রাজা দাহির তার কমান্ডারদের নির্দেশ দিলো, সেনাদেরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে একেকটি দলকে পরস্পর থেকে দূরে রাখবে। রাজা মনে করেছিল, মুসলিম সৈন্যরাও তার সৈন্যদের সাথে মোকাবেলার জন্য বহু খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় দাহিরের রিজার্ভ সৈন্যরা অন্য প্রান্ত থেকে অথবা পিছন দিক থেকে মুসলিম সৈন্যদের ওপর হামলা চালাবে।
‘ওদেরকে বিচ্ছিন্ন করে মারতে হবে’ বলেছিল রাজা দাহির। মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু করা হবে তখন, যখন ওরা বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবেলা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাবে। এদের অধিকাংশ সৈন্য নিহত ও আহত হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। নতুন চাঁদ ওঠার সাথে সাথেই রাওয়ার দিকে অভিযান শুরু হবে কিন্তু মাত্র দুটি ইউনিট আরব বাহিনীকে মোকাবেলা করবে। এক ইউনিট আক্রমণ করে পিছনে চলে আসবে আরেক ইউনিট আক্রমণ করবে। বিগত রাতেই এসব রণকৌশল রাজা তার কমান্ডারদেরকে ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল। পরদিন সেনাবাহিনী রওয়ানা হবার আগে উত্তেজনা ও আবেগপূর্ণ বক্তৃতা দিয়ে সে সবার মধ্যে যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করে দুটি অশ্বারোহী ও একটি পদাতিক ইউনিটকে জয়সেনার সাথে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান রাওয়া-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। কারণ রাজার সংবাদবাহকরা তাকে খবর দিয়েছিল, মুসলিম সৈন্যরা এখনও রণাঙ্গনেই অবস্থান করছে তাদের অগ্রাভিযানের কোন আলামত দেখা যায়নি।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাজা দাহির এই বলে বক্তৃতা শেষ করেছিল‘আমার জীবন থাকতে ইসলাম সিন্ধুতে প্রবেশ করতে দেবো না। আমরা যদি এখানেই ইসলামের আগমন রুখে দিতে না পারি, তা হলে তা সারা হিন্দুস্তানে
ছড়িয়ে পড়বে। আর আমাদের সন্তানেরাও এই অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে না।
মৃত্যুর পর ইদুর কুকুরের বেশে আমাদের পুনর্জন্ম হবে।’ বক্তৃতা শেষে আগের রাতের পরিকল্পনা মতো সৈন্যদেরকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলো রাজা।
সেনাবাহিনী চলতে শুরু করলেই এক উষ্ট্রারোহী দ্রুতবেগে রাজার হাতির কাছে এসে জানালো, আরব বাহিনী রণাঙ্গন ছেড়ে আরো সামনে চলে এসেছে। এবং আমাদের থেকে সামান্য দূরে অবস্থান নিয়েছে।
বিন কাসিমকে আগেই তার এক গোয়েন্দা খবর দিয়েছিল, দাহিরের সৈন্যরা অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে রাজার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। যুদ্ধ কৌশলে পারদশী বিন কাসিম এ খবর পাওয়া মাত্রই প্রস্তুতি অবস্থায় প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করার জন্য রাতারাতি তার সৈন্যদের অভিযানের জন্য প্রস্তুত করলেন এবং সকাল হতেই সেনাদের রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন। বিন কাসিমের সৈন্যদের চলার গতি ছিল তীব্র ফলে দিনের শেষে তারা রাওয়া থেকে আরো চার পাঁচ মাইল সামনে পৌছে গেল।
এর ফলে রাজা দাহিরের পূর্ব পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেল। রাজা দাহির জানতো না এখন আর তার সৈন্যদের গতিবিধি বিন কাসিমের অজানা নয়। রাজা দাহির তার সৈন্যদেরকে বিভিন্নভাগে বিভক্ত করে যে দিকে পাঠিয়েছিল বিন কাসিমের গোয়েন্দারা সব তথ্য সংগ্রহ করে তাকে যথাসময়ে অবহিত করেছিল। রাজা দাহিরকে বিদায় জানানোর জন্য যেসব লোক সমবেত হয়েছিল তারা সবাই যার যার মতো করে ফিরে গেল। এদের মধ্যে ছিল পুরোহিত দল, সামরিক উপদেষ্টা এবং দরবারের শীর্ষ আমলা শ্রেণি। তাছাড়া রাজা দাহিরের রক্ষিতা ও স্ত্রীরাও তাকে বিদায় জানাতে এসেছিল। বিদায় জানাতে আসা লোকদের মধ্যে মায়ারাণী এবং সরদার আলাফীও ছিলেন।
মায়ারাণী তাকে নিয়ে আসা পালকীতে চড়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে একটি ঘোড়া আনিয়ে তাতে আরোহণ করল। এদিকে হারেস আলাফী সবার থেকে ভিন্ন হয়ে একাকী ফিরে যাচ্ছিলেন। মায়ারাণী তার ঘোড়াকে সরদার আলাফীর ঘোড়ার পাশে নিয়ে গেল।
পাশাপাশি গিয়ে মায়ারাণী সরদার আলাফীর উদ্দেশ্যে বলল
সরদার আলাফী! মহারাজ তোমার পরামর্শ খুব তাড়াতাড়ি মেনে নেন। আচ্ছা তুমি কি এসব পরামর্শ মহারাজের প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে করো না তোমার শুভাকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বস্ততা আরো কারোর প্রতি?
‘হঠাৎ তুমি একথা জিজ্ঞেস করছো কেন রাণী? মায়ারাণীকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন আলাফী। আমার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে কি তোমার কোন সন্দেহ আছে? হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে আমার মধ্যে সংশয় দেখা দেয়। কারণ তুমি মূলত একজন মুসলমান এবং আরব। তাছাড়া তুমিতো বলেই দিয়েছ, কিছুতেই তুমি আরব ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারবে না। এতে আমার সন্দেহ হয় তুমি আড়ালে আবডালে আরবদেরই সহযোগিতা করছে আর মহারাজকে এমন পরামর্শ দিচ্ছো, যাতে আরব বাহিনীরই সুবিধা হয়। ‘ তুমি কি এমন একটি পরামর্শের কথা বলতে পারবে? তুমি মহারাজকে পরামর্শ দিয়েছে, নির্বিঘ্নে মুসলিম বাহিনীকে নদী পার হয়ে এপারে আসতে দিতে। মহারাজ তোমার এই পরামর্শ এজন্য মেনে নিয়েছেন যে, তিনি যদি আরব বাহিনীকে পরাজিত করেন তাহলে নদীর কারণে ওরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে। একথা না বলে তুমি যদি এমন পরামর্শ দিতে আর বাহিনীকে নদীপার হওয়ার সুযোগ দিয়ে যখন ওরা নদী পার হতে থাকবে তখন ওদের ওপর তীর ও বর্শার তুফান চালিয়ে দেবেন। তা কি ভালো হতো না?
রাণী! মহারাজকোন বালক শিশু নন। তিনি নির্বোধ অবুঝ অদক্ষ নন। তিনি বিন কাসিমের চেয়ে অনেক বেশী দক্ষ। তিনি ভালো মন্দ সুবিধা অসুবিধা ভালো জানেন। এসব কথা থাক, আসলে তুমি কি বলতে চাও; সেকথা বলো। – তুমি তো বলতে চাচ্ছ, আমি প্রকৃতপক্ষে বিন কাসিমের শুভাকাঙ্ক্ষী, তোমাদের সাথে থেকে মহারাজকে ধোকা দিচ্ছি।
