পরম সোহাগভরা কণ্ঠে তিনি বললেন, বলো, আমি ইচ্ছা করলে উভয়কে শাহজাদী বানিয়ে রাখতে পারি। আর আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের হাত পা বেঁধে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে ঘোড়া দৌড়িয়ে তোমাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারি। আপনি কে? তরুণী তার শরীরের সাথে আরো লেপ্টে গিয়ে পরম মাদকতা মেশানো কণ্ঠে বলল, আপনিও কি সেনাপতি?
শুধু সেনাপতি নই, এখানকার সব কিছুই আমি। আমি যা জিজ্ঞেস করেছি, সেটির জবাব দাও? তরুণী গোয়েন্দা প্রধানের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করাতো দূরে থাক, বরং নিজেকে সে আরো মেলে দিলো, আরো গভীরভাবে তার তুলতুলে শরীরটা গোয়েন্দা প্রধানের শরীরের সাথে মিশিয়ে দিয়ে একহাতে শা’বান ছাকাফীর কোমর পেচিয়ে ধরল। গোয়েন্দা প্রধানের এই কাণ্ড দেখে অপর তরুণির ঠোটে ঈষৎ হাসির আভা ফুটে উঠল যা শা’বান ছাকাফীর দৃষ্টিকে আড়াল করতে পারল না। তাতে শা’বান ছাকাফী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছে গেলেন। এক ঝটকায় তরুণীকে সরিয়ে দিয়ে দরজা খুলে অপর কক্ষে বসা দু’পুরুষ সাথীকে ডেকে ভিতরের কক্ষে নিয়ে এলেন। শাবান ছাকাফীর বুঝতে বাকী রইলো না এরা গোয়েন্দা। তিনি পুরুষ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেন, এতোটা নির্বোধ হলে কি তোমরা কাজ করতে পারবে? না তোমরা আরবদের বোকা মনে করো? না তোমরা মনে করো যে, আমরা তোমাদের চালচলন, রীতিনীতি, চক্রান্ত ও পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানিনা। জানো, আমি যে কোন মানুষের হাত পা দেখে ওর পূর্ব পুরুষের পেশাও বলে দিতে পারি।
একথা বলে তিনি যুবক লোকটির দু’হাত টেনে নিয়ে ওলট পালট করে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, সেনাবাহিনীতে তুমি কোন পদমর্যাদার অফিসার? তুমি কৃষকের পোক গায়ে জড়িয়ে এসেছ কিন্তু তোমার তিন পুরুষের মধ্যে কেউ কি কখনো কৃষি কাজ করেছে? আপনি আমাদের ভিতর তলব না করলেও আমরা নিজে থেকেই ভিতরে আসার চিন্তা করছিলাম হুজুর! বলল বয়স্ক লোকটি।
আমরা কিছু বললে হয়তো আপনি মনে করবেন, শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আমরা আপনাকে মিথ্যা কথা বলছি। আমরা দু’জন বাইরে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, ভিতরে এসে আপনাকে বলে দেবো, আমরা রাজা কাকসার পাঠানো গোয়েন্দা।
এই দুর্গ থেকে পালিয়ে যাওয়া বিজয়রায় আমাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। বলল অপর লোকটি। এই দুই তরুণী বিজয় রায়ের নিজ খান্দানের মেয়ে।
“বিজয় রায় কি এখান থেকে পালিয়ে সিসিমপুরে চলে গেছে।” জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান।
জী হা। জবাব দিলো লোকটি। তিনি রাজা কাকসার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তারা উভয়ে মিলে এখন আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিন কাসিমের সৈন্যরা যখন আংটা দিয়ে সিস্তানের দুর্গে প্রবেশ করছিল তখন দুর্গপতি রাজা দাহিরের ভাতিজা বিজয় রায় তার পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। বিন কাসিম বিজয় রায়ের পিছু ধাওয়া করার ইচ্ছা করেছিলেন কিন্তু তার গোয়েন্দারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছিল না বিজয় রায় ঠিক কোন দিকে পালিয়েছে। বিন কাসিম রাজা দাহিরের রাজ্য ও তার প্রশাসন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মধ্যে এ বিষয়টি জানতে সক্ষম হয়েছিলেন, রাজা দাহিরের সেনাবাহিনীর অধিকাংশ তার ভাতিজা বিজয় রায় ও ছেলে জয়সেনার কমান্ডে তুকমান ও সিস্তানে নিয়োজিত রয়েছে। তাই বিন কাসিম চেষ্টা করছিলেন উভয়কেই পাকড়াও করতে নয়তো নিঃশেষ করে দিতে। কারণ তাতে রাজা দাহিরের সিংহ ভাগ সমরশক্তি নিঃশেষ হয়ে যেত। সিস্তানের পর বিন কাসিমের প্রধান লক্ষ্য ছিল সিসিমপুর দুর্গ। সিসিমপুর ছিল বৌদ্ধ রাজ্যের রাজধানী। ওখানকার রাজা কাকা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। এই রাজ্য দৃশ্যত স্বাধীন হলেও মূলত রাজা দাহিরের করতলগত ছিল। রাজা দাহির রাজা কাকাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল, তোমার রাজ্য যদি বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে আমি সৈন্যদল নিয়ে শত্রুদের প্রতিরোধ করব।
বিন কাসিম ও গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর জন্য এই তথ্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গভীর অনুসন্ধান করে বিন কাসিমের অভিজ্ঞ গোয়েন্দারা এই তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। বিন কাসিম জানতে পেরেছিলেন সিসিমপুর তেমন কোন শক্তিশালী দুর্গ নয়। এছাড়া সিসিমপুরের রাজা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। তিনি ধারণা করেছিলেন বৌদ্ধরা যেহেতু অহিংসবাদী ও রক্তপাত বিরোধী তাই নিরূনের বৌদ্ধ শাসকের মতো রাজা কাকাও তার প্রতি বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে মুসলিম সৈন্যদের স্বাগত জানাবে। কিন্তু ধৃত গোয়েন্দারা তাকে ভিন্ন সংবাদ সরবরাহ করল। অবশ্য এদের পরিবেশিত সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারে সংশয় ছিল এরা সঠিক সংবাদ দিচ্ছে কি-না। তা ছাড়া এদের কথাবার্তা এমনও হতে পারে যে, তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে তোমরা সিস্তান গিয়ে এমন আচরণ করবে যাতে তোমাদেরকে তারা শত্ৰু গোয়েন্দা মনে করে পাকড়াও করলে তোমরা জীবন বাঁচানোর জন্য
গোপন সংবাদ বলে দেয়ার ভান করে বলবে যে, বিজয় রায় আর রাজা কাকা মিলিত হয়ে বিন কাসিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমরা জানি, আপনি আমাদের কখনো ছেড়ে দেবেন না। বলল পুরুষ দু’জনের একজন। কারণ আমরা যে অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছি, তাতে আমাদের গর্দান আমরাই আপনার তরবারীর নীচে নিক্ষেপ করেছি। আমরা হয়তো আপনাকে বিশ্বাস করাতে পারব না, আমরা যা বলেছি তা কতটুকু সত্য ও বাস্তব।
