ভয়ংকর ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করছে সে। দ্রুত বেগে বিছানার ওপর বসা দাহিরের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে রাজার দু’পা জড়িয়ে ধরে মায়ারাণী বলল, যাবেন না মহারাজা কথা দিন, আপনি যুদ্ধক্ষেত্রে যাবেন না।
“আরে বোকা! আমি রণাঙ্গনে না গেলে আমার সৈন্যরা হতোদ্যম হয়ে পড়বে। মুসলিমরা যদি জানতে পারে, সিন্ধুরাজা রণাঙ্গনে আসেনি তাহলে ওরা আমাকে কাপুরুষ মনে করবে।” বলল রাজা দাহির। তুমি কি দেখনি রাণী, আরব বাহিনী কিভাবে আমার রাজ্য দখল করে এগিয়ে আসছে। পণ্ডিতেরা বলেছে, মুসলমানদের যে করেই হোক এখানে ধ্বংস করে দিতে হবে। এদের ধ্বংস করার দায়িত্ব দেবতারা আমার ওপর দিয়েছে। এই পণ্ডিতেরাই তো আমার স্বপ্নের কথা শুনে বলেছে, যে করেই হোক মহারাজকে রণাঙ্গনে যাওয়া থেকে বিরত রাখো। তারা বলেছে, কাউকে পানিতে ডুবতে দেখা ভালো নয়, বলল রাণী।
রাজা দাহির মায়ারাণীকে সাথে নিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল। নানা কথায় রাজা মায়াকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল কিন্তু তাতে রাণী আরো উদ্বেলিত হয়ে উঠল। এক পর্যায়ে রাজা দাহির রাণীকে দুহাতে ধরে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়ে দুই সৈনিককে নির্দেশ দিলো, তোমরা মায়াকে রাওয়া দুর্গের ভিতরে পৌছে দিয়ে আসো।
৯৩ হিজরী সনের ৯ রমযান। রাজা দাহিরের সৈন্যরা ময়দানে রণপ্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। সৈন্যদের সম্মুখ সারিতে জঙ্গী হাতি। সারিবদ্ধ হাতির পিছনে রাজা দাহিরের বিশেষ হাতি দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাজা দাহির রাজকীয় ভাবমূর্তি নিয়ে তার হাতির হাওদার ওপরে দাঁড়ানো। দাহিরের কাছেই তার ছেলে জয়সেনা একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। জঙ্গি হাতিগুলো মাতাল। প্রচণ্ড শব্দে চিৎকার করছে। হাতিগুলো অস্থিরভাবে দু’চার কদম এগুচ্ছে আবার পিছিয়ে আসছে। হাতিগুলোর অস্থিরতা দেখে মনে হচ্ছিল ওরাও যেন টের পেয়ে গেছে, তাদের সামনে অজেয় শত্রু। সব হাতির ওপরে রাজার তীরন্দাজ সৈন্য তীর ধনুক বর্শা বল্লম নিয়ে রণসাজে প্রস্তুত। বিন কাসিম তার সৈন্যদেরকে রাজার সৈন্যদের মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করালেন। তিনি সেনাপতি আবু মাহের হামদানীর ইউনিটকে সর্বাগ্রে হাতির
মুখোমুখি দাঁড় করালেন। হামদানীর ইউনিটের সব যোদ্ধা ছিল আরব সৈন্যদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ লড়াকু ও নির্ভিক। তারেক বিন কাব, মাসউদ কালবী, সালমান আবদী, যিয়াদ বিন জালিদীকে বিন কাসিম তার সাথে রাখলেন।
তার সৈন্যদের ডান বাহুর কমান্ডার নিযুক্ত করলেন যাকওয়ান বিন বকরীকে। আর রিজার্ভ সৈন্যদেরকে নাবাতা বিন হানযালার অধীনে ন্যস্ত করলেন। যুদ্ধ শুরুর আগে বাশার বিন আতিয়া, মুহাম্মদ বিন যিয়াদ মুসআব বিন আব্দুর রহমান এবং খোরম বিন উরওয়া এই চারজনকে ডেকে পাঠালেন। এই চারজন ছিল অস্বাভাবিক পারদর্শিতা ও বীরত্বের অধিকারী। তাদের উদ্দেশ্যে বিন কাসিম বললেন
“বন্ধুগণ! তোমাদের ওপর আমি এমন দায়িত্ব দিচ্ছি, যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ তোমাদেরকে একাজের যোগ্য প্রতিদান দেবেন। কেননা তোমরা আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই ঘর থেকে বেরিয়েছ।”
আমাদের কি করতে হবে আল্লাহর ওয়াস্তে তাই বলুন, সম্মানীত সেনাপতি! বলল এদের একজন! আল্লাহর কসম! আমরা কোন ধরনের প্রতিদান অভিবাদনের তোয়াক্কা না করে আপনার নির্দেশ পালনে দৃঢ়প্রতীজ্ঞ।
রাজা দাহির হবে তোমাদের শিকার তোমরা তার হাতিকে ঘিরে ফেলবে। হাতিকে এমন আঘাত করবে যে ওটি পড়ে যেতে বাধ্য হয়। দাহিরকে জীবিত পাকড়াও করতে চেষ্টা করবে। জীবিত পাকড়াও করা সম্ভব না হলে ওর অঙ্গ কেটে নিয়ে আসবে। সে বহু নিরপরাধ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও আরবকে ধুকে ধুকে মরতে বাধ্য করেছে, ওকে আমি ক্ষমা করতে পারি না।
ঠিক আছে, আপনার নির্দেশ পালন করা হবে সেনাপতি! ইনশাআল্লাহ আমরা আপনার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করব।
বিন কাসিম আবার তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, হে আরব বন্ধুরা! আমি যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে আমার স্থলে মিহরাব বিন সাবিত প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে, সেও যদি শাহাদতবরণ করে তাহলে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে সাঈদ।
যুদ্ধ শুরুর আগমুহূর্তে বিন কাসিমের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি কিছুটা হতাশা সৃষ্টি করল। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, রাজা দাহিরের হাতি সম্মুখ থেকে পিছনে সরে যাচ্ছে। প্রথমে মনে হয়েছিল জায়গা বদল করছে রাজা, কিন্তু পরক্ষণে দেখা গেল শুধু জায়গা বদল নয় একেবারে সকল সৈন্যের পিছনে অবস্থান নিল রাজার হাতি। সেই সাথে হিন্দু বাহিনীর সম্মুখ ভাগের হাতির সারিকেও পিছনে সরিয়ে নিল দাহির।
বিন কাসিম কিছুটা আশা দূরাশার মধ্যেই সেনাপতি মেহরাব বিন সাবিতকে নির্দেশ দিলেন, বিন সাবিত এগিয়ে যাও! আল্লাহর নাম নিয়ে হামলা কর।
নির্দেশ পাওয়া মাত্র মিহরাবের অশ্বারোহী ইউনিটের যোদ্ধারা উর্ধশ্বাসে ঘোড়া ছুটালো। অপর দিকে দাহিরের সৈন্যদল থেকে একটি অশ্বারোহী অংশ এগিয়ে এসে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হলো। শুরু হলো প্রচণ্ড লড়াই। অবস্থা এই হলো যে, লড়াইয়ের শুরুতেই সেনাপতি মেহরাব শাহাদাত বরণ করলেন। বিন কাসিম অগ্নিবাহী তীরন্দাজদেরকে অগ্রসর হয়ে হাতিগুলোকে অগ্নিবাহী তীরের শিকারে পরিণত করার নির্দেশ দিলেন কিন্তু ততোক্ষণে রাজা দাহির হস্তিবাহিনীকে আরো পিছনে সরিয়ে নিয়েছে। রাজা দাহির হয়তো চূড়ান্ত আঘাতের জন্যে হস্তিবাহিনীকে সংরক্ষিত রাখার জন্য পিছিয়ে নিয়েগেছে। মেহরাবের শাহাদাতের পর তার ইউনিটকে পিছনে নিয়ে এসে সেনাপতি সাঈদের ইউনিটকে আক্রমণের নির্দেশ দেয়া হলো। আবারো শুরু হলো প্রচণ্ড লড়াই। রাজা দাহির খুবই সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করছিল। রাজা আবারো একটি অশ্বারোহী ইউনিটকে এগিয়ে দিয়ে মোকাবেলার নির্দেশ দিল। এমতাবস্থায় বিন কাসিম সেনাপতি আতা বিন মালিকের ইউনিটকে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। আতার ইউনিট ছিল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পলকের মধ্যে ওরা এগিয়ে গেল। ফলে রাজার সৈন্যরা মালিকের ইউনিটকে কাবু করতে পারল না।
