জঙ্গি হাতি মোকাবেলার জন্যে বিন কাসিম আলাদা ইউনিট তৈরি করেছিলেন। তাদেরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। রাজা দাহিরের হাতিকে ঘেরাও করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল নির্দিষ্ট চারজনকে। কিন্তু এই চারজন রণাঙ্গনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে অন্য কোথাও আটকে গিয়েছিল। রাজা দাহিরের হাতিকে তার বিশেষ সৈন্যরা ঘেরাও করে রেখেছিল। এরা ছিল দাহিরের বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী। রাজার একান্ত যোদ্ধারা রাজাকে সাথে পাওয়ার কারণে স্বভাবত উজ্জীবিত ছিল। এরা পরম বিক্রমে মুসলমানদের আক্রমণ করছিল ফলে মুসলিম সৈন্যদের জীবনহানীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এমন সময় শত্রু শিবিরের এক কমান্ডার সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে হাঁক দিল, “সিন্ধু মাতার সন্তানেরা! মহারাজ রণাঙ্গণে এসে গেছেন। তিনি নিজে শত্রুদের কচুকাটা করছেন। চিৎকার শুনে অন্যান্য হিন্দু সৈন্যরাও রাজা দাহিরকে যুদ্ধ করতে দেখে বিপুল উৎসাহে মুসলিম যোদ্ধাদের ওপর হামলে পড়ল। আরব সৈন্যরা এ মুহূর্তে প্রবল আক্রমণের সম্মুখীন হলো।
ঠিক এই মুহূর্তে আরব শিবিরের এক যোদ্ধা সুজা হাবশী ঘোড়া হাঁকিয়ে বিন কাসিমের কাছে এসে বলল, সম্মানিত সেনাপতি! দাহির ও তার হাতিকে জখম করার আগে আমার খাওয়া-পরা সব হারাম। আমি হয় দাহিরের মাথা কেটে নিয়ে আসবে নয়তো শহীদ হয়ে যাব।
বিন কাসিম কিছু বলার আগেই সুজা বিদগতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে দাহিরের একান্ত সৈন্যদের ভীড়ে ঢুকে পড়ল। তখন বিন কাসিমের যোদ্ধারা বীরদর্পে দাহিরের একান্ত বাহিনীর মোকাবেলা করছিল। সুজা হাবশী দাহিরের একান্ত বাহিনীকে এড়িয়ে রাজার হাতির কাছাকাছি পৌছে গেল কিন্তু রাজার হাতির কাছাকাছি হলে তার ঘোড়া ভড়কে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে উল্টো দিকে ছুটল। সুজা আবার ঘোরপথে ঘোড়াকে রাজার হাতির কাছে নিয়ে এলে ঘোড়া হাতির কাছাকাছি যেতেই আবার ঘুরে দৌড় দিল।
এসময় দাহিরের বিশেষ বাহিনীকে মুসলিম যোদ্ধারা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে আর রাজার হাতির প্রতি বিশেষ নজর দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সুজা হাবশীর মাথায় পাগড়ী ছিল। ছুটন্ত অবস্থায়ই সে অগ্রসর হয়ে মাথার পাগড়ী খুলে তার ঘোড়ার চোখ দুটো বেঁধে ফেলল। এবার আর ঘোড়ার পক্ষে কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। ফলে সুজা ইচ্ছামতো ঘোড়াকে ডানে-বামে সামনে পিছনে তাড়িয়ে নিতে পারছিল। এবার সুজা হাবশী পিছন দিক থেকে তার ঘোড়াকে রাজার হাতির কাছে নিয়ে গেল এবং তরবারীর প্রচণ্ড আঘাতে হাতির শুঁড় কেটে ফেলল। হাতির সূঁড় সম্পূর্ণ কাটা সম্ভব না হলেও মারাত্মক জখম হলো। আঘাত করেই সুজা হাবশী হাতির কাছ থেকে দূরে সরে গেল এবং পুনর্বার আঘাত করার জন্য ঘোড়াকে ঘুরাতে লাগল। এমন সময় দাহির ঘুর্ণিয়মান দুধারী তীর সোজা হাবশীর দিকে ছুড়ে মারল। তীরটি গিয়ে পড়ল সুজাহাবশীর গলায়, ধারালো তীরে সুজার গলা কেটে গিয়ে মাথা একদিকে হেলে পড়তেই সে ঘোড়া থেকে লুটিয়ে পড়ল। সেই সাথে তেজস্বী এই আরব যোদ্ধা তার সংকল্প পূর্ণ করে শাহাদাত বরণ করল।
হঠাৎ রণাঙ্গনের পরিস্থিতি বদলে গেল। রাজা দাহিরের চিল্কারে তার সৈন্যরা মুসলিম সেনাদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানল। রাজা দাহির এপর্যন্তই তার দুটি ইউনিটকে রিজার্ভ রেখেছিল। এবার রিজার্ভ সৈন্যদেরও আঘাতের
নির্দেশ দিলো। বস্তুত মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের পরিবেশ বদলে গেল। বিশাল বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে আরব সৈন্যদের মধ্যে বিপর্যয় দেখা দিল। চতুর্মুখী আক্রমণ সামাল দিতে গিয়ে মুসলিম সৈন্যদের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ল। আরব সৈন্যদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপদ ডেকে আনল জঙ্গি হাতিগুলো। তাছাড়া দাহিরের দুধারী তীরও মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করল। বিশৃঙ্খল অবস্থায় মুসলিম সৈন্যরা তাদের কমান্ডার ও সেনাপতিদের কথাও অনুসরণ করতে ব্যর্থ হলো।
এমতাবস্থায় প্রধান সেনাপতি বিন কাসিম উচ্চ আওয়াজে চিৎকার দিয়ে বললেন, ইসলামের সৈনিকরা। তোমাদের প্রধান সেনাপতি বিন কাসিম এখনো জীবিত। আমি তোমাদের সাথেই আছি, তোমাদের সাথেই যুদ্ধ করছি। খবরদার! কেউ বেঈমানদের পিঠ প্রদর্শন করো না। বেঈমানরা। বাঁচার জন্য লড়াই করে। ওরা মৃত্যুকে ভয় পায়, তোমরা ভয়কে মন থেকে তাড়িয়ে দাও। ঐতিহাসিক মাসুমী লিখেছেন, রাজা দেশাইয়ের ছেলে মুকু এততক্ষণ রণাঙ্গনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। সে পাঁচ শতাধিক সহযোদ্ধাকে নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। যুদ্ধের যখন এই অবস্থা তখন মুকু চোখের সামনে নিজের পরিণতি ভেবে সিদ্ধান্ত নিল। এই যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় হলে রাজা দাহিরের হাতে অপমানজনক মৃত্যু বরণ করতে হবে। অতএব দাহিরের অত্যাচার ও মৃত্যু থেকে বাঁচতে হলে মুসলমানদের বিজয়ের কোন বিকল্প নেই। কাল বিলম্ব না করে মুকু তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে দাহিরের সৈন্যদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ল।
মুকুকে পড়তে দেখে বিন কাসিমের মনে সাহস সঞ্চারিত হলো। কারণ তার সামনে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে মুসলিম কমান্ডারদের নাম ধরে ধরে ডাকতে শুরু করলেন। হে আরব যোদ্ধারা! তোমরা পুনর্বার জেগে ওঠো, কোথায় আছে আমার মাদানী, মুহাম্মদ বিন মুসআব? নাবাতা বিন হানযালা? কোথায় গেলে ওয়ারিস বিন আইউব, মুহাম্মদ বিন যিয়াদ, তামীম বিন যায়েদ? তোমরা কোথায়? কোথায় গেলে বন্ধুরা? তোমরা তো ইসলামের রক্ষক! হারমানা তোমাদের জন্যে বেমানান। বুকে সাহস সঞ্চার করো? দলবেধে শত্রুদের আঘাত করো, আল্লাহ তোমাদের মদদ করবেন। সবাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনো, চূড়ান্ত আঘাত হানো। আল্লাহর কসম তোমাদের পালানোর জায়গা নেই।
