রণাঙ্গনের পরিস্থিতি বর্ণনায় সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য তারিখে মাসুমীতে লেখা হয়েছে, রাজা দাহির প্রত্যক্ষ করছিল তার বিশাল সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় নগন্যসংখ্যক মুসলিম সৈন্যের মধ্যে কোন ধরনের ক্লান্তির ছাপ নেই। বিশাল হস্তিবাহিনী চোখের সামনে থাকার পরও ওদের মধ্যে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা যায় না।
ওরা যখন হামলা করে তখন তাদের তকবীর ধ্বনীতে আকাশ কেঁপে ওঠে, অস্বাভাবিক প্রাণবন্ত ও উচ্ছাস মুসলিম সৈন্যদের আক্রমণে।
রাজা দাহির প্রচণ্ড মোকাবেলায় তার সৈন্যদেরকে পিছনে সরে আসার নির্দেশ দিল, আরব সৈন্যরাও ওদের পিছনে তাড়িয়ে নিতে শুরু করল। বিন কাসিম লক্ষ করলেন, হঠাৎ করে সৈন্যদের পিছিয়ে নেয়ার মধ্যে রাজা দাহিরের কূটচাল রয়েছে। আবেগ তাড়িত হয়ে মুসলিম যোদ্ধারা যখন
য়ে অনেক দূর চলে যাবে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে অগ্রসরমান ইউনিট মূল বাহিনী থেকে, তখন রাজার বাহিনী এদের ঘেরাও করে নিঃশেষ করে ফেলবে। অবস্থা আঁচ করে বিন কাসিম তার অগ্রসরমান ইউনিটকে শত্রুদের তাড়া না করে পিছনে সরে আসার নির্দেশ দিলেন।
এপর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে কোন লড়াই ছিল না, তবে রণাঙ্গন হিন্দু সৈন্যদের মরদেহে ভরে গিয়েছিল। আহত সৈন্যরা আর্তচিৎকার করছিল। আহতদের কেউ কেউ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আবার পড়ে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় উভয় দলের দু’তিনজন করে সৈনিক দৌড়ে রণাঙ্গনে গিয়ে আহত সৈন্যদের তুলে নিয়ে আসছিল। আহত সৈন্যদের তদারকি ও তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসার জন্য বিন কাসিম একটি ভিন্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের হাতে থাকতো পানির পাত্র এবং জরুরী ঔষুধপত্র। এই ইউনিট গঠন করা হয়েছিল যারা কোন না কোন কারণে যুদ্ধের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছিল অথবা স্বভাবতই যারা ছিল সেবা মানসিকতা সম্পন্ন এবং চিকিৎসা বিষয়ে পারদর্শী। বিন কাসিমের চিকিৎসা ও সেবা ইউনিটের সদস্যরা পানির পাত্র নিয়ে রণাঙ্গনে আহতদের চেহারায় পানির ঝাপটা দিয়ে তাদের চেতনা ফিরিয়ে আনতে এবং আহতদের পানি পান করাতো।
হঠাৎ স্বেচ্ছাসেবকদের একজনের প্রতি বিন কাসিমের দৃষ্টি পড়ল। লোকটি তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। বিন কাসিমের মনে হলো পুরুষের পোশাক পরিহিত হলেও লোকটি মনে হয় পুরুষ নয় নারী। নারী না হলেও একেবারে নাদুস নুদুস কিশোর। বিন কাসিম লোকটিকে কাছে ডাকলেন এবং ঘোড়ার পিঠে বসেই গভীর ভাবে লোকটির প্রতি তাকালেন।
আমার দৃষ্টি যদি আমাকে বিভ্রান্ত না করে থাকে তবে আমার মনে হয় তুমি পুরুষ না-নারী, বললেন বিন কাসিম।
হ্যাঁ, সাকিফ গোত্রের কোন চোখ কখনো প্রতারণার শিকার হয় না বিন কাসিম! আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন, আমি নারী। শুধু আমি একা নই, আমার মতো আরো কয়েকজন নারী এখানে স্বেচ্ছাসেবিকা হিসাবে কাজ করছে।
তুমি কি স্বামীর সাথে এসেছ? তোমার ভাইও হয়তো তোমার সাথেই যুদ্ধে এসেছে? পুরুষের বেশধারী সেবিকাকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। বিন কাসিম! বলল মহিলা। মুসলিম বাহিনীতে যুদ্ধরত সবাই আমার ভাই। আমি স্বামীর সাথে এসেছি। আর কোন কথা না বলেই মহিলা তার কাজে চলে গেল। সেই দিনের যুদ্ধে আহতরা ছাড়া আর কোন যোদ্ধা পানি পান করত না। কারণ রোযার মাস হওয়ায় যুদ্ধরত হলেও তাদের কেউই রোযা ত্যাগ করত না।
অবস্থা এমনই জটিল হয়ে গেল যে, বিন কাসিমের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ হলো না, নারীদেরকে রণাঙ্গনে থাকার অনুমতি দেবেন কি-না। কারণ ইত্যবসরে রাজা দাহির তার হস্তিবাহিনীকে আক্রমনের নির্দেশ দিয়ে দিছে। জঙ্গি হাতিগুলো মাতাল অবস্থায় বিকট চিৎকার দিয়ে এগিয়ে আসছিল। হাতির পিঠে শত্রুসেনারা তীর বর্শা ও বল্লম নিয়ে আঘাতের জন্য উদ্যত।
এমতাবস্থায় বিন কাসিমের ইঙ্গিতে সেনাপতি সাঈদ ও আতার ইউনিটের যোদ্ধারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গেল। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হওয়াটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। কয়েকটি ছোট দল মিলে একেকটি হাতিকে ঘেরাও করা ছিল তাদের দায়িত্ব। অশ্বারোহীরা হস্তিবাহিনীর মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের পিছন থেকে অগ্নিবাহী তীর নিক্ষেপকারীরা হাতিকে উদ্দেশ্য করে অগ্নিবাহী তীর ছুড়তে শুরু করল। শত্রুদের জঙ্গি হাতিগুলোকে অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অগ্নিবাহী তীর ছিল কার্যকর হাতিয়ার। হামলা শুরুর সাথে সাথে একটি অগ্নিবাহী তীর এক হাতির পিঠে দাঁড়ানো বল্পমধারী শত্রুসেনার গায়ে আঘাত হানল। সাথে সাথে শত্রুসেনার গায়ে আগুন ধরে গেল। জ্বলন্ত আগুনে সৈন্যটি হাতির হাওদাতে চিল্কার ও লাফালাফি শুরু করলে ওর এক সাথীর গায়েও আগুন ধরে গেল। আগুনের হাত থেকে বাচার জন্যে উভয় সৈনিক হাতির হাওদা থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ল। নীচে পড়ে নিজেদের সামলে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করার আগেই মুসলিম যোদ্ধাদের ধাবমান ঘোড়র পায়ে পিষ্ট হয়ে গেল।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে দিবাকর দিন শেষে তলিয়ে গেল। মাহুতরা তাদের হাতিগুলোকে তখন পিছিয়ে নিতে শুরু করল। তখনকার দিনে দিন শেষে যুদ্ধ।
নিষ্পন্ন থাকলেও লড়াই বন্ধ করে দেয়া হতো। রীতি অনুযায়ী হস্তিবাহিনী হিন্দু শিবিরে ফিরে গেল আর অশ্বারোহী বাহিনী মুসলিম শিবিরে প্রত্যাবর্তন করল। সেদিন তিন চারটি হাতি মারাত্মক আহত হলো। আহত হাতিগুলো নিজ বাহিনীর সৈন্যদের জন্যেই মৃত্যুদূতে পরিণত হলো। বহু সৈন্য হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেল। অবশেষে রাতের অন্ধকার রণাঙ্গনকে কালো পর্দায় ঢেকে দিল। বন্ধ হয়ে গেল মোকাবেলা।
