খোলা ময়দানে নেমে আসতে ওকে প্ররোচিত করো। ওর বাহিনীকে এভাবে নাকানী চোবানী খাওয়াবে যে, শেষ পর্যন্ত দাহির তোমার পায়ের তলায় এসে পড়ে। রাজা দাহিরকে পরাস্ত করার পর তোমাদের জন্যে গোটা হিন্দুস্তানের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এরপর তোমাদের মোকাবেলায় আর কেউ টিকেত পারবে না। তবে সব সময় নফল নামায ও আল্লাহর মদদের জন্য দোয়া করতে ক্রটি করবে না। ইবাদত, তেলাওয়াত ও দোয়ার কার্যকারিতা তো ইতোমধ্যেই তোমরা উপলব্ধি করছ। তাই বেশি বেশি আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের মদদ করবেন ইনশাআল্লাহ।
হাজ্জাজের পয়গাম পাওয়ার পর কাল, বিলম্ব না করে সিসিম দুর্গের দায়িত্ব দুই প্রশাসককে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সৈন্যদের নিরূন প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দিলেন। সিসিম দুর্গের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কিছু সংখ্যক সৈন্য সেখানে রেখে বাকীদের সাথে নিলেন। পথিমধ্যে সিস্তান দুর্গে যাত্রা বিরতি করলেন বিন কাসিম। বিন কাসিম সিস্তান দুর্গ থেকে রওয়ানা হবেন ঠিক এই মুহূর্তে চেন্নাই গোত্রের কিছু লোক তার সাথে সাক্ষাত করতে এলো। তারা বিন কাসিমকে জানালো, রাজা কাকা ও বিজয় রায়ের পাঠানো দুই গোয়েন্দা যারা এখন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেছে, তারা স্বগোত্রের সরদারদের গিয়ে বলেছে, মুসলমানরা আসলে কেমন, ইসলাম কি এবং ইসলাম গ্রহণ করলে দুনিয়া ও পরকালে কি কি পুরস্কার ও শান্তি লাভ করা যাবে। এরা দু’জন যেখানেই যেত, মুসলিম সৈন্যদের পরোপকার, তাদের সৎ চরিত্র, জনকল্যাণ ও মানব হিতৈষীর কথা প্রচার করত।
অবশ্য চেন্নাই গোত্রের লোকেরাও দেখতে পেয়েছিল, বিজিত এলাকায় মুসলমানরা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার জুলুম তো দূরে থাক তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করে দিতে
কুণ্ঠাবোধ করে না। তারা স্বগোত্রের দুই নও মুসলিমের মুখে মুসলিম সেনাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও সৎ চরিত্রের কথা শুনে বহুলোক সদল বলে সিস্তান দুর্গে এসে বিন কাসিমের কাছে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেয়ার আবেদন জানালো।
চেন্নাই গোত্রের লোকেরা বিন কাসিমের জন্য বহু মূল্যবান উপঢৌকনও নিয়ে এলো। বিন কাসিম তাদেরকে ইসলামে দীক্ষা দিলেন। সবাই কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। তখন প্রায় দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেল। সৈন্যরা খাবার আয়োজন করল। বিন কাসিম সবাইকে খাবারে আহবান জানালেন।
আহার শেষে বিন কাসিম চেন্নাই গোত্রের লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, এই গোত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে অবারিত রিযিকের দ্বারা স্নাত হবে। তারা যেখানেই থাকুক রিযিকের ঘাটতির সম্মুখীন হবে না। এরা আরযুক। তখন থেকেই দেখা যায় চেন্নাই গোত্রের লোকেরা সত্যিকার অর্থেই রিযিকের অভাব বোধ করে না।
অতঃপর বিন কাসিম নিরূনের পথে রওয়ানা হলেন।
০৯. অগ্নিদগ্ধ দুই প্রমোদবালা
অগ্নিদগ্ধ দুই প্রমোদবালাকে দাহির হাতির হাওদা থেকে ফেলে দিল
৯৩ হিজরী সনের সেই ভয়াল রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। রণাঙ্গনের চারদিকে অসংখ্য জ্বলন্ত মশাল ভেসে বেড়াচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে রক্তের গন্ধ। আহতদের আর্তনাদ ও আহাজারী রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জন্ম দিয়েছে এক ভয়ার্ত পরিবেশ। বিন কাসিমের যোদ্ধারা দাহির বাহিনীর নিহত সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্র একত্রিত করছিল। কয়েকটি দল শাহাদাত বরণকারী সহযোদ্ধাদের লাশগুলো জমা করছিল। কয়েকটি দল আহত সৈন্যদের তুলে এনে শিবিরের পিছন দিকে সেবাদানকারীদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। যেসব মহিলা বিন কাসিমের যোদ্ধাদের সাথে এসেছিল তারা এসব আহত যোদ্ধাদের ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে ওষুধ দিচ্ছিল। সেবিকা মহিলারা ছিল বিন কাসিমের সৈন্যদেরই কারো স্ত্রী বোন বা কন্যা। প্রতিটি যুদ্ধের পর আহতদের চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রুষার দায়িত্ব তারাই পালন করছিল। তারা রাত জেগে বিরামহীন ভাবে আহতযোদ্ধাদের ক্ষতস্থানে ওষুধ দিত, আর পানাহার করাতো। অশ্বারোহী একটি ইউনিট দাহির বাহিনীর মৃত ও আহত সৈন্যদের লাওয়ারিশ ঘোড়াগুলোকে ধরে ধরে মুসলিম শিবিরে পাঠাচ্ছিল। বিন কাসিম গণীমতের সম্পদ সংগ্রহের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সৈন্যদের পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করলেন। কারণ তিনি জানতেন, আজ যে সৈন্যদের সাথে তার মোকাবেলা হয়েছে, তা রাজা দাহিরের বিপুল সৈন্যের একটি অংশ মাত্র। রাজার আরো অসংখ্য সৈন্য আরূঢ় প্রান্তরে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় মোকাবেলার জন্য অপেক্ষা করছে। তখন রাতের বেলায় যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়া হতো, কিন্তু রাতের অন্ধকারে গেরিলা আক্রমণের আশঙ্কা থাকতো। বিন কাসিম দু’জন সেনাপতিকে তাদের ইউনিট নিয়ে রণাঙ্গণ
থেকে দূরে শত্রুবাহিনীর সম্ভাব্য পথে টহল দেয়ার নির্দেশ দিলেন। যে পথে শত্রুসৈন্যদের রাতের বেলায় গেরিলা আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। সৈন্যরা রণক্লান্ত হলেও এতটুকু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না করার উপায় ছিল না। শত্রু পক্ষ ছিল খুবই প্রবল ও অভিজ্ঞ। কারণ রাজা দাহির অল্প কিছু সৈন্য মোকাবেলায় পাঠিয়ে বেশিসংখ্যক সৈন্য তার কাছে রেখে দিয়েছিল। রণকৌশলের দিক থেকে তা ছিল খুবই উঁচুমানের সমরবিদের পরিচায়ক।
বিন কাসিম নিজে এই যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না। রাতের বেলায় তিনি ময়দানে ঘোড়া হাঁকিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বিন কাসিমের সাথে ছিল তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী। তারা ময়দান থেকে কিছুটা দূরে রাতের গেরিলা আক্রমণ প্রতিহতকরণে টহলদানরত সৈন্যদের কাছে চলে এলেন। টহলদলের দুই সেনাপতির উদ্দেশ্যে বিন কাসিম বললেন, বন্ধুদ্বয়! আজকের লড়াইটা সূচনামাত্র। এটাকেই শত্রু বাহিনীর পরিণতি মনে করো না। শুধু একটি মোকাবেলায় বিজয়ী হয়ে এমন আত্মশ্লাঘায় ডুবে যেয়োনা যে, সামনের প্রতিটি মোকাবেলায় শত্রুবাহিনী এভাবেই পরাস্ত হবে। রাজা দাহির তার ছেলে জয়সেনাকে কিছু সৈন্য দিয়ে মোকাবেলায় লিপ্ত করে আমাদের যুদ্ধ কৌশল দেখে নিয়েছে। সে আমাদেরকে কিভাবে পরাজিত করতে হবে তা বুঝার চেষ্টা করছে। সামনের প্রতিটি মোকাবেলায় আমাদেরকে আরো সতর্ক হয়ে লড়াই করতে হবে, অবশ্য আল্লাহ তাআলা বিজয় আমাদেরকেই দান করবেন।
