পণ্ডিত মহারাজ শুভক্ষণ বলে দেবেন। যে রাতে তোমরা আক্রমণ করবে সে রাতে পণ্ডিতজী মন্দিরে ভজনা করবেন, যাতে তোমরা বিজয় লাভ করতে পারো। বলল বিজয় সেনরায়।
পরদিন সকালে মন্দিরের পুরোহিত এসে দু’দিন পরের রাতে আক্রমণের শুভক্ষণ বলে মত প্রকাশ করল। একথাও বলল যে, আক্রমণের সময় হবে অর্ধরাতের পর।
কোন বলিদান করতে হবে কি? জিজ্ঞেস করল বিজয় রায়।
“এক কুমারী। এক কুমারী বলিদান করতে হবে। আক্রমণে যাওয়ার আগে আক্রমণকারীদের পথে এক কুমারীর তাজা রক্ত ছিটিয়ে দিতে হবে; আর কুমারীর মাথা মানচার ঝিলে ডুবিয়ে রাখতে হবে, হামলাকারীরা আক্রমণে যাওয়ার আগে সেই ঝিল থেকে এক চুমু পানি পান করে যাবে।” বলল পণ্ডিত।
দিন শেষেই এলো শুভ রাত। রাতের আগেই আটশ জাট পুরুষ তরবারী, বর্শা, তীর, ধনুক নিয়ে সিসিম দুর্গে এসে জড়ো হলো। এদিকে চেন্নাই গোত্রের এক হাজার প্রশিক্ষিত যুবক তাদের সাথে যোগ দিলো। চেন্নাই যুবকদের সবাই ছিল অশ্বারোহী। জাটদের কেউ ছিল অশ্বারোহী আবার কেউ পদাতিক। জাট ও চেন্নাই গোত্রের আঠারোশ যোদ্ধাকে বিজয় রায় শেষ দিক নির্দেশনা দিচ্ছিল। বিজয় রায় যোদ্ধাদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ উস্কাতে শুরু করল। এ দিকে মন্দিরের পুরোহিত এক কুমারীর মাথা একটি বড় ধরনের তশতরিতে নিয়ে আরো কয়েকজন পণ্ডিতের সমবিহারে দুর্গে আগমন করল। বলিকৃত কুমারীর প্রবাহিত রক্ত একটি পাত্রে জমা করাছিল। আর পুরোহিতরা ভজন গাইতে ছিল এবং থেমে থেমে মন্দিরের ঘণ্টা বাজাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর এক পণ্ডিত বড় ধরনের তশতরিতে বলি দেয়া কুমারীর ছিন্নমস্তক নিয়ে গুপ্ত হামলাকারীদের সমাবেশে হাজির হলো। এদিকে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। চার পাশে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে অসংখ্য মশাল। যে পণ্ডিত কুমারীর ছিন্ন মস্তক নিয়ে এসেছিল তার দুপাশে দুজন দীর্ঘদেহী লোক মশাল উঁচিয়ে রেখেছিল, যাতে দূর থেকেও মশালের আলোয় ছিন্ন মস্তক সবাই দেখতে পারে। তার পিছনে ভজন গাইতেছিল চারজন পণ্ডিত। বিজয় রায় তশতরি নিয়ে আসতে দেখে পণ্ডিতের দিকে এগিয়ে তার কাছ থেকে তশতরি নিজ হাতে নিয়ে একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে গুপ্ত হামলাকারীদের ছিন্নমস্তক দেখিয়ে বলল, এই কুমারীর ছিন্ন মস্তক ঝিলে নিক্ষেপ করা হবে। এরপর এই তশতরি ঝিলের পাড়ে রেখে দেয়া হবে। তোমরা সবাই এই ঝিল থেকে এক ঢোক করে পানি পান করে যাবে। এরপর তোমরা যখন মুসলিম বাহিনীকে হত্যা করে কিংবা অধিকাংশ সৈন্যকে নিঃশেষ করে দিয়ে আসবে এবং যার হাতে মুসলিম সেনাপতি বিন কাসিমের ছিন্ন মস্তক থাকবে সেটি এনে এই তশতরিতে রেখে আমাদের সামনে নিয়ে আসবে…। তোমাদের মনে রাখতে হবে, তোমাদের সাফল্যের জন্য এই কুমারী নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে। এই কুমারীর রক্ত তোমাদের গমন পথে ছিটিয়ে দেয়া হবে।
কুমারীর মস্তক বিচ্ছিন্নকারী পণ্ডিত এবার বিজয় রায়ের কাছ থেকে তশতরি নিয়ে দুর্গফটকের দিকে অগ্রসর হলো। তার পিছু পিছু আরো ক’জন পণ্ডিত ভজন গেয়ে গেয়ে এগুচ্ছিল। মন্দির থেকে ঘণ্টা ধ্বনি বাজছিল। দুর্গফটকের কাছেই ছিল ঝিলের অবস্থান। পণ্ডিত ঝিলের তীরে দাঁড়িয়ে কাটা মস্তকটি ঝিলের পানিতে ছুড়ে মারল। ছুড়ে মারা মাথাটি ঝিলের পানিতে আঁছড়ে পড়ার শব্দ চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ায় দুর্গের প্রধান ফটক খুলে গেল। ফটক দিয়ে বেরুতে শুরু করল শত শত অশ্বারোহী ও পদাতিক লড়াকু। অশ্বারোহী ও পদাতিক হামলাকারীরাও পায়দল ঝিলে নেমে সবাই চিল্প দিয়ে এক ঢোক করে পানি পান করে এগিয়ে চলল। তাদেরকে বিদায় জানানোর জন্য বিজয় রায় ও রাজা কাকাও এসে একটি উচু স্থানে দাড়িয়ে হামলাকারীদের হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
সেই যুগের মানদণ্ডে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও অমুসলিমদের মোকাবেলায় সে নিজেকে মুসলিম ঐতিহ্যের ধারকবাহক মনে করত। তিনি যতবার বিন কাসিমকে পয়গাম লিখতেন, সামরিক দিক নির্দেশনার পাশা পাশি লিখতেন, সব সময় তোমাদের সাফল্যের জন্য আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করবে। প্রত্যেক অভিযানের গমন পথে যদি কোথাও যাত্রা বিরতি করতে হয় তাহলে রাতের বেলায় সৈন্যদের সতর্ক রাখবে, জাগ্রত থাকতে বলবে। রাতে সৈন্যদের সতর্ক ও সচেতন রাখার ভালো ব্যবস্থা হলো, সৈন্যদের মধ্যে যারা কুরআন শরীফ পড়তে পারে তারা রাতের বেলায় তেলাওয়াত করবে এবং যারা কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে পারে না, তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেবে। সবার উচিত বেশি বেশি নফল নামায পড়া এবং নামাযের পর আল্লাহ তাআলার কাছে সাফল্যের জন্য দোয়া করা। সেই সাথে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বেশি বেশি পাঠ করবে।
সেই রাতের সিসিম থেকে কিছুটা দূরবর্তী যাত্রা বিরতির পর তাঁবু ফেলে বিন কাসিমের সৈন্যদের অধিকাংশই তেলাওয়াত করছিল, আর যারা কুরআন শরীফ পড়তে জানত না, তাদেরকে অন্যান্যরা কুরআন পড়া শেখাচ্ছিল। কেউ কেউ নফল নামাযে লিপ্ত ছিল। তাবুর ফাকে ফাকে জ্বলছিল মশাল। সকাল বেলায় সৈন্যদের সিসিমের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। তারা আশা করছিল দুপুর নাগাদ তারা সিসিম দুর্গ অবরোধ সম্পন্ন করতে পারবে।
