সকাল বেলায় সূর্যোদয়ের পর দেখা গেল বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দাহিরের সৈন্যদের মৃতদেহ। এদের মধ্যে তখনও যেসব সৈন্যের দেহে প্রাণ ছিল তাদের কেউ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। মুসলিম বাহিনীর শাহাদত বরণকারী সৈন্যদের লাশগুলো এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছিল, আর সৈন্যরা সেগুলো দাফন করার জন্য কবর খুড়ছিল। অবশেষে একসাথে জানাযা পড়ে সবাইকে কবর দেয়া হলো। সিন্ধুতীরে আরব মুজাহিদদের মৃতদেহগুলো ইতিহাসের পাতায় ঠাই পেল আর তাদের দেহগুলো চিরদিনের জন্য মাটির সাথে মিশে গেল। সৈন্যদের দাফন শেষে বিন কাসিম রাজা দাহিরের সাথে প্রথম মুখোমুখি লড়াইয়ের খবর জানিয়ে হাজ্জাজের কাছে চিঠি লিখলেন। সেই চিঠিতে যুদ্ধের গোটা পরিস্থিতি, সাফল্যও ক্ষয়ক্ষতির কথা সবিস্তারে উল্লেখ করলেন। চিঠি লেখা শেষ হলে বিন কাসিম পত্র বাহকের হাতে তা দিয়ে বললেন, যথাসম্ভব দ্রুত এই পয়গাম হাজ্জাজের কাছে পৌছাবে। হাজ্জাজের পরিকল্পনা মোতাবেক সপ্তম দিন বিন কাসিমের পত্রের জবাব নিয়ে পত্রবাহক ফিরে এলো। মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রাথমিক বিজয়ের জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিন
কাসিম ও সৈন্যদেরকে মোবারকবাদ জানালেন। সেই সাথে হাজ্জাজ কিছু দিক নির্দেশনা শেষে বিন কাসিমকে লিখলেন,
এখন তুমি রাজা দাহির যেখানে সৈন্য জমায়েত করে অবস্থান করছে সে দিকে অগ্রসর হও…। তবে ভুলে যেয়োনা, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানী ছাড়া শক্তি ও কৌশলের জোরে কখনো সাফল্য ধরা দেয় না। সব শেষে হাজ্জাজ লিখলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো, সব সময় আল্লাহর দরবারে সাফল্য ও মদদের জন্য মোনাজাত করতে থাকো, তাহলে প্রতিটি লড়াইয়ে আল্লাহর মদদে বিজয় তোমাদেরই হবে।’
নিজেদের গুছিয়ে বিশাল ময়দানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দাহিরের সৈন্যদের মৃত দেহ, মৃত ঘোড়া ও হাতির দেহগুলোকে টেনে হেঁচড়ে নদীতে ভাসিয়ে দিতে বিন কাসিমের সৈন্যদের টানা কয়েক দিন পরিশ্রম করতে হল। তাতে ময়দান পরিষ্কার হয়ে গেল, এক পাশে রয়ে গেল শুধু বিন কাসিমের আহত সৈন্যদের তাবু আর শহীদদের কবর, এবার বিন কাসিমের সৈন্যরা আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। প্রস্ততি চলাকালীন সময়ে একদিন সন্ধ্যাবেলায় বিন কাসিমের সেনা শিবিরে সকলের দৃষ্টি পশ্চিম আকাশের দিকে কি যেন তালাশ করছিল।
হঠাৎ এক সৈনিক চিকার দিয়ে বলল, “আমি দেখে ফেলেছি! রমযানের চাঁদ উঠেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে এ খবর সারা শিবিরে যেন আনন্দের বন্যা বইয়ে দিল। অপরদিকে রাজা দাহিরও রমযানের চাঁদ দেখে খুশি হল। কারণ চূড়ান্ত আক্রমণের জন্যে রমযানের অপেক্ষা করছিল দাহির। রাজা দাহির তার সেনাপতিপুত্র জয়সেনাকে বলেছিল, রমযানের দিনের বেলায় যখন বিন কাসিমের বাহিনী ক্ষুধা পিপাসায় কাতর থাকবে, তখন সে চূড়ান্ত আঘাত হানবে। সেই রাতের দ্বিপ্রহরে একজন স্থানীয় লোক মুসলিম শিবিরে প্রবেশ করে সরাসরি শাবান ছাকাফীর তাবুতে চলে গেল। সে ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর একজন গোয়েন্দা। গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে সে জানাল, আরুঢ়ের পার্শবর্তী একটি ময়দানে রাজা দাহিরের সৈন্যরা রণপ্রস্তুতিতে সজ্জিত। তবে গোয়েন্দার পক্ষে তা জানা সম্ভব হয়নি এই বাহিনী কোন দিকে যাত্রা করবে।
তারা কি বিন কাসিমের বাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবে, না নিজেরা এগিয়ে এসে বিন কাসিমকে হুমকি দেবে।
শাবান ছাকাফী তখনি গোয়েন্দাকে সাথে নিয়ে বিন কাসিমের তাঁবুতে চলে এলেন। বিন কাসিমকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়া হলো। তিনি নিজে গোয়েন্দার কাছ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিস্থিতির খবর নিলেন।
এ খবর পেয়ে বিন কাসিম আর ঘুমাতে পারলেন না। তিনি গোয়েন্দা প্রধানকে নির্দেশ দিলেন, আপনি অগ্রসর হয়ে রাজার সৈন্যদের অবস্থা নিজ চোখে দেখে আসুন। শাবান ছাকাফীকে বলার প্রয়োজন ছিল না, কি জিনিস তাকে প্রত্যক্ষ করতে বলা হয়েছে। এদিকে বিন কাসিম সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে বললেন, বন্ধুরা! এখন সেই সময় এসে গেছে যে সময়ের জন্যে তোমরা অপেক্ষা করছে। শুধু তোমরা না, শত্রু বাহিনীও এই চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। রাজা দাহিরের রণপ্রস্তুতি ছিল রাজকীয়। রাজা দাহিরের হাতিটিও ছিল রাজকীয় সাজে সজ্জিত। অন্যান্য হাতির তুলনায় সেটি ছিল অনেক বড় এবং দেখতে ধূসর বর্ণের। এই নর হাতিটিকে কখনো কোন মাদী হাতির ধারে কাছে যেতে দেয়া হতো না। ফলে এটি সর্বক্ষণ মাতালের মতো উগ্র থাকত। হিন্দুরা হাতিকে রণাঙ্গণে নিয়ে আসার আগে এগুলোকে প্রচুর চোলাই মদ পান করাত। ফলে রণাঙ্গণে হাতিগুলো থাকতো উত্তেজিত উন্মত্ত। নির্দিষ্ট মাহুত ছাড়া আর কারো পক্ষে এসব জঙ্গী হাতিকে কাবুতে রাখা সম্ভব হতো না। মাহুত তাদের ইঙ্গিতেই হাতিগুলোকে ইচ্ছামতো চালাতে পারতো।
রাজা দাহিরের হাতির ওপর ছিল রাজকীয় হাওদা। সোনালী রঙের ঝালর দেয়া দামী কালো কাপড়ে আবৃত ছিল হাতির উর্ধাঙ্গ। হাওদার ওপরে রাখা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ বর্শা ও তীর। যুদ্ধাবস্থায় রাজাকে তীর ও বর্শা এগিয়ে দেয়ার জন্য হাওদায় দু’জন অভিজ্ঞ সহযোগীকে রাখা হতো। রাজা দাহির যে তীর ব্যবহার করতো তা ছিল বিশেষ ভাবে তৈরি অনন্য বৈশিষ্ট সম্পন্ন। নতুন চাঁদের মতো বাঁকা উভয় প্রান্ত ধারালো এই তীর ধনুকের সাহায্যে নিক্ষেপ করার পর ঘুরে ঘুরে গিয়ে শত্রু সৈন্যের গলায় পড়লে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো।
