গেরিলা বাহিনীর গমন পথে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা জানতাম হিন্দু ধর্মে নরবলী দেয়ার রীতি আছে কিন্তু এর আগে নরবলী দানের ঘটনা আমরা কখনো প্রত্যক্ষ করিনি। আহা! সেই কুমারী মেয়েটির মা-বাবা আর ছোট দুটি ভাইকে মাটিতে পড়ে কান্নায় গড়াগড়ি করতে দেখেছি…। কি নির্মম হত্যা কাণ্ড। তাহলে আপনাদের ধর্মে এ ধরনের কাণ্ড ঘটে না? না, আমাদের ধর্মে এ ধরনের ঘটনা ঘটে না। আমরা আমাদের নবীর দেখানো পথে চলি। আমাদের পথে যদি কোন অহংকারী শাসক সামরিক শক্তির অহমিকায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা সেই ভ্রষ্টচারী অহংকারীর রক্ত প্রবাহিত করতে কুণ্ঠাবোধ করি না। বললেন শা’বান ছাকাফী।
গোয়েন্দা প্রধান পুনর্বার মুসলিম শিবিরে আসা সেই দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে বিন কাসিমের কাছে হাজির হলেন। তিনি তাকে সবিস্তারে ওদের বলা কাহিনী জানালেন। বললেন, গতরাতে আমাদের ওপর ভয়াবহ এক কেয়ামত ধেয়ে আসছিল, এরা দু’জন সেটিকে রুখে দেয়ার দাবী করছে।
এটা আল্লাহ তাআলার অপার মেহেরবানী, বললেন বিন কাসিম। চাচা হাজ্জাজ যে আমাদেরকে বারবার আল্লাহর দরবারে দোয়া করা, আল্লাহর মদদ কামনা করা এবং রাতের বেলায় ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকার কথা জোর দিয়ে বলছিলেন, এই বলা অর্থহীন নয়। রাতের বেলায় যেখানে সমগ্র বাহিনী ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত আল্লাহর সাহায্যের আশায় ক্রন্দরত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে সেখানে নরবলী দানকারী খোদাদ্রোহী আগ্রাসী বাহিনী এসে অন্ধ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
তিনি ধৃত গোয়েন্দাদের জিজ্ঞেস করলেন, সিসিমের রাজা কাকা আর কি কি পরিকল্পনা এঁটেছে?
আসলে সে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না, বলল এক গোয়েন্দা। বিজয় রায়ের প্ররোচনায় সে যুদ্ধ করতে রাজী হয়ে যায়। আপনি যদি আমাদের কথা বিশ্বাস করেন, তাহলে কাকসার কাছে দূত পাঠিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব করতে পারেন। ‘বিজয় রায় সমঝোতা করতে রাজি হবে না,’ বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
সে না মানলেও কিছু যায় আসে না। কারণ এখন আর তার হাতে কোন সৈন্য নেই। সে তো এই দুর্গে আশ্রয় প্রার্থী। বলল অপর গোয়েন্দা।
ওদের সাথে সামরিক কলা কৌশল নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না বিন কাসিম। কারণ সামরিক কলা কৌশল নিয়ে ওদের সাথে আলোচনা করা তিনি যৌক্তিক মনে করেননি। গোয়েন্দা প্রধানকে ইঙ্গিতে কাছে ডেকে বিন কাসিম বললেন, এদের সম্মানের সাথে থাকা খাওয়া এবং ভালো কাপড় চোপড় পরিধানের ব্যবস্থা করে দিন।
মহামান্য সেনাপতি আমাদেরকে আপনার ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ দিন। এর চেয়ে আমাদের জন্যে আর সম্মানের জিনিস কি হতে পারে। বললো এক গোয়েন্দা। আপনি অনুমতি দিলে আমরা মুসলমান হিসাবে আপনার সেনাদলে যোগদান করতে আগ্রহী। অতঃপর উভয়েই কালেমা পড়ে বিন কাসিমের হাতে হাত রেখে ইসলামে দীক্ষা নিলো। বিন কাসিম এদেরকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে বললেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
রাতেই বিন কাসিম সৈন্যদেরকে সকাল বেলায় অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। ফলে সকাল বেলায় অভিযান শুরু করার জন্যে সবাই প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এদিকে যে সিসিমের অবস্থা ভিন্ন এ সম্পর্কে মোটেও কোন তথ্য জানা ছিল না বিন কাসিমের। নওমুসলিম গোয়েন্দার কাছ থেকে শুনে সকাল বেলা চারজন নিরাপত্তারক্ষীসহ গোয়েন্দা ও দূতিয়ালীতে পারদর্শী খুবই মেধাবী ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন বাকপটু যোদ্ধা নাবাহ বিন হানযালাকে অগ্রবর্তী দূত হিসাবে সিসিম দুর্গের রাজা কাকসার কাছে পয়গাম দিয়ে পাঠালেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেদিলেন, সিসিমের রাজা কাকাকে বলবে, সে যেন বিনা রক্তপাতে দুর্গ আমাদের হাতে তুলে দেয় এবং আমাদের আনুগত্য স্বীকার করে। তাহলে স্বপদে তাকে বহাল রাখা হবে এবং তার ও দুর্গের সকল অধিবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব থাকবে আমাদের ওপর। বিন কাসিমের পয়গাম ও দিক নির্দেশনা নিয়ে দূত নাবাহ বিন হানযালা সৈন্যদের আগে দ্রুতগতিতে রওয়ানা হলেন।
এদিকে সিসিম দুর্গে বিজয় রায় ও রাজা কাকসার মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিলো। ঝটিকা বাহিনীর পরাজয় আমার কাছে মনে হচ্ছে অশুভ সংকেত, বিজয় রায়ের উদ্দেশ্যে বলল রাজা কাকা। এতে পরিষ্কার বোঝ
যাচ্ছে, আমরা যদি মুসলিম সৈন্যদের অবরোধ ভাঙতে চেষ্টা করি তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। ‘কাপুরুষ হয়ো না কাকা বলল বিজয় রায়। অবরোধ তো এখনো হয়নি। আমি দাহিরের কাছে পয়গাম পাঠিয়ে আরো সৈন্য নিয়ে আসবো। তোমার কাছেও তো সৈন্য রয়েছে। তাছাড়া আমার প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত আঠারশ সৈন্য তো রয়েই গেছে। এদেরকে আমরা আগেই দুর্গের বাইরে পাঠিয়ে দেবো। মুসলমানরা অবরোধ করলে এরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবে।
বিজয় রায়! রাজা দাহিরের ভাতিজা হওয়া ছাড়া তোমার আর কি গুণ আছে, বলো? সিস্তানে তোমার সৈন্যের অভাব ছিল? তুমি যদি এতোই যুদ্ধ পারদর্শী হতে তাহলে সেখান থেকে পালিয়ে আসলে কেন? বলল কাকা। আমি যা বলছি, তা বোঝার চেষ্টা করো। আমি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধ ধর্মে এ ধরনের খুনোখুনির অনুমতি নেই। কোন মানুষের জীবনহরণ করাকে আমার ধর্ম মোটেও অনুমোদন দেয় না। অথচ তোমরা আমার সামনে একটি অবলা কিশোরীকে হত্যা করে তার মস্তক ঝিলে ফেলে দিয়েছ। তাতে কি লাভ হয়েছে….? হতাশা আর ব্যর্থতা ছাড়া কি পেয়েছে….? এই নিরপরাধ কুমারীর প্রেতাত্মা এখন আমাদের ওপর গযব হয়ে দেখা দেবে। তোমাদের কৃত অপরাধের কারণে আমার জনগণের ওপর গযব ধেয়ে আসছে। আমি অপরাধের কাফফারা আদায় করবো। আমার চোখের সামনে আর একটি মানুষেরও রক্ত প্রবাহিত হতে আমি দেবো না।
