বিন কাসিম একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখানে তার পাশে রাজা কাকাকে একটি কুরসীতে বসিয়ে তার মাথায় একটি মূল্যবান রেশমী কাপড় পেঁচিয়ে দিলেন। বিজয়ী শক্তির বশ্যতা ও আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার পরও বিজিত রাজাকে অপমানিত না করে তাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করার ঘটনায় দুর্গের অধিবাসীরা মুসলমানদের প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল এবং মুসলমানদেরকে শত্রু সৈন্যের বদলে মঙ্গলকামী ভাবতে লাগল।
সিসিম দুর্গ জয়ের ব্যাপারে ইতিহাসে দু’ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। একজন লিখেছেন, রাজা কাকসার বিজয় রায়ের সাথে বিরোধের পর বিজয় রায়কে দুর্গে রেখেই মৈত্রী প্রস্তাবে সম্মত হয়ে বিন কাসিমের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে চলে গিয়েছিল। পথিমধ্যে সে বিন কাসিমের সাথে মিলিত হয়ে পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে নেয় এবং তার সৈন্যদের আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। এরপর বিন কাসিম এসে দুর্গ অবরোধ করেন। বিজয় রায়ের সাথে দুদিন মোকাবেলা হয় এক পর্যায়ে বিজয় রায় নিহত হয় আর বিজয়ীবেশে বিন কাসিম দুর্গে প্রবেশ করেন। অপর এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, বিজয় রায় সিসিম দুর্গ থেকে দলবল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করেছিল। মোদ্দা কথা হলো, বিন কাসিমের সিসিম দুর্গ অভিযানকালে বিজয় রায় নিহত হয়েছিল।
অপর একটি বর্ণনা এমনও রয়েছে যে, রাজা কাকা সংঘর্ষ পরিহার করে স্বেচ্ছায় বিন কাসিমের আনুগত্য মেনে নিয়েছিল কিন্তু আশেপাশের কিছু লোক আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তারা কাকসার বিরুদ্ধে গিয়ে বিন কাসিমের প্রতিরোধে উদ্যত হয়। এসব বিদ্রোহের উস্কানীদাতা ছিল সিসিম দুর্গ থেকে পালিয়ে যাওয়া বিজয় রায়। রাজা কাকা তার নিজস্ব লোক পাঠিয়ে বিদ্রোহকারীদের বোঝাতে চেষ্টা করল কিন্তু বিদ্রোহীরা সমঝোতা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে শক্তি সঞ্চয় ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম জোরদার করতে লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত রাজা কাকা বিন কাসিমকে বলতে বাধ্য হলো, আপনি বিদ্রোহ দমনে যা ভালো মনে করেন করুন, তাতে আমার কোনই আপত্তি থাকবে না। বিন কাসিম ডেপুটি সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন কায়সকে কিছু সৈন্য দিয়ে নির্দেশ দিলেন, তুমি বিদ্রোহীদের ঘর বাড়ি ভেঙে দেবে এবং তাদের ধরে ধরে হত্যা করবে এবং তাদের দমনে যা জরুরি মনে করো তাই করবে।
এদিকে বিদ্রোহীরা তখন স্বীয় জাতির লোকজনের ঘরবাড়িতেও লুটতরাজ শুরু করে এবং মুসলিম বাহিনীর বিচ্ছিন্ন সেনা চৌকিগুলোতে গেরিলা আক্রমণ শুরু করে।
আব্দুল্লাহ বিন কায়স বিন কাসিমের নির্দেশ মতো বিদ্রোহীদের দমনে ওদের বাড়ি ঘরে আক্রমণ চালালেন। কোন কোন জায়গায় বিদ্রোহীদের সাথে প্রচণ্ড লড়াই হলো। এ ধরনের একটি তীব্র লড়াইয়ের পর বিদ্রোহীরা যখন বিপুল পরিমাণ সহযোদ্ধার লাশ ফেলে পালাতে বাধ্য হলো, তখন আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজন বলল, আজকের লড়াইয়ে বিজয় রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল, মনে হয় সে এবং অনুগত কয়েকজন কমান্ডারও নিহত হয়েছে। পরে মৃতদেহ তল্লাশী করে বিজয় রায়ের মরদেহ পাওয়া গেল। বিজয় রায়ের মত্য এবং আব্দুল্লাহ বিন কায়সের দুর্দান্ত দমন অভিযানে বিদ্রোহীরা রণে ভঙ্গ দিলো এবং সম্পূর্ণ বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রনে এসে গেল।
বিদ্রোহীদের বিভিন্ন আস্তানা থেকে মূল্যবান আসবাবপত্র ও ধনদৌলত, গণীমত হিসাবে মুসলিম সেনাদের হস্তগত হলো। বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রৌপ্য কাপড় এবং আহার সামগ্রী পাওয়া গেল। গ্রেফতারকৃতরা জানালো, বিদ্রোহীদের উজ্জীবিত রাখার জন্যে অল্প সময়ের মধ্যে বিত্তশালীদের কাছ থেকে বিজয় রায় বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করেছিল। সময় মতো বিন কাসিম যদি বিদ্রোহ দমনে কঠোর পদক্ষেপ না নিতেন, তাহলে বিদ্রোহীরা বিন কাসিমের জন্য ভয়ানক দুর্ভাবনার কারণ হয়ে উঠত। অতঃপর বিভিন্ন বিদ্রোহী গোত্রের গোত্রপতিরা বিন কাসিমের দরবারে সাধারণ ক্ষমার আবেদন করল। প্রত্যেক গোত্রপতিদের বাৎসরিক এক হাজার দিরহাম জিজিয়া দেয়ার শর্তে বিন কাসিম তাদের ক্ষমা করলেন। গোত্রপতিরাও এই শর্ত মেনে নিয়ে আনুগত্যের অঙ্গীকার করল। অনেক গোত্রপতি তো বিশ্বাসই করতে পারছিল না এমন পরাক্রমশালী বিজয়ী বাহিনীর সেনাপতি এতোটা নমনীয় শর্তে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করতে পারেন।
এদিকে বিদ্রোহীদের থেকে প্রাপ্ত গণীমতের সম্পদ থেকে বায়তুলমাল তথা সরকারের প্রাপ্য অংশ আলাদা করে বসরায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে মুহাম্মদ বিন কাসিম হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে সিসিম দুর্গ বিজয় এবং বিদ্রোহ দমনের ঘটনা বিস্তারিত লিখলেন। সিসিম দুর্গে তিনি দুজন শাসক নিযুক্ত করলেন, প্রধান শাসকের দায়িত্ব পেলেন বিদ্রোহ দমনকারী ডিপুটি সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন কায়স আর তার সহকারী হলেন হুমাইদ বিন বিদায়।
পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা করছিলেন বিন কাসিম। এরই মধ্যে বসরা থেকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পয়গাম এলো। পয়গামের শুরুতে বোধী অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনের প্রশংসা করা হয়েছে। অতঃপর হাজ্জাজ পয়গামে নির্দেশ দিলেন, অগ্রাভিযান মূলতবি করে এখন পুনরায় নিরূন দুর্গে প্রত্যাবর্তন করো। সৈন্যদের কয়েক দিন বিশ্রাম দাও, আর এর মধ্যে জনবল ঘাটতি পূরণ করে নাও। প্রয়োজনীয় সামরিক আসবাবপত্রের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে দাহিরের উদ্দেশ্যে অভিযানে নামো।
