‘চিন্তা করবেন না বিন কাসিম। আমরা সেইদিন নিজেদেরকে বিজয়ী মনে করবো যে দিন রাজা দাহিরের খণ্ডিত মস্তক আপনার পায়ের কাছে গড়াগড়ি করবে’ বললেন সেনাপতি যুরায়েম বিন আমর মাদানী। ইসলামের পথে বাধাসৃষ্টিকারী এই দেয়ালকে আমরা গুড়িয়ে দিয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলবো, আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, আমরা সেই কর্তব্য পালন করেছি।
বিন কাসিম। নিঃসন্দেহে আমাদের এ বিজয় চূড়ান্ত বিজয় নয়; তবে এই বিজয়ই আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের পথ খুলে দিয়েছে” বললেন অপর সেনাপতি দারাস বিন আইউব। আমাদের যোদ্ধারা হাতিকে ভয় পেতো। আর এখন দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, দাহির বাহিনীর হাতিগুলোই আমাদের সৈন্যদের ভয় করতে শুরু করেছে।
নিঃসন্দেহে তা ঠিক, বললেন বিন কাসিম। আমি আমার যোদ্ধাদেরকে হাতির শুঁড় কেটে দিতে নিজ চোখে দেখেছি।
এরপর বিন কাসিম তাঁর আহত সৈন্যদের দেখতে চলে গেলেন। ঘাসের ওপর কাপড় বিছিয়ে আহত সৈন্যদের শুইয়ে রাখা হয়েছিল। আহত সেনা শিবিরের কাছে গিয়ে বিন কাসিম ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তিনি একেকটি তাঁবুতে ঢুকে সৈন্যদের সাথে কথা বলে আবার অন্য শিবিরে প্রবেশ
ছিলেন। এ ভাবে একটির পর একটি তাঁবুতে ঢুকে সৈন্যদের চিকিৎসার। খোঁজ-খবর ও আহতদের সাথে কথা বলে নতুন একটি তাবুতে প্রবেশ করছিলেন। তাবুতে মশাল জ্বলছে। তিনি দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধা আহত সৈন্যকে পানি পান করাচ্ছে। অবশ্য এর আগেই ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। বৃদ্ধার চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হলেও তার গড়ন বেশ শক্ত। এরই মধ্যে সেবিকা বৃদ্ধার সাথে আহত সৈনিকের কথাবার্তা হয়েছে।
: তুমি কার মা? : আহত সৈনিক বয়স্কা সেবিকাকে জিজ্ঞেস করল।
এ মুহূর্তে আমি সকল সৈন্যের মা, যারা আরবদের মান অক্ষুন্ন রাখার জন্য রক্ত ঝরিয়েছে। তোমার মনে এ প্রশ্নের উদ্রেক হলো কেন, যে আমি কার মা? পাল্টা প্রশ্ন করল বৃদ্ধা।
: হ্যাঁ, তুমি আমারও মা-ই বটে। আমার মা হলেও এমন মমতায় পট্টি বেঁধে দিতো এবং পরম আদরে পানি মুখে তুলে দিত। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। কারণ তুমি এখন এমন বয়সে উপনীত হয়েছে যে, আমাদের উচিত ছিল তোমার সেবা করা, কিন্তু উল্টো আমাদেরকে তোমার সেবা করতে হচ্ছে।
: তুমি কোন কবিলার লোক আহতকে জিজ্ঞেস করল বৃদ্ধা।
: আমি বনী উমাইয়ার লোক। আচ্ছা, তুমি কোন গোত্রের?
: আমি আলাফী গোত্রের লোক। জবাব দিল মহিলা।
: আলাফী? আঁতকে উঠল আহত সৈনিক। আমাদের সেনা শিবিরে কি কোন আলাফী গোত্রের সৈন্যও আছে। যার মা তুমি?
: না, বনী উমাইয়ার শাসনাধীন সেনাবাহিনীতে কোন আলাফী গোত্রের সৈন্য থাকতে পারে না। এখানেও নেই। কারণ এই দুই গোত্রের মধ্যে শত্রুতা বিদ্যমান।
: তাহলে তুমি এখানে এলে কি করে? আলাফীরা তো সবাই বিদ্রোহী। ওরা খলিফার সাথে বিদ্রোহ করে হিন্দুস্তানে এসে রাজা দাহিরের আশ্রয়ে বসতি গেড়েছে।
: আমি একা নই। আমার সাথে আলাফী গোত্রের আরো চার মহিলা এসেছে। আমরা তোমাদের সৈন্যদলের সাথে আরব থেকে আসিনি, মাকরান থেকে এসেছি।
: ও নদী কিভাবে পার হয়েছে তোমরা?
: কেন, নদীতে নৌকার পুল ছিলনা? আমরা সেই পুল পেরিয়ে এসেছি। আমাদের কেউ বাধা দেয়নি।
আমি তোমার হাতে পানি পান করবো না। বৃদ্ধার হাতের পানি পান করতে অস্বীকৃতি জানালো সৈনিক। বৃদ্ধা সেবিকা ও আহত সৈন্যের মধ্যে যখন এই কথা হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন সেনাপতি বিন কাসিম।
বিন কাসিমকে প্রবেশ করতে দেখে আহত সৈনিক বৃদ্ধাকে বলল, তুমি এখান থেকে উঠে যাও, প্রধান সেনাপতি বিন কাসিম এসেছেন। তিনি যেন তোমার কথা জানতে না পারেন। বৃদ্ধা উঠে দু’হাতে বিন কাসিমের মাথা ধরে তার কপালে চুমু দিলো এবং তার উদ্দেশ্যে বলল বিন কাসিম। তুমি কি ভুলে গেছে, তোমার বাপ দাদা বনী সাকীফের লোক ছিলেন? বনী উমাইয়ার নূন রুটি কি তোমার শরীরে এতোটাই প্রভাব সৃষ্টি করেছে যে, তুমি তোমার সৈন্যদের মধ্যে আলাফীদের প্রতি এমন বিদ্বেষ তৈরি করে রেখেছে যে, এই আহত সৈনিক আমার হাতের পানি পান করতে পর্যন্ত ইচ্ছুক নয়।
: কেন, কি হয়েছে? জানতে চাইলেন বিন কাসিম?
: বিন কাসিমের জিজ্ঞাসার জবাবে বৃদ্ধা জানালো, সে একজন আলাফী গোত্রের মহিলা এবং মাকরান থেকে আরো চার মহিলাকে নিয়ে বিন কাসিমের আহত সৈন্যদের সেবাদানের জন্য কিভাবে এপর্যন্ত এসেছে।
: তুমি জানো না বিন কাসিম, তুমি জানো না। প্রতিটি আলাফী নারী শিশু তোমার বিজয়ের জন্য কতভাবে যে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছে। এটাই ভেবে দেখো, এই বয়সেও আমি এতোদূর পর্যন্ত আসতে বাধ্য হয়েছি। তোমাকে নিজ চোখে দেখার খুব সাধ ছিল আমার। আজ
দেখেছি। আমি তোমার চেহারায় খালিদ বিন ওয়ালিদ, সাদ বিন ওয়াক্কাস, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও তাঁর সাথীদের নমুনা দেখতে পাচ্ছি…। দয়া করে তুমি এই সৈনিককে বলল, সে যেন আমার হাতের পানি পান করে, আমি পানিতে কোন বিষ মেশাইনি।
মাফ করো মা। আমি আলাফীদের শত্রু নয় বন্ধু মনে করি। এই বেচারা জানে না, আলাফীরা আমাদের কতভাবে সহযোগিতা করছে।
: বিন কাসিম ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে আহত সৈন্যের দিকে তাকালেন। সৈনিক তার চাহুনীর ভাষা বুঝতে পারল। আর বৃদ্ধা মহিলা পরম মমতায় আহত সৈন্যের দিকে পুনরায় পানির পাত্র তুলে ধরলে সৈনিক পানি পানের জন্য তার দিকে দু হাত প্রসারিত করে দিল। শোন বাবা! দুটি গোত্রের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে কিন্তু এই মতবিরোধ আর শত্রুতা ইসলামের সম্পর্ককে ছিন্ন করতে পারে না। যে দিন গোত্রে গোত্রে ইসলামের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে, সেদিন ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, মুসলমানরা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে।
