এদের হৃদয়ে এসব দেবালয় ও সম্পদের খানার প্রতি ভালোবাসা এতো প্রকট যে এগুলো রক্ষার জন্যে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে তারা প্রস্তুত। এরা আজ ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা করবে। এদের আক্রমণ হবে খুবই ভয়াবহ। তোমাদেরকে প্রচণ্ড মনোবল ও দৃঢ়তা নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। তোমরা আল্লাহর পথে শাহাদাতের আশা। নিয়ে আপন মাতৃভূমি ছেড়ে হিন্দুস্তানে এসেছো। বাতিলের সাথে আজ হক এর সংঘাত। মহান আল্লাহ সত্যের পক্ষে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আমাদের মদদ করবেন। সবসময় আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা করতে থাকো। ভয়, শঙ্কা, দ্বিধা সংকোচ মন থেকে ঝেড়ে ফেলো। মনে রেখো, আমাদের তরবারীগুলো কাফেরদের রক্তপানের জন্যে তৃষ্ণার্ত হয়ে রয়েছে। ওরা আজ আমাদের হাতে চরমভাবে লাঞ্ছিত হবে। তোমার যদি পার্থিব স্বার্থ, যশখ্যাতি ও সম্পদের দিকে তাকাও, তাহলে এগুলোও এই বেঈমানদের কাছ থেকে তোমরা ছিনিয়ে নিতে পারবে। বিজয়ী হলে এই জগতেও তোমরা ঢের সম্পদের অধিকারী হবে আর আখেরাতে আল্লাহ
তাআলা তোমাদেরকে অকল্পনীয় প্রাচুর্য সম্মানে ভূষিত করবেন। মনে রাখবে, যাকে যেখানে দাঁড় করানো হয়েছে এবং তৎপরতা চালানোর যে জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে সেখান থেকে একচুলও এদিক সেদিক হবে না। এমন যেন না
হয় বিশৃঙ্খল হয়ে ডান প্রান্তের লোকেরা বাম বাহুতে আর বাম প্রান্তের লোকেরা ডান প্রান্তে চলে এসেছে এবং মাঝের লোকেরা সামনে সামনের লোকেরা মাঝে চলে গেছে। কারো সাহায্যের প্রয়োজন ছাড়া কেউ আপন জায়গা বদল করবে না।
খুব মনে রাখবে, সৎ ও নেক মানুষেরই বিজয় হয়ে থাকে। যাদের উদ্দেশ্য সৎ আল্লাহর কাছে তারা প্রিয়। লড়াই চলাকালেও মুখে কুরআনের আয়াতের তেলাওয়াত করতে থাকবে এবং সবসময় ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’র যিকির চালু রাখবে।
বিন কাসিমের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর বনীবকর গোত্র ও বনী তামীম গোত্রের দু’জন করে লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল। আল্লাহর কসম! তোমরা এ মুহূর্তে কোন অভিযোগ নিয়ে আসোনি তো? এ সময় অভিযোগ শোনার মুহূর্ত নয়, বললেন বিন কাসিম। “সম্মানিত সেনাপতি। আল্লাহ আপনাকে বিজয় ও মদদ দিন।” বলল আগন্তুকদের একজন। আমরা সবার আগে আমাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্যে আপনার কাছে নিজেদের পেশ করছি। কাফের বাহিনীকে দেখুন, ভয়ানক আতঙ্ক হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ানো। আপনি তাকিয়ে দেখুন, ওদের হাতিয়ার কতো উন্নত। আপনি তাকিয়ে দেখুন, পাহাড়ের মতো বিশালদেহী জঙ্গি হাতি নিয়ে ওরা আমাদের মুখোমুখি। ওদের চেহারা দেখুন! নিজেদের উন্নত সমরায়োজন অস্ত্রশস্ত্র জঙ্গি হাতি এবং বর্ম বল্পমে সজ্জিত হয়ে ওরা বেশ আত্মবিশ্বাসী উৎফুল্ল। আপনি কি আমার গোত্রের লোকদেরকে সর্বাগ্রে আক্রমণ করার অনুমতি দেবেন?
আল্লাহর কসম! হে বনী তামীম ও বনী বকরের যোদ্ধারা। আমি তোমাদের শ্রদ্ধা করি। আমি বিশ্বাস করি তোমরা প্রত্যেকেই জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করবে। তিনি আবার সব সৈন্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আরব যোদ্ধারা। বনি তামীম ও বনি বকর সবার আগে আক্রমনের জন্যে উদ্বেলিত। আমি বিশ্বাস করি তোমরা প্রত্যেকেই শত্রুদের জন্যে মৃত্যুদূতের মতো ঝাপিয়ে পড়তে উদগ্রীব।
এ সময় বনী তামীম ও বনী বকর গোত্রের যোদ্ধারা একযোগে এমন জোরে তকবীর ধ্বনী করল যে, আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। তাদের তকবীর শেষ হতে না হতেই গোটা মুসলিম সৈন্যরা এমন উচ্চ আওয়াজে তকবীর ধ্বনি দিতে শুরু করল যে, আরব সৈন্যদের মধ্যে যাদের মনে কিছুটা দুর্বলতা ছিল তাদের দুর্বলতা প্রচণ্ড উত্তাপে দূর হয়ে গেল। আরব সৈন্যদের ঘোড়াগুলো হ্রেষারব এবং পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে শুরু করল যেন ওগুলোও লড়াইয়ের জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। বিন কাসিম উদ্দীপ্ত সৈন্যদেরকে দু’হাত প্রসারিত করে থামালেন।
তিনি সৈন্যদের উদ্দেশে আবারো বললেন, হে আরব যোদ্ধারা! আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ মুসলমানদের দুটি নেয়ামত দিয়েছেন। প্রথম নেয়ামত আল্লাহর রসূল আর দ্বিতীয় নেয়ামত বান্দাদের ইস্তেগফার কবুল করা। দৃঢ় থেকো, মনের শক্তি অটুট রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকেই দুশমনদের ওপর বিজয়ী করবেন।
বিন কাসিম ঘোড়া হাঁকিয়ে দুই সৈন্যদলের মাঝামাঝি গিয়ে থামলেন এবং উচ্চ আওয়াজে বললেন, সেনাপতি সুলায়মান ও সেনাপতি আবু ফিদা! তোমরা চল্লিশজন করে যোদ্ধা নিয়ে শত্রু সেনাদের মোকাবেলার আহবান করো।
এটা ছিল তখনকার দিনের যুদ্ধের রীতি। মূলযুদ্ধ শুরুর আগে উভয় পক্ষের কিছুসংখ্যক যোদ্ধার মোকাবেলা হতো। আবু ফিদা ছিলেন সদ্য আযাদকৃত গোলাম। তিনি সেনাপতি সুলায়মানের নেতৃত্বে চল্লিশ জন সৈন্য নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে অগ্রসর হয়ে শত্রুসেনাদের অবস্থান থেকে কিছু দূরত্বে দাঁড়িয়ে শত্রু সেনাদেরকে মোকাবেলার জন্যে আহবান জানালেন।
সেনাপতি সুলায়মানের আহবানে রাজা দাহির কয়েকজন ঠাকুরকে কিছুসংখ্যক সৈন্য দিয়ে মোকাবেলার নির্দেশ দিল। রাজা দাহিরের সৈন্যরা মূল সৈন্যদল থেকে কিছুটা এগিয়ে এলেই আবু ফিদা তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল এবং প্রচণ্ড আওয়াজে তকবীর ধ্বনী দিয়ে রণাঙ্গন কাঁপিয়ে দিল। আবু ফিদা শত্রুসেনাদের মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে ঘুরে ওদের পিছনে চলে গেল। একদিকে সুলায়মান আর অপর দিকে আবু ফিদা এমন তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ল যে, শত্রুবাহিনীর যে সৈন্যই তাদের ধারে
