পর দিন ছিল ৯৩ হিজরী সনের ১০ রমযান। বৃহস্পতিবার। মহাভারতের ইতিহাসে সেই দিনটি সোনালী হরফে লিখে রাখার মতো দিন। সেদিন শুরু হয়েছিল ভারতের মাটিতে শিরক ও তৌহিদের মধ্যে চূড়ান্ত লড়াই। রাতে মুসলিম শিবিরে কোন যোদ্ধার পক্ষে সামান্য আরাম করাও সম্ভব হয়নি। সবাইকে বলে দেয়া হলো আগামীকাল হবে চূড়ান্ত লড়াই। কাজেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। তোমরা কি দেখনি, দাহির দূরে হাতির ওপরে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের তামাশা দেখছিল?
সেনা-কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম। দাহির পর্যবেক্ষণ করছিল, সম্মুখ সমরে আমরা কিভাবে যুদ্ধ করি, লড়াই করার ক্ষমতা আমাদের কতটুকু আছে। শেষ মুহূর্তে দাহির হস্তিবাহিনী দিয়ে আঘাত হেনেছিল, সে দেখে নিতে চেয়েছিল, কি ভাবে আমরা হাতির মোকাবেলা করি। চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য সে রমযান মাস পর্যন্ত এজন্য অপেক্ষা করেছে। কারণ রমযান মাসে আমরা দিনের বেলায় রোযা রাখি, পানাহার করি না। ফলে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের থাকবে না…। দেখবে আগামীকালের রণাঙ্গনের পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেহরীর সময়ই বিন কাসিমের সব যোদ্ধারা পানাহার পর্ব সেরে নিল। আহত কোন যোদ্ধাকে তারা রণাঙ্গনের ত্রিসীমায় যেতে দিলো না। সবাইকে রণাঙ্গন থেকে তুলে এনে শিবিরের চিকিৎসা ইউনিটে রেখে দিল। সেখানে যুদ্ধে আসা মহিলারা তাদের সেবাশুশ্রুষা করছিল।
এদিকে বিন কাসিমের কাছে একের পর এক খবর পাঠাচ্ছিল তার গোয়েন্দারা, কখন শত্রুসেনারা কি করছে। রাজা দাহির তার কমান্ডারদের সন্ধ্যাবেলায়ই বলে দিলো আগামীকালই হবে শেষ লড়াই। আগামী কালই হবে বিন কাসিমের জীবনের শেষ দিন। বিন কাসিম বাহিনীর যে সৈনিক বেঁচে থাকবে তার বাকী জীবন দাহিরের গোলামী করেই কাটাতে হবে। তবে সেই গোলামী হবে খুবই ভয়ঙ্কর, কষ্টদায়ক।
আমার সৈন্যদের মধ্যে যে বিন কাসিমের খণ্ডিত মাথা এনে আমার হাতে দেবে সে হবে সৌভাগ্যবান। তাকে আমার রাজ দরবারে বসার জায়গা দেবো এবং চারটি গ্রামের জমিদারী দেবো। সে সেখানে দুর্গ তৈরি করে নিজের মতো করে শাসন কাজ চালাতে পারবে। রাতের দ্বি-প্রহরে মায়ারাণী আবার রাজা দাহিরের তাবুতে চলে এলো। রাণীর চেহারা ছিল অনেকটাই প্রসন্ন কারণ আজকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে দূরে থেকেছিল। রাণী আজও এসে বলছিল, আগামীকালও আপনি যুদ্ধে যাবেন না। নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে সৈন্যদের দিয়ে যুদ্ধ করাবেন। রাজা দাহির মায়াকে আশ্বস্ত করার জন্যে বলল, ঠিক আছে, আমি তাই করব।
পরদিন সকাল বেলায় সিন্ধুতীরের পললভূমি নতুন দৃশ্য নিয়ে হাজির হলো। রাজা দাহিরের গোটা সেনাবাহিনী রণপ্রস্তুতি নিয়ে ময়দানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। রাজা দাহির সকল সৈন্যের মাঝখানে তার রাজকীয় হাতির ওপর সওয়ার। পাশে ছিল দাহিরের পুত্র জয়সেনা। সেদিন রাজা দাহির পূর্ণ রাজকীয় জাকজমক নিয়ে রণাঙ্গনে আভির্ভূত হলো। দাহিরের ডানে-বামে অগ্রপশ্চাতে দশ হাজার বর্মপরিহিত অশ্বারাহী। এই দশ হাজার অশ্বারোহীই আরব বাহিনীর সাথে মোকাবেলার জন্যে যথেষ্ট, তাছাড়াও রাজা দাহিরের বাহিনীতে ছিল ত্রিশ হাজার পদাতিক সৈন্য। রণাঙ্গনে খোদ রাজাকে পেয়ে দাহিরের সৈন্যরা ছিল খুবই উজ্জীবিত।
রাজা দাহিরের সাথে তার হাওদায় দুই সুন্দরী তরুণীও ছিল। তাছাড়া ছিল কয়েকজন বল্লম ও বর্শাধারী সৈন্য এবং বাঁকানো তীর নিক্ষেপকারী তীরন্দাজ। দাহিরের হাতির হাওদাতে আরো ছিল পানপাত্র ভর্তি শরাব। রাজার হাতির দু’পাশে ছিল কয়েকজন অশ্বোরোহী পুরোহিত। বিন কাসিম রাজা দাহিরের সৈন্যদের অবস্থান ও রণপ্রস্তুতি দেখে তার সৈন্যদের কর্মপরিকল্পনা কিছুটা পরিবর্তন করলেন। আল্লাহ প্রদত্ত দূরদর্শিতায় বিন কাসিম শত্রুপক্ষের অভিসন্ধি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর তীরন্দাজ সৈন্যদেরকে তিন ভাগে ভাগ করেনিলেন। সম্ভবত তিনি এটা করেছিলেন শত্রু বাহিনীর বিস্তৃতি তার বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল বলে। প্রতিটি সৈনিককে তিনি পূর্ণ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। প্রত্যেক তীরন্দাজ নিজ নিজ ধনুকে তীর প্রবেশ করিয়ে নিল। বিন কাসিম তার বাহিনীকে পাঁচটি গোত্রীয় সারিতে ভাগ করলেন। এক সারিতে রাখলেন আলাফী গোত্রের যোদ্ধাদের। আরেক সারিতে দাঁড়
করালেন আমীন গোত্রের লোকদেরকে। তৃতীয় সারিতে দাঁড় করালেন বকর বিন ওয়ায়েল গোত্রের যোদ্ধাদের, চতুর্থ সারিতে রাখলেন আবুল কায়েসের . নেতৃত্বাধীন তার গোত্রীয় মুজাহিদদেরকে আর পঞ্চম সারিতে দাঁড় করালেন ইবাদী গোত্রের লোকদেরকে।
সারিবদ্ধভাবে সবাইকে দাঁড় করানোর পর বিন কাসিম তার ঘোড়াকে সৈন্যদের সামনে দিয়ে এপ্রান্ত ওপ্রান্ত দৌড়ালেন। গোটা সৈন্যদের চতুর্দিকে একবার প্রদক্ষিণ করে এসে তিনি সকল সৈন্যদের সামনে মাঝখানে তাঁর ঘোড়া থামালেন।
চূড়ান্ত যুদ্ধের পূর্বমুহুর্তে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সর্বকালের সর্বকনিষ্ট এই মহানায়ক যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেছিলেন তা হুবহু অক্ষরে অক্ষরে আজো ইতিহাসের পাতায় অম্লান। বিন কাসিম বললেন
“হে আরব মায়ের সন্তানেরা। মাটির তৈরি মূর্তি পূজারী সৈন্যদেরকে তোমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছো। এরা শুধু তোমাদের অগ্রাভিযান রোধ করতে আসেনি, এরা আজ আমাদের অস্তিত্ব বিলীন করার সংকল্প নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। এই মুশরিক বেঈমানেরা শুধু তাদের ধর্মরক্ষার জন্যেই যুদ্ধ করতে আসেনি, এরা এসেছে আমাদের আক্রমণ থেকে তাদের সহায়সম্পদ পরিবার পরিজনকে রক্ষা করতে। এরা তাদের দেবালয়, সম্পদের খানা রক্ষার জন্যে জীবন-মরণ প্রতিজ্ঞা করে এসেছে।
