পিছনে ফিরে আসা ছাড়া রাজার এই সৈন্যদের জন্যে আর কোন পথ খোলা ছিল না। তারা পিছিয়ে আসতে শুরু করেছিল। বিন কাসিম যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। রাজার সৈন্যদেরকে পিছনে চলে যেতে দেখে তিনি সেনাপতিকে নির্দেশ পাঠালেন, তোমার সহযোদ্ধাদেরকে ওদের পশ্চাদ্ধাবন থেকে বিরত রাখো।
রাজার এই ইউনিটের সাথে প্রশিক্ষিত হাতিও ছিল। কিন্তু হাতিকে আরব সৈন্যরা আর মোটেও ভয় পাচ্ছিল না। কারণ হাতির বিরুদ্ধে আরব তীরন্দাজরা অগ্নিবাহী তীর ব্যবহার করছিল। তীরন্দাজরা হাতির চোখ লক্ষ্য করে অগ্নিবাহী তীর ছুড়তে শুরু করল। যেহেতু প্রশিক্ষিত হাতিগুলো ছিল প্রদক্ষিণরত এজন্য ওদের চোখে আঘাত করা সহজসাধ্য ছিল না। তবুও অগ্নিবাহী তীর হাতির গায়ের যে স্থানেই আঘাত করতো, হাতিগুলো ভড়কে গিয়ে তীব্র চিৎকার দিয়ে রণাঙ্গন থেকে পালাতে শুরু করল।
রণাঙ্গনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখেও বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে একত্রিত করার কোন চেষ্টাই করলো না রাজা দাহির। সে নিজে রণাঙ্গনের মূল ভূমিতেও প্রবেশ করল না। এ দিকে বিন কাসিমও রণক্ষেত্র থেকে নিজেকে দূরে রাখলেন। তিনি আড়ালে থেকে তার সৈন্যদেরকে আগে পিছনে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ফলে যুদ্ধ অনেকটাই ছোট ছোট সংঘর্ষে ছড়িয়ে পড়ল। বেলা যতোই পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছিল উভয় পক্ষের যোদ্ধারা
সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের পরিবর্তে নিজেদেরকে পিছনে নিয়ে আসছিল। এভাবে প্রথম দিনের বেলা শেষে রাত নেমে এলো। উভয় বাহিনীর সৈন্যরা নিজ নিজ তাঁবুতে আশ্রয় নিল। রাতের বেলায় উভয় পক্ষের সৈন্যদের মধ্যে পাহারা দেয়া ছাড়া কোন ধরনের আক্রমণ প্রতি আক্রমণের ঘটনা ঘটলো না।
রাজা দাহির মনে করেছিল, সে যেমন তার সৈন্যদের ছড়িয়ে দিয়েছে, বিন কাসিমও সৈন্যদের এভাবে ছড়িয়ে দেবেন। কিন্তু বিন কাসিম তাঁর সৈন্যদের এভাবে ছড়িয়ে দিলেন না। ইতিহাসের কনিষ্ঠতম এই ক্ষণজন্ম সেনাপতি ছড়িয়ে দেয়ার পরিবর্তে তার সৈন্যদেরকে পরস্পর কাছাকাছি থেকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন। প্রথমত প্রখর সামরিক দূরদর্শিতা দ্বিতীয়ত সরদার আলাফীর গোয়েন্দা তথ্যে তিনি রাজা দাহিরের পরিকল্পনা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। না, আমি আর অপেক্ষা করতে পারি না। টানা সাত আট দিন এভাবে অনিষ্পন্ন যুদ্ধ চলার পর অধৈৰ্য্য হয়ে তার সামরিক কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বলল দাহির।
শত্রুরা সতর্ক হয়ে গেছে। এদিকে আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে। সেই সাথে ক্ষতি হচ্ছে আমার সৈন্য সংখ্যা। এখন আর বসে থাকা নয়, এখন আমি শত্রুদের হুমকি দেবো। হ্যাঁ! মহারাজ! এখন সময় এসেছে ওদেরকে আমাদের পক্ষ থেকে হুমকি ও উস্কানী দেয়ার। মুসলিম বাহিনী টানা যুদ্ধে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাজার কথায় সায় দিয়ে বলল এক সেনাপতি। না, তোমার কথা ঠিক নয়। তোমাদের বড় ত্রুটি হলো, কোন জিনিসকে তোমরা গভীর ভাবে তলিয়ে দেখো না। চোখ মেলে কোন জিনিসের ভিতরটা দেখতে চাও না। তোমাদের প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়নি। ক্লান্তও হয়নি। ওরা সতর্ক হয়ে গেছে। কিছুতেই ওরা আমাদের ফাঁদে পা দেবে না। উম্মমাখা কণ্ঠে সেনাপতির উদ্দেশ্যে বলল রাজা। সেই দিন রাতের ঘটনা। রাজা দাহির তার রাজকীয় তাবুতে দুই সুন্দরী রক্ষিতার সাথে ফুর্তি আর মদপান করছিল। এর আগে যুদ্ধ সম্পর্কে তার কমান্ডার ও সেনাপতিদের সে নির্দেশ দিল আগামীকাল মুখোমুখি লড়াই শুরু হবে। হঠাৎ ছুটন্ত ঘোড়ার আওয়াজ ভেসে এলো রাজার কানে। দেখতে দেখতে আওয়াজ আরো নিকটবর্তী হতে লাগল। রাজা প্রহরীকে ডেকে
বলল, কোথা থেকে অশ্বখুরের আওয়াজ আসছে? ইত্যবসরে একটি ঘোড়া এসে রাজার তাঁবুর সামনে থামল। প্রহরী রাজার নির্দেশ শুনে তাঁবু থেকে বের হচ্ছিল ঠিক সে সময় তাকে ঠেলে মায়ারাণী ভিতরে প্রবেশ করল। তার চেহারায় উৎকণ্ঠার ছাপ। দ্রুতগতিতে তার তাঁবুতে প্রবেশ করা থেকেই বুঝা যাচ্ছিল কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। কি হয়েছে রাণী? এ অসময়ে তুমি এখানে এলে? আসন ছেড়ে রাণীর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল রাজা।
তাবুর মাঝামাঝি এসেই থেমে গেল রাণী। সে চোখের ইশারায় নর্তকীদের ইঙ্গিত করল। রাণীর ইঙ্গিতে নর্তকীদ্বয় তাঁবুর বাইরে চলে গেল। প্রহরী তো আগেই বাইরে চলে গিয়েছিল। রাণী রাজার কাছে গিয়ে তার দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরল। তার শরীর কাঁপছে। কাপাকাপা কণ্ঠে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কিত কণ্ঠে রাণী বলল, মহারাজ! শুনেছি আগামীকাল থেকে মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হবে। দুহাই লাগে, আপনি রণক্ষেত্রে যাবেন না। মহারাজ! আপনি পিছনে থেকে সৈন্যদের নির্দেশ দেবেন।
কি সব বলছো রাণী। কি হয়েছে তোমার? উম্মামাখা কণ্ঠে বলল রাজা।
আমি যদি শুধু আপনার বিবি হতাম তা হলে হয়তো একথা অমন করে বলতাম না। আমি আপনার বোন। বোন হয়ে ভাইয়ের এমন না, না, এমনটি কখনো হতে পারে না। ধরা গলায় বাক্য শেষ করতে পারল না রাণী। ওহ! রাণী, বুঝেছি! তুমি হয়তো কোন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত হয়েছে। রাণীকে বুকের সাথে মিশিয়ে পিঠে হাত রেখে আদর করে বলল রাজা, এসো এটা পান করে নাও। মনটা ঠিক হয়ে যাবে। রাণীকে টেনে এনে তার দিকে শরাবের পেয়ালা উঠিয়ে দিতে দিতে বলল রাজা। শরাবের পানপাত্রে ধাক্কা মারলো রাণী। ধাক্কায় রাজার হাত থেকে পানপাত্র ছিটকে গিয়ে পড়ল বিছানায়। এসব মদ আমাকে খুশি করতে পারবে না মহারাজ! বলুন, আপনি রণাঙ্গনে যাবেন না…। আমি খুবই খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। আমি দেখেছি, আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন, আমি আপনাকে উঠাতে যাচ্ছি, জীবিত উদ্ধার করতে চাচ্ছি ঠিক এমন সময় আমাদের লোকেরাই তরবারী দিয়ে আপনার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। একথা বলে মায়ারাণী নীরব হয়ে গেল এবং ওপরের দিকে এভাবে চোখ বড় বড় করে তাকালো যেন কোন
