গোয়েন্দা কাজে যে বয়স্কা মহিলাকে কাকা পাঠিয়েছিল, সে ছিল বিজয় রায়ের খান্দানের একজন পুরনো ভৃত্য। এই মহিলা ছিল চালাক ও ধূর্ত। সে বিজয় রায়ের খান্দানের লোকজনকেও চাতুরীপনার আঙুলের ইরাশায় নাচাতো। যে দু’জন পুরুষকে তাদের সাথে পাঠানো হয়েছিল এরা ছিল বিজয় রায়ের সৈন্যদলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এরা অসি চালনা, বর্শা নিক্ষেপ ও অশ্বারোহনে খুব পারদর্শী ছিল। এরা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান ছিল কিন্তু গোয়েন্দাদের মধ্যে যে দূরদর্শিতা থাকে তা ওদের মধ্যে ছিল না। কারণ গোয়েন্দাদের মধ্যে কোন রাগ অনুরাগের বশবর্তী হওয়ার সুযোগ নেই। আবেগকে গোয়েন্দা কর্মে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এরা মুসলমানদের সারিবেধে নামায পড়তে দেখেই প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে বিনা জিজ্ঞাসাবাদেই নিজেদের পরিচয় ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেয়।
হঠাৎ একদিন রাজা কাকা ও বিজয় রায়ের পাঠানো গোয়েন্দা দল ফিরে এলো। বিজয় রায় ও কাকা সহাস্যে তাদের ফিরে আসায় স্বাগত জানালো। তারা উভয়েই কিছুটা বিস্ময়মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, মেয়েদের তোমরা ফিরিয়ে এনেছ কেন? অতঃপর গোয়েন্দা দল তাদের পুরো কাহিনী রাজা কাকা ও বিজয় রায়কে শোনালে তাদের চোখ কপালে উঠল। উভয়েই গোয়েন্দা দলের দুই সেনা কর্মকর্তাকে গালমন্দ করতে শুরু করল। ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে বিজয় রায় বলল, তোমাদের এই ব্যর্থতার জন্য উভয়কে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়াই হবে উচিত বিচার।
‘ওদেরকে হাত পা বেধে দুর্গম মরুভূমিতে ফেলে আসা উচিত’ বলল রাজা কাকা। মরুভূমিতে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যু বরণ করলেও ওদের যথার্থ বিচার হবে না। আমরা ওদের কিসের জন্য পাঠালাম আর ওরা করে এলো কি?
‘আমরা আপনাদের জন্য বহুত দামী সংবাদ এনেছি মহারাজ’ বলল দু’জনের একজন। সবচেয়ে দামী রহস্যজনক সংবাদ হলো আপনাদের পক্ষে কোনভাবেই ওদেরকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। আমরা তাদেরকে যেভাবে ইবাদত করতে দেখেছি তাতে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, ওদের ঐক্য ও আনুগত্যে কখনো বিচ্যুতি ঘটবে না, তারা এক কমান্ডে জীবন দিতেও প্রস্তুত। আমরা দেখে এসেছি, ওখানকার অমুসলিম অধিবাসীরা খুবই শান্তিতে বসবাস করছে।
এরা মুসলমানদের নামায দেখে যেভাবে প্রভাবিত হয়েছিল তা ব্যক্ত করল উভয় তরুণির মধ্যে তখন বিরাজ করছে আতঙ্ক। তারা নীরবে নতশিরে দণ্ডায়মান। তাদের ওপর শাসকদের কোন শাস্তি নেমে আসতে পারে এ নিয়ে তাদের কোন উদ্বেগ ছিল না। তারা হতাশ ও আফসোস করছিল, ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে কাল বিলম্ব না করে তাদেরকে মুসলমানরা সিস্তান থেকে বের করে দিয়েছিল বলে। তারাও মুসলমানদের প্রতি এতোটাই প্রভাবিত ও মুগ্ধ হয়েছিল যতোটা প্রীত ও মুদ্ধ হয়েছিল তাদের সহযাত্রী দুই পুরুষ কর্মকর্তা। আপনারা যদি তাদেরকে পরাজিত করতে চান, তাহলে আপনাদেরকেও সেনাবাহিনীর মধ্যে তাদের মতো আনুগত্য, সৎ চরিত্র এবং ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। বলল অপর কর্মকর্তা। অথবা এমনই কোন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আমাদের দু’জনকে এমন কোন কঠিন দায়িত্ব দিন যা আর কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমরা জীবন দিয়ে সেই কাজ করে দেখাবো। সেই দু’সেনা কর্মকর্তাকে পুনরায় কোন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছিল কিনা এ ব্যাপারে ইতিহাস নীরব কিন্তু একথা ঠিক তাদের বলার পর বিজয় রায় ও রাজা কাকা বিন কাসিমকে পরাজিত করার জন্য নতুন এক কৌশলের চিন্তা করল।
এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিস্তান থেকে রওয়ানা হলেন। সিসিমের দিকেই ছিল তাঁর অগ্রাভিযান। তিনি সৈন্যদেরকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাঁর গোয়েন্দারা খবর দিলো, পথিমধ্যে কয়েকটি হোট ছোট দুর্গ রয়েছে এগুলো দখলে নিতে হবে। গাইড তাদের সাথে থেকে পথ নির্দেশনা দিচ্ছিল।
সিস্তান আর সিসিমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল সিন্ধু নদী। বিন কাসিম আগেই নদী পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। গোটা বাহিনীকে অল্প সময়ের মধ্যে নদী পার করা সম্ভব ছিল কিন্তু সামরিক সাজ সরঞ্জাম ও রসদপত্র পার করাটা ছিল সময় সাপেক্ষ। কিন্তু বিশাল সামরিকবহর ও বিরাট বিরাট মিনজানিক ও উট ঘোড়র বিপুল সমাহার পার করাটা সহজ সাধ্য ছিল না। তবুও বিন কাসিম নির্দেশ দেন যতো কম সময়ে সম্ভব সব কিছু নিয়ে নদী পেরিয়ে যেতে হবে। বিশাল সৈন্যবহর সাজ সরঞ্জাম নিয়ে নদী পাড়ি দেয়াটা ছিল সে সময়কার একটি মহাকর্মযজ্ঞ। একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, রাজা দাহির সিন্ধু নদীর একটি জায়গায় নৌকা দিয়ে পুল বানিয়েছিল কিন্তু বিন কাসিমের
অগ্রাভিযান দেখে সে পুল রাজা দাহির ভেঙে ফেলে। এ পুল তৈরির ব্যাপারটি কতটুকু বাস্তব সে সম্পর্কে বিশদ জানা যায়নি। রাজা কাকা ও বিজয় রায় ভেবেছিল মুহাম্মদ বিন কাসিম যদি সিস্তান থেকে সিসিমের দিকে অগ্রসর হন, তাহলে রাস্তার মধ্যে তারা যখন যাত্রা বিরতি করবে তখন তারা রাতের অন্ধকারে গুপ্ত হামলা চালাবে। কাকা ধর্মীয় দিক থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও জাতিগতভাবে ছিল চেন্নাই বংশোদ্ভূত। তিনি সে দিনই নির্দেশ দিলেন, চিন্নাই জনগোষ্ঠী থেকে বাছাই করে এক হাজার সাহসী অশ্বারোহী ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী যুবককে আমার সামনে তিন দিনের মধ্যে হাজির করো। ঠিক তিন দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর লোকেরা বাছাইকৃত এক হাজার যুবককে এনে রাজা কাকসার সামনে উপস্থিত করলো। তাদের সবাইকে সিসিম দুর্গে এনে সারিবদ্ধ করা হলো। রাজা কাকা জড়ো করা যুবকদেরকে বিজয় রায়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, তুমি এদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গুপ্ত হামলার জন্য তৈরি করে নাও। তুমি ওদের যতো তাড়াতাড়ি পারো ট্রেনিং দিয়ে তোমার মতো করে প্রস্তুত করো। সে দিন থেকেই এক হাজার চেন্নাই যুবককে ট্রেনিং দেয়া শুরু হলো। বিজয় রায় নিজে যুবকদের দুর্গের বাইরে নিয়ে কল্পিত মুসলিম শিবির তৈরি করে কিভাবে হামলা করতে হবে সে নির্দেশনা দিতো। বিন কাসিম নদী পার হওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ রশি তৈরি করিয়েছিলেন। রশির একমাথা এপাড়ের তীরবর্তী বৃক্ষরাজির সাথে বেধে দিয়ে নৌকা করে অপর মাথা ও পাড়ে নিয়ে গাছের সাথে বেধে দেয়া হলো। সাধারণ সৈনিকরা সেই রশি বেয়ে দ্রুত নদী পার হয়ে যাচ্ছিল। আর ভারী রশদপত্র নৌকায় বোঝাই করে অপর পাড়ে উঠানো হচ্ছিল। বিন কাসিম অশ্বারোহন করে গোটা এলাকা জুড়ে প্রদক্ষিণ করছিলেন আর সৈন্যদের দ্রুত কাজ করার জন্য বলছিলেন, ভাইয়েরা! তাড়াতাড়ি করো সময় বয়ে যাচ্ছে।’ বিন কাসিম সৈন্যদের বললেন, বন্ধুরা একটু ওপর দিকে তাকিয়ে দেখো, সূর্য হেলে পড়ছে, সময় দ্রুত তোমাদের আগে চলে যাচ্ছে, সময়কে তোমাদের পিছনে ফেলতে হবে। তরুণ সেনাপতির উদ্বিগ্ন তাড়া আর তার আবেগ ও উচ্ছাস দেখে অশ্বারোহী ইউনিট তাদের ঘোড়া গুলোকে নৌকা দিয়ে পার করার অপেক্ষা না করে সবাই নিজ নিজ ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দিল। এভাবে অতি অল্প
