সময়ের মধ্যে গোটা বাহিনী সব কিছু নিয়ে সিন্ধু নদী পেরিয়ে নদীর ওপারে চলে গেল।
সিস্তান থেকে সিসিম যাওয়ার পথে বিন কাসিম কয়টি জায়গায় এবং কোন কোন জায়গায় যাত্রা বিরতি করেছিলেন ইতিহাস তা উল্লেখ করেনি। শুধু এতটুকু জানা যায়, পথিমধ্যে তিনটি শত্রু দুর্গ ছিল সেগুলো তিনি অবরোধ করে দখলে নিয়েছিলেন এবং প্রতিটি দুর্গ দখল করতে আট দিন সময় লেগেছিল। এভাবে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে সিস্তান থেকে সিসিম পর্যন্ত পৌছতে তার তিন মাস লেগে গিয়েছিল।
অবশেষে এক দিন বিন কাসিমের সেনাবাহিনী সিসিম থেকে অনতি দূরে বন্ধা নামক স্থানে পৌছে গেল। সেটিই ছিল সিসিমের আগে শেষ যাত্রা বিরতি। অন্যান্য যাত্রাবিরতির চেয়ে এখানে কিছুদিন বেশি থাকার সিদ্ধান্ত নেন বিন কাসিম। কারণ দীর্ঘ পথ এক নাগাড়ে অতিক্রম করা এবং পথিমধ্যে কয়েকটি জায়গায় যুদ্ধ করে সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কাজেই সিসিম অবরোধ করার আগে সেনাবাহিনীর কিছুটা বিশ্রাম ও প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল।
এদিকে সিসিম দুর্গে অবস্থানকারী বিজয় রায় ও রাজা কাকসার কাছে বিদ্যুৎগতিতে খবর পৌছে গেল যে, বন্ধা নামক স্থানে মুসলিম বাহিনী এসে গেছে এবং সেখানে তাঁবু গেড়েছে। এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে বিজয় রায় চেন্নাই জনগোষ্ঠীর সেই এক হাজার যুবককে ডেকে পাঠালো। তাদের একত্রিত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ করতে শুরু করল। বিজয় রায় চেন্নাই যুবকদের বলল, মুসলমানরা হিংস্র এরা দেশ দখল করে লুটপাট করে এবং যুবতী তরুণীদের ধরে নিয়ে যায় আর মানুষের ধন সম্পদ ঘর বাড়ি সব তছনছ করে দেয়। বিজয় রায় চেন্নাই যুবকদের বলল, সাধারণ মানুষ এবং দেশের নারীদের সম্ভ্রম ও ধন সম্পদ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা যদি সেই দায়িত্ব পালন না করি তাহলে সবার সাথে আমাদেরকেও মুসলিম বাহিনীর গোলামী করে অবমানোকর জীবনের মুখোমুখি হতে হবে। বস্তুত যে কোন অমুসলিম স্বজাতির মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যে ধরনের অসত্য ও কাল্পনিক কাহিনী প্রচার করে বিজয় রায়ও চেন্নাই যুবকদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দেয়ার জন্য এসবের সবকিছুই প্রয়োগ করল।
এদিকে বন্ধা এলাকায় বসবাসকারী একটি অমুসলিম যাযাবর গোত্র মুসলিম সৈন্যদের আগমন দেখে তাদের ওপর রাতের অন্ধকারে গুপ্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলো। এদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা আক্রমণের আগে রাজা কাকাকে ব্যাপারটি অবহিত ও অনুমতির জন্য সিসিম দুর্গে একটি প্রতিনিধি দল পাঠালো। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের মতে, এই গোত্র ছিল জাট। জাট গোত্র ছিল হিন্দু ধর্মের প্রতি খুবই অনুরাগী। এরা বিজয় রায় ও কাকসার অপপ্রচারে জানতে পারে, মুসলমান সৈন্যরা অমুসলিম এলাকা দখল করে সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা চালায় লুটপাট করে সব কিছু তছনছ করে দেয় এবং অধিবাসীদের জোর করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে। এই অপপ্রচারের কারণে নিজেদের জাতিধর্ম রক্ষায় জাট সম্প্রদায় দৃঢ় শপথ নিল এবং রাতের অন্ধকারে গেরিলা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজার কাছে গেল। জাট গোত্রের প্রতিনিধিরা সিসিম দুর্গে গিয়ে রাজা কাকাকে তাদের উদ্দেশ্যের কথা জানালে সব চেয়ে বেশি খুশী হলো বিজয় রায়। বিজয় রায় মন্দিরের পুরোহিতদের ডেকে তাদেরকে বলল, শত্রু আক্রমণের জন্যে কোন্ সময়টা শুভ হবে তা যেন তারা বলে দেন। সেই সাথে বিজয় রায় পণ্ডিতদের কাছে জানতে চাইলো সাফল্যের জন্য কি কোন ধরনের বলিদানের প্রয়োজন হবে কি-না তাও জানাতে। পণ্ডিতরা বিজয় রায়ের নির্দেশ পালনে মন্দিরে চলে গেল এবং আক্রমণের শুভক্ষণ বের করার জন্য তপস্যা শুরু করে দিলো। জাট প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বিজয় রায় বলল, তোমরা যদি তাবুতেই মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংস করে দিতে পারো তাহলে আমরা তোমাদের রাজকীয় পুরস্কারে ভূষিত করব। তোমাদের কেউ যদি মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে জীবিত পাকড়াও করে আনতে পারো, তাকে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করা হবে, রাজ দরবারে তাকে মর্যাদার আসন দেয়া হবে এবং মুসলিম সেনাপতির মাথার ওজন সমান সোনা উপঢৌকন দেয়া হবে। এই অঞ্চলের যে কোন তরুণীকে সে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে দেয়া হবে। আর কেউ যদি বিন কাসিমের দ্বিখণ্ডিত মাথা আনতে পারে তাহলে তাকে মাথার দ্বিগুণ সোনা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে এবং দেশের সেরা সুন্দরী নারীর সাথে তার বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তোমরাই মোকাবেলা করবে না, এক হাজার ট্রেনিংপ্রাপ্ত চেন্নাই যুবক তোমাদের সঙ্গে থাকবে, বিজয় রায়ের কথার সাথে যোগ করল রাজা কাকা। তোমরা উভয় সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে আক্রমণ করবে।
মহারাজের জয় হোক ধ্বনি তুলল এক জাট প্রতিনিধি। আমরা কোন পুরস্কারের আশায় যুদ্ধ করতে উৎসাহী হইনি। আমরা ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছি এ জন্য যে, মহারাজা দাহিরের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযান রুখতে পারেনি। আজ আমরা মুসলমানদের অগ্রাভিযানের ক্ষমতা নিঃশেষ করে দেবো। এরা আমাদের তরবারীর আঘাতে মরতে এসেছে। মহারাজ আমরা পুরস্কার চাই না, আমাদের কর্তব্য পালনে আপনার আশির্বাদ চাই।
