“তার মানে কি তুমি আমাকে মুসলিম সৈন্যদের হাতে তুলে দিতে চাও?” উক্তষ্ঠিত সুরে বলল বিজয় রায়। আসলে এটাই করা উচিত হতো। যে তশতরিতে কুমারীর মাথা রেখে সেটিতে বিন কাসিমের ছিন্ন মাথা দেখতে চেয়েছিলে তুমি, সেটিতে তোমার ছিন্ন মস্তক রাখাই ছিল উচিত কাজ। কিন্তু আমি তোমার সাথে গাদ্দারী করব না।
একটাই উপায়, তুমি আমার এই দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাও।” কাকসার হুমকিতে ভড়কে গেল বিজয় রায়। একান্ত অনুগত কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়া এখানে তার কোন সৈন্য সামন্ত নেই। রাজা কাকসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সে মুসলমানদের মোকাবেলা করা তো দূরে থাক নিজের অস্তিত্বই টেকাতে পারবে না। চরম অহংকারী ও তেজস্বী বিজয় রায় নিজের অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল। সে বুঝতে পারল, ঝটিকা বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে কাকা যতোটুকু মোকাবেলার জন্য
প্ররোচিত হয়েছিল ততটুকুই এখন মোকাবেলা না করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় তার দুর্গে অবস্থান করা হবে আত্মঘাতি। ফলে কাকসার সাথে আর কথা না বাড়িয়ে একান্ত ক’জন অনুচর ও পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্গ ছেড়ে আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়ে পড়ল সে। বিজয় রায়কে বিদায় করে রাজা কাকা দুর্গপ্রাচীরে উঠে বিন কাসিমের সৈন্যদের সম্ভাব্য আগমন পথের দিকে দৃষ্টি মেললো। অনেক দূরে নজরে পড়লো ধূলি ঝড়ের মতো। হয়তো বা এটাই হবে মুসলিম বাহিনীর আগমনী বার্তা। সে দুর্গপ্রাচীরের ওপর পায়চারী করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর অনেক দূরে পাঁচজন অশ্বারোহীকে দুর্গের দিকে আগোয়ান দেখতে পেল। বিষয়টা অনুমানের জন্যে দুর্গপ্রাচীরেই পায়চারী করতে লাগল রাজা কাকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অশ্বারোহী পাঁচজন এসে দুর্গফটকের কাছে থামল। রাজা দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে দেখলো তাদের পোশাক পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ অপরিচিত। কাকসার বুঝতে অসুবিধা হলো না এরাই আরব সৈন্য। দুর্গরক্ষী কমান্ডার আগন্তুকদের কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে রাজা কাকা জিজ্ঞেস করল, এরা কে? কোথেকে এসেছে? নাবাহ বিন হানযালার এক সহযোদ্ধা এখানকার ভাষা জানতো, সে তাকে বুঝিয়ে দিলো, দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে এরা কি জিজ্ঞেস করছে?
আমি আরব সেনা প্রধান মুহাম্মদ বিন কাসিমের পক্ষ থেকে মৈত্রীর পয়গাম নিয়ে এসেছি। মানুষের হাতে মানুষের রক্ত প্রবাহিত হওয়াকে আপনিও হয়তো পছন্দ করবেন না। এর আগে একটি নিরপরাধ তরুণীকে হত্যা করে আপনাদের কি লাভ হয়েছে?
রাজা কাকা তো আগে থেকেই সমঝোতা ও মৈত্রীর জন্য উদগ্রীব ছিল। সে ভাবছিল কি করে কার মাধ্যমে বিন কাসিমের কাছে প্রস্তাব পাঠাবে। তা ছাড়া বিন কাসিম মৈত্রী প্রস্তাব গ্রহণ করেন কি না, করলে কি কি শর্তারোপ করতে পারেন, ইত্যাকার নানা শঙ্কা ও সম্ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে কাকা দৌড়ে দুর্গপ্রাচীর থেকে নিচে নেমে ফটক খুলিয়ে বাইরে এলো এবং হাসি মুখেই নাবাহ বিন হানজালাকে স্বাগত জানালো। কাকা বলল
“আমি যদি আপনাদের সৈন্যদের জন্য দুর্গফটক খুলে দেই তাহলে আমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্কের পর্যায়টি কেমন হবে?” কি হবে আপনাদের শর্তাদি? বিন কাসিম তাকে যেসব শর্তাবলির কথা বলে
দিয়েছিলেন, নাবাহা কাকসার কাছে ব্যক্ত করলেন। কাকা তো শর্তাদির কথা শুনে হতবাক। সে বিনা বাক্য ব্যয়ে সব শর্ত মেনে নিলো। কাকা বিশ্বাসই করতে পারছিল না, কোন বিজয়ী শক্তি এ ধরনের নমনীয় শর্তাদি আরোপ করতে পারে। আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাতের জন্য আপনি কি আমার সাথে যেতে রাজী হবেন? কাকসার মনোভাব জানতে চাইলেন নাবাহ। তিনি আরো বললেন, ওহ! আমি একটি শর্তের কথা এখনো আপনাকে বলিনি, পরিবার পরিজনসহ বিজয় রায়কে আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে, এ ব্যাপারে অন্যথা করা চলবে না।
বন্ধু, আপনার পৌছতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বিজয় রায় আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমাকে প্ররোচিত করছিল। কিন্তু আমি তার কথায় সম্মত হচ্ছিলাম না। যুদ্ধ না করার ব্যাপারে আমার অনড় অবস্থান দেখে আপনাদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে সে দুর্গ ছেড়ে চলে গেছে…। আচ্ছা, আমি আপনার সাথে সম্মানিত সেনাপতির সাথে সাক্ষাতের জন্য যেতে প্রস্তুত। চলুন।
কিছুক্ষণের মধ্যে কয়েকটি উট বোঝাই করে মূল্যবান উপঢৌকন ও উপহার সামগ্রী নিয়ে রাজা কাকা বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হলো।
এদিকে বিন কাসিম তার সেনাবাহিনী নিয়ে দুর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পথিমধ্যেই তার সাথে রাজা কাকসার সাক্ষাত হলো। কাকা বিন কাসিমের আনুগত্য স্বীকার করে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিলো। বিন কাসিম তাকে আশ্বস্ত করলেন, আপনি প্রতিশ্রুতি পালন করলে শুধু আপনি ও আপনার পরিবার পরিজন নয়, আপনার সকল প্রজাদের জীবন সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে আমাদের কর্তব্য। কিছুক্ষণ পর বিন কাসিম রাজা কাকসার সাথে সিসিম দুর্গে প্রবেশ করলেন।
দুর্গে প্রবেশ করে কাকসার কাছে বিন কাসিম জানতে চাইলেন, এ অঞ্চলে যদি কাউকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয় তবে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়? এখানে কুরসীকে সবচেয়ে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়। বলল রাজা কাকা। যাকে সম্মানিত করা হয় তাকে কুরসীতে বসিয়ে তার মাথায় একটি রেশমী কাপড় দেয়া হয়।
