আমি বলতে পারি কি হয়েছে? বলল কাকা। ওরা মুসলিমদের ধ্বংস করে ওদের ধন সম্পদ কব্জা করায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। আর তাদের নারীদের নিয়ে টানা হেঁচড়া করছে। এসে যাবে, হয়তো আসছে।
“আচ্ছা, তোমার কথাই যেন সত্যি হয়, দেখো কি করে আসে। আমার কাছে তো আলামত ভালো মনে হচ্ছে না।” বলল বিজয় রায়। এমন সময় পূর্ব দিকে ধূলিবালির আরবণ দেখা গেল। দেখতে দেখতে ধূলিময় অন্ধকার আরো ঘনিভূত হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলল। কিছুক্ষণ পর ধূলিস্তর ভেদ করে নজরে পড়ল অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যদের আগমন। বিজয় রায় ও কাকা ঝটিকা বাহিনীর আগমন দেখে দুর্গপ্রাচীর থেকে দৌড়ে নীচে নেমে এলো। প্রধান ফটকেই তাদের ঘোড়া অপেক্ষমান ছিল, উভয়েই এক লাফে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ঝটিকা বাহিনীকে স্বাগত জানানোর জন্যে ঘোড়া দৌড়াল।
তারা উভয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া হাকিয়ে ঝটিকা বাহিনীর সামনে গিয়ে থামল। তাদের প্রত্যাশানুযায়ী সেনারা বিজয়ের কোন জয় ধ্বনী করল না। ঝটিকা বাহিনীর কমান্ডারের চেহারা ছিল হতাশায় বিমর্ষ। আমি কোন ব্যর্থতার দাস্তান শুনবো না, ক্ষোভে কম্পমান কণ্ঠে বলল বিজয় রায়।
বিজয় রায়ের গর্জনে কমান্ডার দয়ার্দ্র দৃষ্টিতে তাকালো। মুখ ফুটে কিছু বলল না। বিজয় রায়ের আগমনে ঝটিকা বাহিনী পদাতিক ও অশ্বারোহী সবাই থেমে গেল। বিজয় রায় ঘোড়ার বাগ ধরে এক চক্কর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে সবার চেহারা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে নিলো, তাদের মধ্যে কাউকেই আহত হওয়ার মতো কোন চিহ্ন দেখা গেল না। চার পাশে চক্কর দিয়ে বিজয় রায় ফিরে এলো কমান্ডারের সামনে। কমান্ডারের সামনে এসে তার তরবারীর হাত ধরে এক টানে তরবারী কোষমুক্ত করল। রোদের আলোতে ঝলসে উঠল তরবারী। গভীরভাবে তরবারীটা একবার দেখে নিলো বিজয় রায়।
তরবারী তো তেমনই রয়ে গেছে যেমনটি নিয়ে গিয়ে ছিলে। তরবারী কোষমুক্তই করোনি? কি হয়েছে কথা বলছ না কেন? গর্জে উঠল বিজয় রায়।
মহারাজের জয় হোক’ বিধ্বস্ত কণ্ঠে বলল কমান্ডার। আমরা মুসলিম শিবির পর্যন্ত পৌঁছতেই পারিনি।
কেন পৌছতে পারলে না? কোথায় গিয়ে মরে ছিলে তোমরা? না। কাপুরুষের মতো ভয়ে সেখানে যেতেই সাহস পাওনি?
মহারাজ আমাদের পথ প্রদর্শক হিসাবে যে দু’জন আমাদের সাথে পাঠিয়েছিলেন তারা আমাদেরকে মুসলিম শিবিরে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তারা আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেল যেখানে কোন কিছুই ছিল না। আমরা যখন ওদের জিজ্ঞেস করলাম, মুসলিম শিবির কোথায়? তখন তারা বলল দুঃখিত, আমাদের ভুল হয়ে গেছে আমরা পথ হারিয়ে অনেক দূরে এসে গেছি। এরপর ওরা আমাদেরকে নিয়ে অচেনা পথে ঘুরতে লাগল এভাবেই শেষ হয়ে গেল রাত আমরা আর মুসলিম শিবির পর্যন্ত পৌছতে পারলাম না। যখন ভোর হয়ে পূর্বাকাশে সূর্য উঁকি দিলো, তখন আর আমাদের ফিরে আসা ছাড়া গত্যন্তর রইলো না। কারণ দিনের বেলায় এতো বড় বাহিনীর মুখোমুখি হলে আমাদের অবস্থা কি হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কমান্ডারের তরবারীর বাট ছিল বিজয় রায়ের হাতে। রাগে ক্ষোভে আগ্নেয়গিরি মতো ফুসছিল সে। হঠাৎ ঝকমকে তরবারীটা প্রচণ্ড শক্তিতে ঘুরালো বিজয় রায়। কমান্ডারের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে গিয়ে পড়ল, আর শরীরটা গড়িয়ে পড়ল ঘোড়ার পিঠ থেকে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়ল জমিন। হতভাগাটার মাথাটা ঝিলে ফেলে দাও। ওই শয়তান দুটা কোথায় যাদেরকে পথ দেখানোর জন্য তোমাদের সাথে দিয়েছিলাম? সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল বিজয় রায়।
আঠারো শত সৈন্যের মধ্যে তন্নতন্ন করে সবাইকে যাচাই করা হলো কিন্তু গাইড দু’জনকে এদের মধ্যে পাওয়া গেল না। কিন্তু এই সময়ে এরা এখান থেকেও পালিয়ে গেলে কেউ না কেউ দেখতো। অবশেষে ঝটিকা দলের ডেপুটি কমান্ডার জানালো, আমরা ফেরার পথে আর ওদের পাইনি, ওরা আমাদের ফিরে আসার সময় সবার অগোচরে পালিয়ে গেছে। কমান্ডারের বিচ্ছিন্ন দেহ থেকে ছিন্ন মাথা এক সিপাহী ঝিলের মধ্যে নিক্ষেপ করল। আর ঝিলের পাড়ে রাখা তশতরি খালিই পড়ে রইলো। সেটায় আর বিন কাসিমের মাথা রাখা সম্ভব হলো না।
সেই দুই গাইডকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। বিজয় রায় ঘোষণা করল, ওদেরকে যেখানেই পাবে ওদের মাথা কেটে ঝিলে ফেলে দেবে আর ওদের দেহ পোড়ানোর বদলে জঙ্গলে ফেলে রাখবে।
আসলে ওদের দুজনের দেখা পাওয়ার সম্ভব ছিল না। তারা তখন সিসিম দুর্গের পরিবর্তে মুসলিম শিবিরে গিয়ে হাজির হয়েছে। তারা বিজয় রায়ের ক্ষোভের মুখে পড়ার পরিবর্তে মুসলিম শিবিরে পরম যত্নে আরাম করছিল।
এরা দুজন ছিল সেই দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা যাদেরকে দু’জন তরুণী ও একজন বয়স্কা মহিলা সঙ্গে করে বিন কাসিমের সিস্তান দুর্গে পাঠিয়েছিল বিজয় রায় ও কাকা গোয়েন্দা কাজের জন্য। তারা আশ্রয় প্রার্থী হিসাবে দুর্গে প্রবেশ করেছিল বটে কিন্তু গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তাদের পাকড়াও করে তাদের দূরভিসন্ধি বের করে ফেলেছিলেন। গোয়েন্দা প্রধানের জেরার মুখে এরা স্বীকার করেছিল তারা যে গোয়েন্দাবৃত্তির জন্য কৃষকের বেশে নাটক সাজিয়ে দুর্গে এসেছে। কিন্তু গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগ সত্ত্বেও সেনাপ্রধান বিন কাসিম তাদেরকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
