কাছে আসছিল ধরাশায়ী হয়ে তড়পাতে শুরু করল এবং দ্বিখণ্ডিত হয়ে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল।
মুসলিম মুজাহিদরা এতোটাই প্রচণ্ড গতিতে আক্রমণ করল যে, হিন্দু সৈন্যরা পর্যস্ত হয়ে গেল। আর বাকীরা পালিয়ে তাদের বাহিনীর দিকে চলে গেল।
এদিকে আবু ফিদা উন্মুক্ত ময়দানে এপাশে ওপাশে ঘোড়া হাঁকিয়ে শত্রুদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছিল। এবার আরো কয়েকজন ঠাকুরের নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদলকে রাজা দাহির মোকাবেলা করার জন্যে পাঠালো। আবু ফিদা তখন আক্ষরিক অর্থেই এক আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। সে দাহিরের যোদ্ধাদেরকে রণাঙ্গনের ঠিক জায়গায় পৌছার অবকাশই দেয়নি। আবু ফিদার এই দুঃসাহসী মোকাবেলা তার সহযোদ্ধাদেরকেও অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করল। সেই সাথে নাবাতা ও তার সহযোদ্ধারাও আবু ফিদার সাহসীকতায় উজ্জীবিত হলো। ফলে রাজা দাহিরের এই সেনাদলেরও পূর্বের সেনাদলের পরিণতি বরণ করতে হলো।
এবার রাজা তৃতীয় সেনাদল পাঠাল। এ দলে আগের তুলনায় সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি। মুসলিম যোদ্ধারা তৃতীয় শত্রু দলকেও পূর্ববর্তী দুই দলের মতো প্রচণ্ড আক্রমণে পর্যদস্ত করল। এই দলের অধিকাংশ শত্রুসেনা আহত বা নিহত হল এবং যারা অক্ষত ছিল তারা পালিয়ে মূল সৈন্যদের কাছে আশ্রয় নিল। নাবাতা ও আবু ফিদার ছোট্ট দুটি ইউনিটের মরণপণ আক্রমণ এবং শত্রু বাহিনীর বিপর্যয়ে মুসলিম শিবির হর্ষধ্বনী ও তকবীরে মুখরিত হয়ে উঠল। মুসলিম সৈন্যদের গণনবিদারী তকবীর ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। পরপর তিনটি সেনাদলের বিপর্যয় হিন্দু সৈন্যদের প্রভাবিত করল। যুদ্ধের ব্যাপারে রাজার কপালে ভাঁজ পড়ল, কারণ আবুফিদা শত্রুসেনাদের বিতারিত ও কচুকাটা করে শত্রু শিবিরের কাছাকাছি পর্যন্ত ঘোড়া হাঁকিয়ে শত্রুদেরকে মোকাবেলার জন্যে বেরিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছিল। আবু ফিদা বলছিল, “সাহস থাকে তো সামনে এসো না ভূতপূজারীরা! এসো না তোমাদের এই মৃত ভাইদের মরদেহগুলো তুলে নিতে? এস না, এসো, সাহস করো। অন্তত এদের ঘোড়াগুলো এসে নিয়ে যাও…।” রাজা দাহিরের, আহত ও নিহত সৈন্যদের ঘোড়াগুলো রণাঙ্গন জুড়ে দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। ছুটন্ত ঘোড়াগুলোকে পাকড়াও করার
জন্যে বিন কাসিম কয়েকজনকে নির্দেশ দিলেন। শত্রুবাহিনীর বেশকিছু ঘোড়া মুসলমানরা পাকড়াও করে পিছনে পাঠিয়ে দিল।
সিন্ধু মাতার সন্তানেরা! এই দুশমনদেরকে দু’দিক থেকে আক্রমণ করে কেটে ফেল। এতোক্ষণ আমি ওদের নিয়ে খেলা করছিলাম ওদের একটু ছাড় দিয়েছিলাম, তোমরা ওদের বাহাদুরী ধূলায় মিশিয়ে দাও। হিন্দু সৈন্যদের উদ্দেশ্যে উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করল দাহির। রাজা দাহিরের কাছে এতো বেশি সৈন্য ছিল যে, ইচ্ছা করলে দু’প্রান্তের সৈন্যদেরকে আরো ছড়িয়ে দিয়ে সে মুসলিম বাহিনীকে ঘেরাও করে নিতে পারতো। রাজার নির্দেশের সাথে সাথে তার দু’প্রান্তের সৈন্য আরো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল এবং অগ্রভাগের সৈন্যরা বিন কাসিমের সৈন্যদের ওপর আক্রমণ করল। বিন কাসিম তার দু’প্রান্তের সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা তোমাদের দুই বাহুকে এতটুকু ছড়িয়ে দাও যাতে শত্রু সৈন্যরা তোমাদের নাগাল না পায়। রাজা দাহিরের সৈন্যদের আক্রমণ ছিল প্রচণ্ড। বহু জায়গা নিয়ে রাজা দাহিরের সৈন্যরা যুদ্ধের সূচনা করল। দাহির তার বিপুল সৈন্যসংখ্যা ও জঙ্গি হাতির শক্তির ওপর আস্থাবান ছিল। রাজা মনে করেছিল এতো বিপুল সৈন্যের পক্ষে ক্ষুদ্র এই বাহিনীকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ফলে সে কোন রণকৌশলের আশ্রয় না নিয়ে সোজা আক্রমণের নির্দেশ দিল। কিন্তু বিপুল শক্তির প্রতিপক্ষ থাকার পরও বিন কাসিম সব সময় তার মেজাজকে স্থির রাখলেন। তিনি সর্বোত্তম রণকৌশল অবলম্বন করে এই বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হলেন। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “হে আরব যোদ্ধারা! বেঈমান সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। ওদের মধ্যে শৃঙ্খলা নেই। তোমরা ওদের ধরে ধরে হত্যা করো।” সেনাপতির চিঙ্কার শুনে মুসলিম যোদ্ধারা আরো উজ্জীবিত হলো, তারা নিজেদের শৃঙ্খলা বজায় রেখে মোকাবেলা করতে শুরু করল। মুসলিম সেনাপতিরা সৈন্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতি কড়া নজর রাখলেন। দু’প্রান্তের দুই বাহুর সেনাপতিরা তাদের বাহুকে এতোটাই বিস্তৃত করে দিলেন যে, হিন্দু সৈন্যরা তাদের নাগাল পেল না। দু’প্রান্তের বিস্তৃতির পর উভয়প্রান্তের যোদ্ধারা শত্রুদের ওপর হামলে পড়ল। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়ে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাজা দাহির অনেকটা বেপরোয়া ভাবেই আক্রমণের নির্দেশ দিল। ফলে দাহিরের পদাতিক
ও অশ্বারোহী উভয় সৈন্য মুসলমানদের আঘাতে ধরাশায়ী হতে লাগল। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রাজা দাহির জঙ্গি হাতিগুলোর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছিল না, কারণ বিশৃঙ্খলার কারণে তার হাতির সামনে তার অশ্বারোহী সৈন্যরা এসে বার বার বাধা সৃষ্টি করছিল। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হলো যে, সুশৃঙ্খল মুসলিম যোদ্ধাদের আক্রমণে টিকতে না পেরে দাহিরের বিশৃঙ্খল সৈন্যরা পিছিয়ে আসতে শুরু করল। এই দৃশ্য ছিল দাহিরের জন্য অসহ্যকর। রাজা দাহির ছিল তার বাহিনীর পিছনে রিজার্ভ বাহিনী পরিবেষ্টিত। চার হাজার সৈন্যের দুটি অশ্বারোহী ইউনিটকে রিজার্ভ রেখেছিল দাহির। রিজার্ভ বাহিনী থেকে আটশ নির্বাচিত সৈন্য নিয়ে রাজা দাহির মূল রণক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হল। দাহিরের রিজার্ভ বাহিনীর প্রতিটি যোদ্ধাই ছিল বর্মধারী। এরা আধুনিক বর্শা ও তরবারী দিয়ে সজ্জিত। সেই সাথে আক্রমণ প্রতিহত করার মতো মজবুত ঢাল ছিল প্রত্যেকের সাথে। রাজা দাহির তার বিশেষ সাদা হাতির ওপর সওয়ার। হাতে অস্বাভাবিক ধরনের ধনুক। যা থেকে দুপাশ ধারালো ঘূর্ণিয়মান তীর নিক্ষেপ করছিল রাজা। এই বিস্ময়কর তীরের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হতে শুরু করল মুসলিম সৈন্যরা।
