মুহাম্মদ বিন কাসিম সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন রাতের বেলায় কুরআন তেলাওয়াত, শিক্ষা ও ইবাদতের পাশা পাশি তারা যেন জরুরি বিশ্রাম করে কিন্তু সে রাতে কোন সৈনিকই বিশ্রাম ও আরামের জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দেয়নি। সকল সৈন্যই কুরআন পাঠ ও নামাযে রাত কাটিয়েছে। সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা ও সৈনিকের স্ত্রী সন্তান তাদের সাথেই শিবিরে অবস্থান করছিল। তখনকার সময়ে প্রতিটি যুদ্ধেই কিছু সংখ্যক লোককে স্ত্রী সন্তান যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতো। বিন কাসিমের সৈন্যদলেও কিছু সংখ্যক সৈন্য পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছিল। সৈন্যদের সাথে আসা মহিলারা আহত সৈন্যদের সেবা শুশ্রুষা করত। সেই রাতেও রাত জেগে মহিলারা আহত সৈন্যদের দেখা শোনা করছিল।
আর এদিকে আঠারো’শ হিন্দু যোদ্ধা বিজয় রায়ের নির্দেশে রাতের অন্ধকারে গুপ্ত হামলা চালানোর জন্যে এগিয়ে আসছিল। সে দিন মুসলমানরা কোন মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। মুসলিম শিবিরের পাহারাদার ও
শিবিরের বাইরে টহলদল ছাড়া আর কোন সৈনিকের যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। রাতের অন্ধকারে শত্রু পক্ষের অজ্ঞাতে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে শত্রুদের পর্যস্ত করা ছিল মুসলমান সেনাদের ঐতিহ্য। কিন্তু আজ বিজয় রায় ও রাজা কাকসার তৈরি বাহিনী মুসলমানদের ওপর ঝটিকা আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছিল। অথচ এদিকে সেইরাতে ঝটিকা আক্রমণ হতে পারে এমনটি ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি মুসলিম শিবির। ফলে তারা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, অসতর্ক। মুসলিম শিবিরে নারী শিশুদের অবস্থানের কারণে হিন্দু সেনাদের রাতের আক্রমণ আরো বেশি বিপর্যয়কর হয়ে ওঠতে পারত। পৌত্তলিক হিন্দু সৈন্যরা এক কুমারীকে বলি দিয়ে সেই কুমারীর রক্ত মাড়িয়ে অভিযানে বের হয়েছিল, তাদের সাফল্যের জন্য মন্দিরে চলছিল ভজন ও পূজা-অর্চনা। রাত ব্যাপী মন্দিরগুলোতে পুরোহিত পণ্ডিতেরা জড় মূর্তিগুলোর সামনে বসে সাফল্যের জন্য কাকুতি মিনতি করছিল।
আর এদিকে বিন কাসিমের সৈন্যরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সাহায্য প্রাপ্তির জন্য ইবাদতে লিপ্ত ছিল। সেই রাতের ঝটিকা আক্রমণ সফল হলে বিন কাসিমের বাহিনীর অগ্রাভিযান শুধু সেখানেই রুদ্ধ হতো না, আরব সাগরের অথৈ পানিতে তাদের চিহ্নও হারিয়ে যেত।
সিসিম দুর্গ থেকে এক দুপুরের পথ দূরে বিন কাসিমের বাহিনী শিবির স্থাপন করেছিল। জায়গাটি ছিল তুলনামূলকভাবে নীচু। সেই সাথে এলাকাটি ছিল অসমতল। জায়গায় জায়গায় টিলা ঝোপ ঝাড় ও গাছ গাছালীতে আকীর্ণ। একটা জায়গায় এতোটা পানি হয়েছিল যেন বিশাল একটা পুকুর। বিন কাসিম সিসিমের যাতায়াত পথ থেকে অনেকটা দূরের এই স্থানে এসে শিবির স্থাপন করেন।
বিন কাসিমের অসাধারণ প্রজ্ঞার এটি একটি উদাহরণ ছিল যে, তিনি কখনো পরিচিত পথে অভিযান পরিচালনা করতেন না। সেই দিনের শিবিরটি তিনি এমন এক জায়গায় স্থাপন করেছিলেন, বিশাল আসবাবপত্র ও সাজ সরঞ্জামসহ গোটা বাহিনীকে সেই নীচু জায়গাটি আড়াল করে ফেলেছিল। অবশ্য এক্ষেত্রে একথাও বলা যায় যে, রাজা কাকা ও বিজয় রায় মুসলিম বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েই ঝটিকা বাহিনীকে আক্রমণের জন্য পাঠিয়ে ছিল।
বিন কাসিমের রাতের শিবির ছিল কুরআন তেলাওয়াতে মুখরিত। মাঝে মধ্যে আহত সৈনিকদের উহ্ আহ্ তেলাওয়াতের গুঞ্জরনে তলিয়ে যেত। যখনই কোন আহত সৈনিক যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠত সেবারত মহিলারা দৌড়ে সেই সৈনিকের কাছে ছুটে যেত।
রাত বাড়ার সাথে সাথে এমন আশঙ্কা ছিল যে রাতের তেলাওয়াতের গুঞ্জরণ ও আহত সৈন্যদের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠার সাথে হিন্দু আগ্রাসীদের আক্রমণের আর্তনাদ মিশে একাকসার হয়ে যাবে কিন্তু রাত গভীর হতে হতে এক সময় তেলাওয়াতের গুঞ্জরণ স্তিমিতি হয়ে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। আর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে উচ্চ আওয়াজে ধ্বনিত হলো ফজরের আযান “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার”। আযানের মধুর ধ্বনি ইথারে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেল পৌত্তলিক ভারতের সিসিমের বাতাসে। ছড়িয়ে পড়ল বহু দূর পর্যন্ত।
মুসলিম শিবিরে ফজরের নামাযের জন্য সকল সৈন্যরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল। গোটা শিবিরে পিনপতন নীরবতা। সেনাপতি বিন কাসিমের কুরআন তেলাওয়াতের মধুর ধ্বনি যেন নির্জন এই এলাকার বৃক্ষ তরুলতাকেও এক অপার্থিব মুগ্ধতার আবেশে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। এদিকে সেনাবাহিনীর ঘোড়া ও ভারবাহী উটগুলো তখন খাবারের জন্যে হ্রেষাব করছে। সিসিমের প্রধান মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি তখনো অবিরাম বেজেই চলছে। ভোর হতেই বিজয় রায় ও রাজা কাকা দুর্গপ্রাচীরের ওপরে এসে দাঁড়াল। উভয়েই ঝটিকা আক্রমণকারীদের আগমন প্রত্যাশায় পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভোরের পূর্বাকাশ আলোকিত করে উঁকি দিলো দিবাকর। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল সকালের মিষ্টি রোদ। মরুভূমির সূর্যোদয়ের দৃশ্য খুবই মনোরম হয়ে থাকে কিন্তু সে দিনের সূর্যোদয় রাজা কাকা ও বিজয় রায়ের জন্য ছিল খুবই মলিন অসুন্দর। কারণ তারা ভোরের সূর্যালোক দেখা নয় অপেক্ষা করছিল বিজয়বার্তা নিয়ে অভিযানকারীদের ফিরে আসার দৃশ্য দেখার জন্যে।
সকালের সূর্য ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করল, বাড়তে থাকল উষ্ণতা। মুগ্ধতার পরিবর্তে বিজয় রায়ের মধ্যে দেখা দিলো উদ্বেগ অস্থিরতা। অপেক্ষার পালা দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিজয় রায়কে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তুলল। এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বিজয় রায় বলল, কি ব্যাপার, ওরা কি সবাই মারা পড়ছে না কি? এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
