বিন কাসিমের এই চিৎকারে মুসলিম সৈন্যরা সম্বিত ফিরে পেল। কমান্ডার ও সেনাপতিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সৈন্যদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে একসাথে জড়ো করল এবং কিছুটা পিছিয়ে এলো। মুসলমানদের কোথাও থেকে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বিন কাসিমের সহযোদ্ধারা যখন পিছিয়ে এসে পুনর্বার আঘাত করল তাতে মুকু তার পাঁচ’শ যোদ্ধা নিয়ে তাদের সাথে শরীক হলো। এবার প্রচণ্ড ও চূড়ান্ত আঘাত হানল আরব বাহিনী।
চূড়ান্ত লড়াইয়ে জেতার জন্য বিন কাসিম দুটি হাতিয়ার ব্যবহার করলেন। সাধারণত মুখোমুখি সংঘর্ষে এই হাতিয়ার ব্যবহার করা হতো না। বিন কাসিম নির্দেশ দিলেন, ছোট ছোট মিনজানিক থেকে শত্রুদের হাতিগুলোর ওপর পাথর নিক্ষেপ করে। এদের হাওদাগুলো গুড়িয়ে দাও।
পিছন থেকে একদল সৈন্য ছোট মিনজানিকগুলো এগিয়ে এনে পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরাই চিৎকার করতে শুরু করল পাথর নিক্ষেপ বন্ধ কর। কারণ নিক্ষিপ্ত পাথরে মুসলিম সৈন্যরাও ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। যেহেতু লড়াই ছিল প্রচণ্ড এজন্য হাতিগুলো ছিল ধাবমানও অস্থির। এমতাবস্থায় লক্ষ্যভেদ করা ছিল মুশকিল। বিন কাসিম সাথে সাথেই তার এই ভুল বুঝতে পেরে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু এই পাথর নিক্ষেপের ইতিবাচক ফল হলো, পাথর নিক্ষিপ্ত হতে দেখেই হিন্দু সৈন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ভর করল। কারণ তারা জানত এই পাথর তাদের শত শত বছর ধরে অজেয় দুর্গ ও পূজণীয় মন্দির ডাভেল ধ্বংস করে দিয়েছে। যেখানেই মুসলমানরা পাথর ছুড়েছে সেখানে হিন্দুরা টিকতে পারেনি।
আরবদের মরণপণ আক্রমণে বেশকিছু হাতি মারাত্মকভাবে জখমী হয়ে বিকটু আওয়াজে চিৎকার করে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করল। এসব হাতির পক্ষে তখন আপনপর পার্থক্য করার ক্ষমতা ছিলনা। এমতাবস্থায় সবগুলো হাতিকে বেকার করে দেয়ার জন্য বিন কাসিম এগুলোর ওপর অগ্নিতীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। আরব তীরন্দাজরা বিপুল উৎসাহে শত্রুপক্ষের হাতিকে লক্ষ্য করে অগ্নিবাহী তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। কয়েকটি তীর ছুড়ার পর একটি হাতির হাওদায় আগুন ধরে গেল। আগুন থেকে বাঁচার জন্য ওপরে দাঁড়ানো তীরন্দাজ বর্শাধারী ও মাহুতরা হাতির ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ল। আরব সৈন্যরা আহত হাতিগুলোকে তরবারী ও
বর্শা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। তারা কোন হাতিকে বাগে আনার কোন চেষ্টাই করেনি। কারণ আরবদের দৃষ্টিতে লড়াইয়ে হাতি কোন কার্যকর বাহন বলে মনে হতো না।
এ পর্যায়ে হিন্দু বাহিনী জীবন নিয়ে পালানোর জন্যে আত্মরক্ষামূলক লড়াই করছিল। তারা চেষ্টা করছিল কোন মতে পশ্চাদ্ধাবন করে যুদ্ধের ইতি টানতে। কিন্তু হিন্দুদের পশ্চাদাবন আত্মহুতিতে পরিণত হলো। পরিস্থিতি পরিণতির দিকে যেতে দেখে রাজা দাহির তার মাহুতকে বলল, আমার হাতিটিকে মূল রণাঙ্গনের ভিতরে নিয়ে যাও। এপর্যায়ে রাজা দাহির নিজে জীবন মৃত্যুর লড়াইয়ে লিপ্ত হলো। বিদ্যুৎগতিতে সে ডানে-বামে তার বিশেষ তীর বর্ষণ করত শুরু করল, সেই সাথে যেখানে বর্শা বল্লমের প্রয়োজন বোধ করছিল তাই ব্যবহার করছিল। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাজা দাহির তখন বেপরোয়া। মেশিনের মতো কাজ করছিল তার দেহ। চাকার মতো চতুর্দিকে ঘুরছিল সে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো তীর বর্শা নিক্ষেপে লিপ্ত ছিল রাজার দু’হাত। তার হাওদায় দাঁড়ানো দুই সুন্দরী তরুণী পানপাত্রে রাজাকে শরাব দিচ্ছিল কিন্তু অতি সন্তরণশীল হাতির ঝাকুনী সামলাতে না পেরে তরুণী দু’জন পানপাত্র নিয়েই একে অন্যের ওপর হুমড়ি খেয়ে পরছিল। রাজা দাহিরের তখন এদের অবস্থা তাকিয়ে দেখার ফুরসত ছিল না।
একপর্যায়ে বিন কাসিমের তীরন্দাজরা রাজার হাতি লক্ষ করে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। কারণ তখন দৃশ্যত রাজা একাই আক্রমণাত্মক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক অগ্নিতীর দাহিরের হাওদায় আগুন ধরিয়ে দিল। রাজার হাতির হাওদা ছিল দামী রেশমী কাপড়ে আবৃত। তার হাতির দেহ ছিল হাটু পর্যন্ত রেশমী কাপড়ে ঢাকা। মুহূর্তের মধ্যে হাতির সারা গায়ের রেশমী কাপড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আগুন থেকে বাঁচার জন্য মাহুত লাফিয়ে মাটিতে পড়ল। আর তরুণী দু’টি আর্তচিৎকার শুরু করে দিল। কারণ ওদের কাপড়েও আগুন ধরে গেছে। নির্বাক দাহির যেন নিজেকে জ্বালিয়ে দিতেই প্রস্তুত। সে কাল বিলম্ব না করে দুই তরুণীকে ধরে মাটিতে ছুড়ে মারল। দুই মুসলিম যোদ্ধা দুই তরুণীকে ধরে মুসলিম শিবিরের নিরাপত্তা জোনে পৌছে দিল। ওখানকার সেবিকা মহিলা ওদের ধরে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিল।
রাজার হাতির হাওদা তখন পুরোমাত্রায় জ্বলে উঠেছে। আগুন থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য হাতি অস্থির হয়ে উঠল। পাশেই ছিল একটা ঝিলের মতো জলাশয়। জ্বলন্ত হাতি রাজাকে পিঠে নিয়েই দৌড়ে নেমে গেল ঝিলে। অগ্নিদগ্ধ হাতি পা ভাঁজ করে পানিতে শরীর ডুবিয়ে দিতে চেষ্টা করল আর কাঁটা শুঁড় দিয়ে সারা গায়ে পানি ছিটিয়ে দিতে লাগল।
পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন ডুবে গেছে। রাজা দাহির অবস্থা বেগতিক দেখে হাতির ওপর থেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাতরে ঝিলের তীরে পৌছাল। রাজার হাতিকে অনুসরণ করে কয়েক আরব যোদ্ধা ঝিলের তীরে পৌছে গেল। রাজা তীরে উঠতেই তাকে ঘিরে ফেলল আরব যোদ্ধারা। দাহির তরবারী বের করে একাই কয়েক জনের সাথে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হলো। মরণ ত্যাগী রাজা নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয় প্রতিশোধ স্পৃহায় একজনকে ধরাশায়ী করেই নিজের জীবন দিতে চেষ্টা করল কিন্তু আরবযোদ্ধারা তাকে আর সেই সুযোগ দিলো না। কিছুক্ষণ রাজাকে খেলিয়ে এক পর্যায়ে এক যোদ্ধা পিছন দিক থেকে সজোরে রাজার ঘাড়ে আঘাত হানল, কেটে গেল দাহিরের গর্দান। অমিত তেজস্বী এই আরবযোদ্ধার নাম ছিল কাসিম বিন ছালাবা। বনী তাঈ’ গোত্রর লোক ছিল ছালাবা।
