দশমীর আলোকিত চাঁদনী রাত। কিন্তু গোটা রণাঙ্গন ছিল ধুলায় অন্ধকার। সারা দিনের তুমুল যুদ্ধের কারণে গোটা এলাকা ধূলায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। একশ হাত দূরের মানুষকেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। শেষপর্যায়ে মারাত্মকভাবে আরব বাহিনীর কাছে পর্যদস্ত হয়ে পড়েছিল রাজার বাহিনী। আর কাটা পড়েছিল কলাগাছের মতো। যেসব হিন্দু সৈন্য প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিল এরা রাওয়া দুর্গে আশ্রয় নেয়ার জন্যে ওদিকে পালাতে শুরু করল। অবস্থা আন্দাজ করতে পেরে বিন কাসিম তার কয়েকজন কমান্ডার ও সিপাহীদের নির্দেশ দিলেন, নিজ নিজ ইউনিট নিয়ে তোমরাও রাওয়া দুর্গে ঢুকে পড়। নয়তো পালিয়ে যাওয়া সৈন্যরা দুর্গবন্দি হয়ে শক্তি সঞ্চয় করলে আমাদেরকে আরেকটি লড়াই করতে হবে।
নির্দেশ পেয়ে বিন কাসিমের সৈন্যদের কয়েকটি ইউনিট উর্ধশ্বাসে ঘোড়া হাঁকিয়ে রাওয়া দুর্গে ঢুকে পড়ল। পালিয়ে যাওয়া সৈন্যদের প্রবেশের সুবিধার
জন্য দুর্গের প্রধান ফটক খোলা ছিল। তাতে আরব যোদ্ধাদের আর প্রবেশে বেগ পেতে হলো না। তাছাড়া রাজার পরাজয়ের কারণে কে আরব আর কে সিন্ধি এ খবর নেয়ার মতো কোন কর্তৃপক্ষ দুর্গফটকে ছিল না। আরব যোদ্ধারা দুর্গে প্রবেশ করেই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিল।
সকাল হতেই বিন কাসিম একদল সৈন্য নিয়ে রাওয়া দুর্গে প্রবেশ করলেন। তখনও তিনি রাজার মৃত্যুর খবর জানতেন না। তিনি দুর্গে প্রবেশ করেই নির্দেশ দিলেন, রাজা দাহির কোথায় আছে? তার কি পরিণতি হয়েছে? এ খবর দ্রুত সংগ্রহ কর। গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে স্বাভাবিক ভাবেই এ তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব শা’বান ছাকাফীর কাঁধে বর্তায়। বিন কাসিমের নির্দেশের আগেই তিনি জেনে নিয়েছিলেন রাতেই ঝিলের পাড়ে আরবদের হাতে নিহত হয়েছে দাহির।
সকালবেলায় যখন সৈন্যরা রাজার খোঁজে ঝিলের পাড়ে উপস্থিত হলো, তখন কোথাও রাজার মরদেহ খুঁজে পেল না। ব্যাপক খোজ খবর নেয়ার পর কেবল একজন জানালো, রাতের বেলায় প্রধান পুরোহিতকে এদিকে আসতে দেখা গেছে।
সাথে সাথে শা’বান ছাকাফী প্রধান পুরোহিতকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন, রাতের অন্ধকারে যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় তুমি ঝিলের পাড়ে কেন গিয়েছিলে?
আপনাদের মহানুভবতার বহু কাহিনী আমি শুনেছি। আমি আপনাদের কাছে সত্য প্রকাশ করে দেবো কিন্তু বিনিময়ে আমার স্ত্রী সন্তানও জীবনের নিরাপত্তা চাই আমি।
‘তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হলো’ বললেন ছাকাফী। কিন্তু বলো, কি ছিল সেখানে? মৃত্যুর সাথে সাথেই আমার কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছিল, মহারাজা ঝিলের পাড়ে নিহত হয়েছেন, বলল পুরোহিত। হিন্দু সৈন্যরা আমার কাছে জানতে চাইলে রাজার মরদেহ কি ভাবে সৎকার করা হবে? আপনি হয়তো জানেন, আমরা মৃত্যুর পর মরদেহ জ্বালিয়ে দেই।
তিনি তো আর সাধারণ কোন লোক ছিলেন না। সাধারণ কোন প্রজার মতো তো আর তার মরদেহ সতকার করা যায় না। কিন্তু তখনো আশেপাশে আপনার সৈন্যরা বিদ্যমান ছিল। এমতাবস্থায় আমি তাদের বললাম, রাজার
মরদেহ কাদায় পুঁতে ফেলো। মুসলমানরা এখান থেকে চলে গেলে পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদায় মহারাজের মরদেহ সতকার করতে হবে।…. এখন আসুন, দেখতে চাইলে আপনাদেরকে মহারাজের মরদেহ দেখিয়ে দিই। পুরোহিতের লাশ গুম করে ফেলা এবং তথ্য উদঘাটনের ব্যাপারটি বিন কাসিমকে অবহিত করলেন শাবান ছাকাফী। বিন কাসিম নিজেই চিহ্নিত শত্রুর মরদেহ দেখার জন্য অকুস্থলে হাজির হলেন এবং সৈনিকদেরকে কাদা থেকে রাজার মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ দিলেন।
রাজা দাহিরের চেহারা আঘাতে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া মাথাও কেটে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ফলে সহজে রাজাকে সনাক্ত করা যাচ্ছিল না। রাজার একান্ত দুই সেবিকা তরুণীকে অকুস্থলে হাজির করলে তারা রাজার মরদেহ শনাক্ত ও নিশ্চিত করল।
‘রাজার গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। ওর ছিন্ন মাথা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পাঠানো হবে।
বিন কাসিমের নির্দেশে দেহ থেকে রাজা দাহিরের মস্তক ছিন্ন করে ফেলা হলো। দাহিরের পুত্র জয়সেনা কোথায়? পুরোহিতেকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। মুসলমানদের প্রবল আক্রমণ শুরু হতেই রণাঙ্গন ত্যাগ করেছিল সে, বলল পুরোহিত। সে হয়তো এখন ব্রাহ্মণাবাদ পৌছে গেছে। পরাজিত পিতার ছিন্ন মস্তক বিজয়ী বিন কাসিম যখন হাজ্জাজের কাছে পৌছানোর ব্যবস্থা করলেন, নিহত রাজার পুত্র জয়সেনা তখন ব্রাহ্মণবাদ পৌছে বিন কাসিমের অগ্রাভিযান প্রতিরোধের চেষ্টায় লিপ্ত হলো।
১০. রক্তে রঞ্জিত হয়ে
দুজন পাঠানো হলো রক্তে রঞ্জিত হয়ে একজন ফিরে এলো
হিন্দুদের জন্য মুহাম্মদ বিন কাসিম এক জীবন্ত আতঙ্কে পরিণত হলেন। এক ইংরেজ ঐতিহাসিক লিখেছেন, সাপ যখন কোন ইদুরকে পাকড়াও করতে উদ্যত হয় তখন ভয়ে আতঙ্কে ইঁদুর পালানোর শক্তিও হারিয়ে ফেলে। বিন কাসিমের একেরপর এক বিজয়ে হিন্দুদের মধ্যেও এমন আতঙ্ক দেখা দিলো। রণাঙ্গন থেকে যেসব হিন্দুসেনা পালিয়ে গিয়েছিল এরা পুনর্বার আক্রমণের আর সাহস পাচ্ছিল না। যখনই খবর পৌছত বিন কাসিম কোন দুর্গ অবরোধ করতে আসছেন, তখন সেই দুর্গের হিন্দু সৈন্যরা প্রতিরোধ কৌশল ভুলে যেত। দুর্গশাসকরা দুর্গের বাইরে বিন কাসিমকে প্রতিরোধ করার কোন কৌশলের কথাই ভাবতে পারতো না। সৈন্যরা ভয় আতঙ্কে জড়সড় হয়ে পড়ত। আর সাধারণ হিন্দুদের অবস্থা হতো আরো শোচনীয়।
