সেই রাতের শেষে ফজরের নামাযান্তে বিন কাসিম তার তাবুতে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন টহলরত সৈন্যরা এ দুই হিন্দু সৈন্যকে পাকড়াও করে নিয়ে এলো। তারা ধৃতদেরকে নিয়ে গেল গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর কাছে। তারা জানালো, এরা আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চায়। প্রহরী সৈন্যরা আগেই তাদের তরবারী ও বর্শা ছিনিয়ে নিয়েছিল। শা’বান ছাকাফী তাদের দেখেই চিনে ফেললেন।
আবার এসেছ তোমরা? এখন আবার কোন মেয়েদের এনেছো? এখন আর তোমাদের জ্যান্ত ছেড়ে দেয়া হবে না। আগের বেলায় আমাদের প্রধান সেনাপতি দয়া পরবশ হয়ে তোমাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু এবার তেমনটি করতে দেয়া হবে না।
আমরা সেই উপকারের বদলা দিয়েছি। বলল ধৃতদের একজন। সেই সাথে আমরা এখন মরতে আসিনি, জেনে বুঝে জীবিত থাকার জন্য এবং আমৃত্যু আপনাদের সাথে থাকার জন্যই এসেছি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে শত্রু গোয়েন্দাদের কথায় নির্ভর করতে পারছিলেন না শা’বান ছাকাফী। কিন্তু এদের দাবী ও প্রস্তাবও উড়িয়ে দেয়ার মতো ছিল না। তারা জানালো, ফিরে গিয়ে তারা বিজয় রায় ও রাজা কাকাকে বলেছিল মুসলমানদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। তারা ফিরে গিয়ে শাসকদের যা বলেছিল এর সবই জানালো শাবান ছাকাফীকে। তাদের একজন বলল, এক পর্যায়ে আমরা বিজয় রায়কে বললাম, আমাদেরকে এমন কোন কাজের দায়িত্ব
দিন যাতে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। আমরা সেটি করে দেখিয়ে দেবো কিন্তু মুসলিম শিবিরে গিয়ে গোয়েন্দা গিরি করতে পারব না। কারণ আমরা সৈনিক, যুদ্ধ ময়দানে বীরত্ব দেখানোর কাজেই আমরা পারদর্শি। আমাদের ব্যর্থতার জন্য বিজয় রায় উভয়কে হত্যা করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিন্তু কথায় কথায় তার সিদ্ধান্ত বদলে গেল, রাতের অন্ধকারে মুসলিম শিবিরে চোরাগুপ্তা হামলার সিদ্ধান্ত নিলো সে। অবশ্য আমরাই তাকে অন্য কোন ভাবে মুসলিমদের মোকাবেলা করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। চোরা গুপ্তা আক্রমণ ছাড়া বিকল্প কোন কার্যকরপন্থা ছিল না।
আমরা বললাম, তাহলে আমরা মুসলিম সৈন্যদের খোঁজ রাখি। যেখানে তারা সর্বশেষ শিবির স্থাপন করে সেখানে রাতের অন্ধকারে আমাদের সৈন্যদের আমরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে এবং ঘুমন্ত মুসলিমদের শেষ করে দেবো। তারা শা’বান ছাকাফীকে জানালো, এরপর আমরা বেশ বদল করে মুসলিম বাহিনীর আগমনের খোঁজ খবর নিতে বেরিয়ে পড়লাম, সেই সাথে বিজয় রায়ের বাহিনীকে ব্যর্থ করার পরিকল্পনা তৈরি করলাম। অবশেষে মুসলিম বাহিনীর সর্বশেষ শিবির দেখে সিসিমে ফিরে গেলাম। আমরা আপনাদের প্রধান সেনাপতির দূরদর্শীতার প্রশংসা না করে পারছি না। বলল অপর ব্যক্তি। আপনাদের সেনাপতি এমন রাস্তা দিয়ে সৈন্যদের নিয়ে এসেছেন যে পথে কোন জন মানুষের যাতায়াত নেই। দুর্গম ও অসমতল পথে আপনারা অগ্রসর হয়ে এমন এক জায়গায় শিবির স্থাপন করেছেন যে, কেউ চিন্তাও করতে পারেনি, এখানে এতো বিশাল একটা বাহিনী শিবির স্থাপন করতে পারে।
আমরা কাকতালীয়ভাবেই আপনাদের আগমন ও শিবির দেখে ফেলেছিলাম। নয়তো স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আমাদের এই দিকে আসার কথা ছিল
আমরা ফিরে গিয়ে বিজয় রায়কে আপনাদের শিবির স্থাপনের কথা জানালাম। সেই সাথে আমরা এও প্রস্তাব করলাম, ঝটিকা হামলাকারী দলের মধ্যে আমাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করুন এবং ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।
আমাদের উৎসাহ দেখে বিজয় রায় ঝটিকা বাহিনীকে রাতের বেলায় পথ দেখিয়ে মুসলিম শিবিরে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমাদের ওপর ন্যস্ত করল। আমরা ইচ্ছা করলে বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত আঠারশ গেরিলা সৈন্যকে সোজা আপনাদের শিবিরে নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু আমরা আপনাদের
সেনাপতির দয়া ও আপনাদের ইবাদত দেথে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, শত্রু সৈন্যকে পাকড়াও করে জীবন্ত মুক্ত করে দেয়ার প্রতিদান দেবই বলে স্থির করলাম।
এ জন্য রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে গেরিলা অভিযানে আসা সৈন্যদেরকে আমরা ভিন্ন পথে নিয়ে গিয়ে দিকভ্রান্ত করে শিবির থেকে অনেক দূরে ঘুরাতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে ওদের জানালাম, আমরা তো রাস্তা ভুলে অনেকটা সরে এসেছি। ফের ঠিক রাস্তায় আসার কথা বলে আবারো ওদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাত পার করে দিলাম। অবশেষে যখন পূর্বাকাশে আলো দেখা গেল, তখন তাদেরকে ফিরে আসার পথ দেখিয়ে বললাম, এখন তো রাত শেষ। আমাদের ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। দিনের আলোয় মুসলিম বাহিনী আমাদের দেখতে পেলে একজনকেও জীবন নিয়ে ফিরে যেতে দেবে না। একথা শুনে সবাই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। আর ফেরার পথে হঠাৎ আমরা দু’জন দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবার অলক্ষ্যে এদিকে রওয়ানা হলাম। আপনারা ভোরের ইবাদত শেষ করেছেন, আমরাও এখানে এসে পৌছেছি। আপনিই এখন আমাদের ভাগ্য নিয়ন্তা। ইচ্ছে করলে আপনি আমাদের হত্যা করতে পারেন কিন্তু আমরা ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি তোমরা কি তোমাদের ধর্মের প্রতি এতোটাই ঘৃণা পোষণ করো? বললেন গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী।
আগে ঘৃণ করতাম না কিন্তু আপনাদের ইবাদত বন্দেগী আমাদের এতোটাই আকৃষ্ট করল যে, আমাদের ধর্মের প্রতি আমরা বীশ্রদ্ধ হয়ে পড়ি। তাছাড়া নিজ ধর্মের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির আরেকটি কারণ হলো, গেরিলা বাহিনীর সাফল্যের জন্য সিসিম মন্দিরে একটি কুমারী বলি দান করে তার ছিন্ন মস্তক ঝিলে নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী গোয়েন্দা দুজন শা’বান ছাকাফীর কাছে জানতে চাইলে আপনারাও কি এ ধরনের সাফল্যের জন্য নরবলী দিয়ে থাকেন? নরবলী দিয়েই তো আমরা এ পর্যন্ত এসেছি’ বললেন গোয়েন্দা প্রধান। কিন্তু তোমাদের মতো আমরা কুমারী বলি দান করি না। আমরা বরং এ ধরনের কুমারী সে যে ধর্মেরই হোক তাদের সুভ্রম রক্ষার জন্য আমাদের জীবন কুরবানী করে দেই। অত্যাচার ও জুলুমের ভয়ানক অবস্থা দেখুন, বলল অপর গোয়েন্দা। গেরিলা বাহিনীর বিজয়ের জন্য যে কুমারীকে বলিদান করা হয়েছে, তার রক্ত
