কথা শুনে মনে হচ্ছে, তোমরা উভয়েই যথেষ্ট জ্ঞানী। বললেন শাবান ছাকাফী। আমি তোমাদের জানিয়ে দিতে চাই, আমি তাদেরই একজন যারা তোমাদের মতো লোকদের ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করে। তোমরা যদি ইচ্ছা করে মিথ্যা কথা বলো, তাহলে আমি দিব্যি তা বলে দিতে পারব তোমরা কোন্ কথাটি মিথ্যা বলেছ। আচ্ছা! তোমরা কি আমাকে বলবে, নিজেদের জীবন বাচানো ছাড়া আর কি কারণ ঘটেছে যে, আমার কাছে তোমরা নিজেদের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দিচ্ছ? “আমরা এই প্রথম মুসলমানদের ইবাদত করতে দেখেছি” বললো দু’জনের একজন পুরুষ। আপনাদের আযানের ধ্বনিও আমরা এই প্রথম শুনেছি। আপনাদের নামায পড়াও প্রথম দেখলাম। আমরা হিন্দু। হিন্দুরা নানা জাতি ও বর্ণে গোত্রে বিভক্ত। আমাদের ধর্মকর্মে আপনাদের নামাযের মতো এমন কোন জিনিস নেই। আপনাদের নামায, আযান আমাদের মধ্যে এমন অদৃশ্য প্রভাব সৃষ্টি করেছে যা আমরা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।
আমি তোমাদের এতো দীর্ঘ দাস্তান শুনতে পারব না। তোমরা সংক্ষেপে আমাকে একথা বলো, এখানে তোমাদের আসার আসল উদ্দেশ্য কি ছিল? আমার প্রশংসা ও আমাদের ধর্মের প্রশংসা করে তোমরা আমার অন্তর গলাতে পারবে না। বললেন শাবান ছাকাফী। আমাদের এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল, এরপর আপনারা কোন দিকে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তা জানা। তাছাড়া আমাদেরকে একথাও বলে দেয়া হয়েছিল, আপনাদের সৈন্য সংখ্যা কত এবং তাদের অবস্থা কি তাও জানা। সেই সাথে আপনাদের রসদপত্র কোন পথে কিভাবে আসে সে বিষয়টিও আমাদের জানতে বলা হয়েছিল। বলল বয়স্ক লোকটি।
এ বিষয় জানার জন্য এই তরুণীদের সাথে আনার কি প্রয়োজন ছিল? জানতে চাইলেন গোয়েন্দা প্রধান। তোমরা দু’জন কি এ কাজ করতে পারতে না?
এসব তথ্য জানার জন্য উর্ধতন কর্তা ব্যক্তিদের সংশ্রবে যাওয়ার প্রয়োজন হতো। বলল ধৃত এক গোয়েন্দা। আমাদের একথাও বলা হয়েছিল, মুসলিম সেনাপতি একজন নওজোয়ান লোক। সে সহজেই নারীর ফাঁদে পা দিতে পারে। নারীর ফাঁদে পা দেয়ার মতো লোকেরা ফেঁসে যেতে বেশি দেরী করে না। কিন্তু আমরা শুরুতেই বুঝতে পেরেছি, আপনাদের সেনাপতির মধ্যে নারীর প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
নারীর প্রতি তাঁর আসক্তি কি করে হবে বলো? বললেন শাবান ছাকাফী। তোমরা কি দেখোনি, তিনি শুধু আমাদের সেনাপতিই নন, আমাদের ইমামও তিনি। সেনাপতি পাপীষ্ঠ হলেও সৈন্যদের মধ্যে এর তেমন প্রভাব পড়ে না, কিন্তু ইমাম বদকার হলে তার প্রভাব মুসল্লীদের মধ্যেও পড়ে…। ওহ্! আমি কি বলছি, তা তোমাদের পক্ষে হয়তো বোঝা মুশকিল। যাক তোমরা তোমাদের কথাই বলো। এর আগেও আমরা তোমাদের রাজা দাহিরের কাছে এদের মতোই তরুণীদেরকে এই পয়গাম দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছি যে, এসব দুশ্চরিত্রা মেয়েদের দিয়ে সে আমাদের আক্রমণ থেকে তার রাজত্ব ও রাজ্য রক্ষা করতে পারবে না। আর এখন তার ভাতিজা নিজ খান্দানের মেয়েদেরকেই এ কাজে পাঠাল।
আমরা আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব না’ বলল এক গোয়েন্দা। কিন্তু আমরা চাই রাজা কাকা ও বিজয় রায়ের কাছে আমাদের পক্ষ থেকে একটা পয়গাম দিতে। আমরা তাদের জানাতে চাই, তোমরা এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কখনো সফল হবে না। যাদের ইবাদত ঐক্য ও মমতার শিক্ষা দেয়, যারা এক ইমামের পিছনে পূর্ণ আনুগত্য নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, আবার সোজা হয় আবার মাথা অবনত করে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, হিন্দুদের এই গোয়েন্দারা বিন কাসিমের নামায, ইমামতি ও আযান শুনে ও প্রত্যক্ষ করে এতোটাই প্রভাবিত হয়ে ছিল যে, তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল ফিরে গিয়ে রাজা কাকা ও বিজয় রায়কে বলবে, তারা মুসলমানদের সাফল্য ও বিজয়ের রহস্য জেনে এসেছে। আর এই রহস্য হলো, তাদের এক ইমামের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইবাদত করা এক ইমামের
পিছনে ভেদাভেদহীনভাবে একই সারিতে দাঁড়িয়ে পূর্ণ আনুগত্যের সাথে নামায পড়া। তারা মুসলমানদের বিজয়ের দ্বিতীয় যে কারণটি অনুধাবন করেছিল, তা হলো, মুসলিম সেনাপতি একজন তরুণ হওয়ার পরও সুন্দরী তরুণীদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম ছিল, বিন্দুমাত্র তাঁর মধ্যে নারীর প্রতি আসক্তি ছিল না। গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী ধৃত শক্ত গোয়েন্দাদেরকে সৈন্যদের প্রহরায় রেখে বিন কাসিমের শরনাপন্ন হয়ে বললেন, আপনার কাছে চাকরি ও আশ্রয় প্রার্থী দলটি শত্রু পক্ষের গোয়েন্দা দল। ধৃত গোয়েন্দা দলের কাছ থেকে তিনি যে তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন, এ সম্পর্কেও বিন কাসিমকে তিনি অবহিত করলেন। দুর্গের দ্বার রক্ষীর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা নিশ্চিত হলেন, সে দিন সন্ধ্যায়ই এই লোকগুলো দুর্গে প্রবেশ করে, এরা এই দুর্গের বাসিন্দা নয়। এদেরকে এখানে আর দেখা যায়নি।
বিন কাসিম কিছুক্ষণ চিন্তা করে ওদেরকে দুর্গ থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সম্ভবত বিন কাসিমের জীবনে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমি ঘটনা। চিহ্নিত শত্রুদের তিনি কখনো ক্ষমা করতেন না। শত্রুদের জন্য তিনি ছিলেন সাক্ষাত যমদূত।
‘আমাদের সিপাহসালার তোমাদেরকে বিনা বিচারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বিন কাসিমের কাছ থেকে তার দফতরে ফিরে এসে ধৃত গোয়েন্দাদের উদ্দেশ্যে বললেন শাবান ছাকাফী। ফিরে গিয়ে বিজয় রায় ও রাজা কাকাকে বলবে, খুব শিগগিরই তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাত হবে ইনশাআল্লাহ। তীরন্দাজদের বিষাক্ত তীর আর মিনজানিকের পাথর দিয়ে আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানাবো। সেই রাতেই ধৃত শত্রু গোয়েন্দা দলটিকে বিনা বিচারে দুর্গ থেকে বের করে দেয়া হলো।
