হ্যাঁ, আমি তোমাকে একথাই বলতে চাই। আমি তোমাকে একথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মহারাজ’ অনুগ্রহ করে তোমাদেরকে মাকরানে আশ্রয় দিয়েছেন। না হয় এদেশে কোন মুসলমানের পক্ষে আশ্রয় গ্রহণ সম্ভব ছিল না। আচ্ছা, তোমার সাথে দু’জন লোককে দেখেছিলাম, তন্মধ্যে একজনকে দেখছি, অপরজন কোথায় গেছে? মায়া, মহারাজকে যে ধোকা তুমি দিয়েছ, সে কথা আমি জানি। তুমি একই সাথে মহারাজের বোন ও স্ত্রী। কিন্তু হৃদয়ের তাপ ও জ্বালা নিরসনের
জন্যে তুমি এক আরব নওজোয়ানকে বন্ধু বানিয়ে রেখেছে। তুমি জানতে চাইলে আমি তার নামও বলে দিতে পারি। তুমি আমার যে লোকের অনুপস্থিতির কথা জানতে চাচ্ছো দিনের বেলা কেন, অনেক সময় রাতের বেলায়ও সে আমার সাথে থাকে না।
আমি জানি সে তখন কোথায় থাকে’ বলল মায়ারাণী। তাহলে সে কথা বলো, সে এ মুহূর্তে কোথায়? উম্মামাখা কণ্ঠে জানতে চাইলেন আলাফী। আলাফী ঘোড়া থামিয়ে মায়ার চোখে চোখ রেখে বললেন, মায়া! আমাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা দূর করে দাও, তোমার সবচেয়ে গোপন কথা আমার অন্তরে সংরক্ষিত রয়েছে।
আলাফীর ইঙ্গিতপূর্ণ এই হুমকিতে চুপ হয়ে গেল রাণী। আলাফী বললেন, আজ আমি তোমাকে আরেকটি রহস্য বলে দিচ্ছি, মহারাজ বিন কাসিমকে পরাজিত করতে পারবে না।
তুমিতো এটাই চাও!
এটা আমার চাওয়া নয়। এটা আমার ভবিষ্যদ্বাণী। আর সার্বিক পরিস্থিতিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, মহারাজের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
আলাফীর যে সঙ্গীর কথা মায়ারাণী জানতে চেয়েছিল, সে কিছু দূরে এক লোকের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। অপর লোকটি ছিল বিন কাসিমের একজন গোয়েন্দা। আলাফীর সঙ্গী গোয়েন্দাকে বলছিল, রাজা দাহির যুদ্ধের কি পরিকল্পনা করেছে।
অবশ্য একথা ঠিক যে, আলাফীর পক্ষ থেকে যদি বিন কাসিমকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করা হতো তাহলেও বিন কাসিম দাহিরের জালে আটকা পড়ার মতো লোক ছিলেন না। দাহিরের অবস্থান থেকে চার মাইল দূরেই তিনি তার সৈন্যদের অভিযান রুখে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি সবকিছু বুঝে শুনে ধীর ও বিচক্ষণতার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি নতুন এই এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত হতে চাচ্ছিলেন। তাঁর ছড়িয়ে দেয়া গোয়েন্দারাও রাজার ঘরের খবর সংগ্রহ করে তাকে যথাসময়ে অবহিত করছিল। সেসময় বিন কাসিমের সেনাদলে ছিল
বারো হাজার অশ্বারোহী। রাজা দাহিরের ছেলে জয়সেনাকে পরাজিত করে ওর সৈন্যদের বহু ঘোড়া বিন কাসিমের যোদ্ধারা কব্জা করে নিয়েছিল। ফলে তার বহু পদাতিক সৈন্যও তখন অশ্বারোহী সেনায় রূপান্তরিত হয়েছিল। আরবদের সাথে যেসব পদাতিক সৈন্য ছিল এদের অধিকাংশই ছিল স্থানীয়। বিজিত এলাকার লোকদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে পদাতিক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।
মুসলমানদের সদাচার ও তাদের বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে এসব স্থানীয় লোক বিন কাসিমের বাহিনীতে ভর্তি হয়েছিল। স্থানীয় সৈন্যদের সংখ্যা ছিল প্রায় চার হাজার। সম্মিলিত মুসলিম সৈন্যের মোকাবেলায় রাজা দাহিরের সেনাবাহিনীতে পদাতিক সৈন্য সংখ্যাই ছিল ত্রিশ হাজার। বিন কাসিমের সেনাবাহিনীতে তীরন্দাজের সংখ্যা ছিল এক হাজার। তাদের মধ্যে একটি ইউনিট ছিল অগ্নিবাহী তীরন্দাজ।
বিন কাসিম তার সৈন্যদের মধ্যভাগে অবস্থান নিয়ে বাকীদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছিলেন। তার সাথে রাখলেন সেনাপতি মিহরাব বিন সাবিতকে। ডান বাহুর দায়িত্ব দিলেন সেনাপতি জাহাস বিন জাফীর কাঁধে আর বাম বাহুর দায়িত্ব সেনাপতি যাকওয়ান বিন বকরের ওপর ন্যস্ত করলেন। রিজার্ভ বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন সেনাপতি আনাতা বিন হানযালা আর অগ্রগামী ইউনিটের দায়িত্ব ছিল আতা বিন মালেকের ওপর। বিন কাসিম সবাইকে সর্বশেষ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পর ঘোষণা করলেন, আরব ভাইয়েরা! আমি যদি মারা যাই তাহলে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে মিহরাব বিন সাবিত। মিহরাবের মৃত্যু হলে সাঈদ হবে তোমাদের প্রধান সেনাপতি।
বিন কাসিম লক্ষ্য করলেন, রাজা দাহিরের সৈন্যরা ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত হয়ে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা দৃষ্টে তিনি তার সৈন্যদের বেশি জায়গা জুড়ে না ছড়ানোর নির্দেশ দিলেন।
কেন্দ্রীয় ও রক্ষণভাগের কমান্ড নিজের হাতে রেখে তিনি জানতে চেষ্টা করলেন রাজা দাহিরের বেশির ভাগ সৈন্য কোন অংশে। রাজা দাহিরের পরিকল্পনা ছিল তার রিজার্ভ সৈন্য দিয়ে সে মূল আঘাত হানবে আর বিক্ষিপ্ত সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদেরকে মোকাবেলায় ব্যস্ত রাখবে। সেই সাথে রাজা দাহির ভেবেছিল আরব বাহিনীকে হয়তো তারা অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে যাবে কিন্তু রাজার সৈন্যদের অনেক আগেই পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আরব বাহিনী এগিয়ে আসায় রাজার যুদ্ধ পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেল।
বিন কাসিম আতা বিন হানযালার রিজার্ভ সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা শত্রুবাহিনীর প্রধান ইউনিটের ওপর আক্রমণ চালাও।
সেনাপতি হানযালার সহযোদ্ধাদের আঘাত ছিল খুবই তীব্র। হিন্দু সৈন্যরা এই আত্মতুষ্টিতে ছিল তারা আরব সৈন্যদেরকে তাদের মর্জি মতো সুবিধাজনক স্থানে ফেলে আঘাত করবে। আর আরব সৈন্যদেরকে তাদের ইচ্ছামতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হয়রানী করে নাস্তানাবুদ করবে। রণাঙ্গনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতে। কিন্তু যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হিন্দুদের হাত থেকে মুসলমানদের হাতে চলে গেল। সেনাপতি আতা বিন হানযালার আক্রমণ হিন্দু সৈন্যরা দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলার চেষ্টা করল। তাদের বিশ্বাস ছিল রাজার অন্য বাহিনী তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে কিন্তু বিন কাসিম এমন নিপূণ কৌশল অবলম্বন করলেন যে, রাজার কোন ইউনিটই এদের সহযোগিতায় আসার সুযোগ পেল না।
