ্গন থেকে ব্রাহ্মণাবাদ পালিয়ে গেল। রাজা দাহিরের রাজকীয় সৈন্যরা দেখতে পেল, দাহিরের ব্যাঘপুত্রধন বাবার মরদেহ ফেলে রেখে রণাঙ্গন থেকে জীবন নিয়ে পালিয়েছে। এতে তাদের মধ্যে মুসলমানদের আতঙ্ক আরো গভীর হলো।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, শোচনীয় পরাজয় ও বাহাদুর পিতার করুণ মৃত্যুতে জয়সেনার মাথা ঠিক ছিল না। ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গে পৌছার পর সে সর্বাগ্রে সেখানকার প্রধান মন্দিরে হাজির হলো। সেখানে গিয়ে মন্দিরে তাদের পূজনীয় প্রধান পুরোহিতকে দেখে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাতেই পুরোহিত তার প্রতি দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে এলো।
