রাজা দাহিরের হাওদাতে অন্তত দু’জন রূপসী তরুণীকে রাখা হতো। প্রয়োজনের সময় এরা রাজাকে সুস্বাদু শরাব পান করাতো।
রাজা দাহির হাতির ওপর আরোহণ করতে যাবে ঠিক এ মুহূর্তে মায়ারাণী এসে নিজ হাতে রাজার মাথায় তিলক এঁকে দিল এবং তার গালে চুমু খেল। আগেই বলা হয়েছে, মায়ারাণী দাহিরের আপন বোন হলেও তাকেই দাহির বিয়ে করে ছিল। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত এসে রাজা দাহিরের গলায় লাল সাদা সূতার তৈরি পৈতা পরিয়ে দিলো। সে সময় পুরোহিতদের একটি দল ভজন গাইতে ছিল। রাজা দাহির যখন হাওদায় পা রাখলো তখন আগে থেকে হাওদায় অবস্থানরত দুই রূপসী তরুণী তাদের কাধ রাজার দিকে এগিয়ে
দিল। রাজা দুই তরুণির কাধে ভর দিয়ে হাওদায় অবতরণ করল। মোট কথা, রাজা দাহিরের রণাঙ্গনে যাত্রা ছিল রীতিমতো একটি জমকালো অনুষ্ঠান। দাহির হাতির ওপর বসার সাথে সাথেই মাহুত হাতিকে চালিয়ে দিল। মাতাল হাতি শুড় ওপরে তুলে বিকট চিৎকার করে দ্রুত বেগে ছুটতে শুরু করলে চতুর্দিক থেকে শুরু হলো জয়ধ্বনী মহারাজের জয় হোক। তিনবার উপস্থিত সকল মানুষ এই জয়ধ্বনী উচ্চারণ করল। রাজার হাতি কয়েকবার গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে কিছুটা সামনে অগ্রসর হয়ে আবার পিছিয়ে এলো, যেন হাতি রনাঙ্গণে যেতে মোটেও ইচ্ছুক নয়। মাহুতের কথা ও শাসন সে মানতে নারাজ।
একপর্যায়ে টানা কয়েকটি চিৎকার দিয়ে দ্রুতবেগে রাজার হাতি সারিবেঁধে অপেক্ষমান সৈন্যদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সৈন্যদের অগ্রভাগে একশ জঙ্গী হাতি সারিবেঁধে দাঁড়ানো ছিল। প্রতিটি হাতির পিঠের হাওদায় তিনজন করে তীরন্দাজ ও চারজন করে বর্শা নিক্ষেপকারী সৈন্য সদাপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল।
হস্তিবাহিনীর পেছনে ছিল দশ হাজার অশ্বারোহী, যাদের প্রত্যেকের মাথায় শিরস্ত্রাণ এবং দেহে লোহার বর্ম। পনের হাজার পদাতিক সৈন্য তাদের ডানে ও পনের হাজার পদাতিক সৈন্য বামে সুসজ্জিত অবস্থায় দাঁড়ানো। রাজা দাহিরের নির্দেশে এভাবে সকল সৈন্যকে দাঁড় করানো হলো, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে রাজা সকল সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।
‘পবিত্র ভারতমাতার যোগ্য সন্তানেরা! এই ধরিত্রী আজ তোমাদের কাছ থেকে রক্ত দাবী করছে। ভারত মাতা আজ তোমাদের কাছে জীবন বলিদানের আহবান জানাচ্ছে। নিজের মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ভারতমাতার জন্যে নজরানা দিয়ে দাও। আমি তোমাদের সাথেই আছি থাকবো। তোমাদের সাথে আমিও আমার জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়ার আগে অন্তত একশ শত্রু নিধন করতে হবে…। আমি দেবদেবীদের ইঙ্গিত পেয়েছি, আমার মাথা আমার শরীরেই থাকবে এবং আরব পর্যন্ত যাবে। আরব ভূমি বহু দিন ধরে তোমাদের অপেক্ষা করছে। তোমরা বিজয়ী বেশে সেই দেশে প্রবেশ করবে যে দেশ থেকে সনাতন ধর্মের শত্রুরা ভারতে আগ্রাসন চালাচ্ছে। ইসলামের নবোথ্থিত মাথা গুড়িয়ে দিতে হবে, মক্কার পবিত্র ঘরে আবার দেবদেবীর মূর্তি প্রতিস্থাপন করতে
হবে। চিরদিনের জন্য সেখানকার আযান বন্ধ করে দিতে হবে। সেখানে আযানের পরিবর্তে ঘণ্টা বাজবে, ভজনকীর্তন হবে, আরতি হবে।
“ভারতমাতার জয় হোক” “রাজা দাহিরের জয় হোক”
বিশাল বাহিনীর জয়ধ্বনীতে রাজা দাহিরের আওয়াজ হারিয়ে গেল। বক্তৃতায় বিরতি দিয়ে ক্ষান্ত হলো দাহির। অতঃপর শ্লোগান থামলে দুহাত ওপরে তুলে আবার বলতে শুরু করল
ভারতমাতার সন্তানেরা! তোমাদের মন থেকে এই ভয় তাড়িয়ে দাও যে, মুসলমানরা খুব সাহসী বীর, ওরা রাজ কুমার জয়সেনার সৈন্যদের হারিয়ে দিয়েছে এটা নিয়ে চিন্তা করো না। ওরা আমাদের বহু দুর্গ জয় করে নিয়েছে, এটাকেও বড় মনে করো না। বৌদ্ধদের সহযোগিতার কারণে ওরা আমাদের দূরবর্তী দুর্গগুলো কব্জা করতে পেরেছে। এটা ওদের বাহাদুরী নয়। বৌদ্ধদের গাদ্দারী। এই সাফল্যেকে পুঁজি করেই মুসলমানরা নদী পার হয়ে এপারে আসার দুঃসাহস দেখিয়েছে। ওরা ভাবছে, আমাদেরকে আরো পিছু হটিয়ে দিতে পারবে। আর আমরা ওদের ভয়ে দুরে পালিয়ে যাবো। তোমরা মনে রেখো, আমি ইচ্ছা করেই ওদেরকে এ পর্যন্ত আসতে দিয়েছি। এখন আর কখনো ওরা নদীর পাড়ে যেতে পারবে না। এখন আমরা নদীর পাড়ে যাবো। ওদের নৌকাগুলোকে জ্বালিয়ে দেবো, নদীতে ভাসিয়ে দেবো। এখন নদী পার হওয়ার পালা আমাদের। একথা মনে রেখো, যদি ওদের ভয়ে জড়সড়ো হয়ে থাকো, বুক টান করে ওদের মোকাবেলায় জীবনবাজী রাখতে না পারো, তাহলে তোমাদের যুবতী স্ত্রী, বোন, কন্যারা ওদের দাসীতে পরিণত হবে। তোমাদের ধন-সম্পদ অলংকারাদি ওরা লুটে নেবে। তোমাদের পালিত গোমাতাকে ওরা জবাই করে খাবে। তোমরা কি গোমাতার অসম্মান সহ্য করবে?
না, না, আমরা জীবন থাকতে গোমাতার অসম্মান হতে দেবো না, সমস্বরে রব উঠল হাজারো কণ্ঠে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, অনলবর্ষী বক্তৃতায় রাজা দাহির হিন্দুদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, তার সৈন্যদের মধ্যে সৃষ্টি করেছিল যুদ্ধ উন্মাদনা। সৈন্যদেরকে দাহির দেবদেবীদের অভিশাপের ভয় দেখাল এবং দেবদেবীর মর্যাদা রক্ষায় জীবনপাত করনে স্বর্গের অফুরন্ত সুখ লাভের লোভ দেখাল।
রণাঙ্গণে যাওয়ার আগের রাতে রাজা দাহির তার সামরিক উপদেষ্টাদের ডেকে তাদের সাথে পরামর্শ করল। সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের সাথে যুদ্ধ নিয়ে সলাপরামর্শ করলো। পরামর্শদাতাদের মধ্যে মুসলিম সরদার হারেস আলাফীও ছিলেন। হারেস আলাফীকে দাহির নির্ভরযোগ্য সুহৃদ ও বুদ্ধিমান পরামর্শদাতা ভাবতো। অথচ আলাফী সরদারের সব আনুগত্য শুভাকাঙ্ক্ষা ছিল বিন কাসিম ও মুসলিম বাহিনীর প্রতি। সে সময় যদি বনী উমাইয়ার শাসন না হতো, তাহলে এসব আরব যোদ্ধাকে মাকরানে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হতো না।
