আমরা আপনার কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না, ‘আমরা আপনার সেবাদাসী হিসাবে থাকার জন্যই এখানে এসেছি।
মুচকী হেসে বিন কাসিম বললেন, আমি তো আর তোমাদের অবতার বা রাজা নই। আমার সেবাদাসী হতে তোমাদের এতোটা আগ্রহ কেন?
আপনি আমাদের দেবতার চেয়েও বেশি। আমাদের ধরে লোকদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই। আমাদের ধর্মগুরু পণ্ডিতরা দেবদূতের আসনে বসেও আমাদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, আমরা আমাদের সম্ভ্রম রক্ষার তাকিলে আপনার কাছে এসেছি। আমরা জানতে পেরেছি মুসলমানদের কাছেই নারীর ইজ্জত সুরক্ষিত থাকে।
বিন কাসিম তরুণীদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন কোন নারী বিশেষ করে তাদের মতো তরুণী রূপসীদের তিনি তাঁর দফতরে চাকরি দিতে পারবেন না। কিন্তু উভয় তরুণী বিন কাসিমের সান্নিধ্যে থাকার জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। তারা বলল, তাদের দৃষ্টিতে বিন কাসিম দেবতাতুল্য, তারা এই দেবতার পূজা করতে চায়। তরুণীদ্বয় কখনো বিন কাসিমের হাতে চুমু দিতো আবার কখনো তার জামার আস্তিন চোখে লাগাতো। তাদের সাথে যে পুরুষ
ছিল, তারাও মিনতি জানাতে লাগল বিন কাসিম যেন এদের আবেদন মঞ্জুর করে তার সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ দেন।
গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী অনতি দূরে দাঁড়িয়ে দুই তরুণী, তাদের সফর সঙ্গী বয়স্কা মহিলা এবং পুরুষদের গতিবিধি, আচার আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এক পর্যায়ে বিন কাসিম তাকে ইঙ্গিত করলে তিনি এগিয়ে এলেন। আগন্তুকদের পোশাক পরিচ্ছদ ছিল এলাকার কৃষকদের মতো। গোয়েন্দা প্রধান এগিয়ে এসে দুই তরুণির কাধে হাত রেখে বললেন, আমার সাথে এসো, আমি তোমাদের চাকরি দেবো। তরুণীদ্বয় ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে বিন কাসিমের দিকে তাকালো। বিন কাসিম মুচকি হেসে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন, তোমরা এই লোকের সাথে চলে যেতে পারো। সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকারে চারপাশ ছেয়ে গেল। চতুর্দিকে জ্বলে উঠল প্রদীপ। শাবান ছাকাফী দুই তরুণী ও বৃদ্ধাসহ তাদের সঙ্গী পুরুষদের একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। গোয়েন্দা প্রধান দুই তরুণীকে তার কক্ষে নিয়ে বয়স্কা মহিলা ও পুরুষদের বাইরে বসার নির্দেশ দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তিনি কক্ষে প্রবেশ করতেই আরো প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরটি আলোকময় করে দেয়া হলো। শাবান ছাকাফী তার একান্ত সচিবকেও কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে তরুণী দুজনের মাথার উড়না ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তরুণিরা তাদের রেশমী চুল উদোম করে দিলে গভীরভাবে তাদের চুলের বর্ণ ও পরিপাটি নিরীক্ষণ করে তাদের হাত নিজের হাতে নিয়ে আঙুলের গঠন ও হাতের ত্বক পরখ করলেন। অতঃপর তাদের বাজু থেকে বস্ত্র সরিয়ে তাও পরখ করলেন। পায়ের জুতো খুলে পায়ের গঠন পর্যবেক্ষণ করলেন। তোমরা ঠিকই শুনেছ যে, মুসলমানরা নারীকে সম্মান করে, তরুণীদের উদ্দেশ্যে বললেন, গোয়েন্দা প্রধান। আমরা তোমাদের মতো তরুণীদের ইজ্জতের ওপর হাত দেই না কিন্তু হত্যা করি। অবশ্য সেই হত্যাকাণ্ডটি খুবই মর্মান্তিক হয়ে থাকে। তোমরা যদি সত্য কথা বলো, কোন বিষয় আড়াল না করো এবং চালাকী চাতুরী করে বিভ্রান্তিমূলক জবাব না দাও; তাহলে তোমাদের কোন কষ্ট দেবো না। তোমরা যে ভাবে এসেছে, ঠিক সেভাবেই সসম্মানে তোমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করব।
একথা শুনে উভয় তরুণী প্রকম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতে লাগল, আমাদের কেন হত্যা করা হবে, আমরা কি অপরাধ করেছি? এরা অপরাধের কারণ জানতে শাবান ছাকাফীর গায়ের সাথে গা মিশিয়ে দিয়ে অনুনয় বিনয় করছিল। ওদের অঙ্গভঙ্গি ছিল খুবই উন্মাদনাপূর্ণ। শা’বান ছাকাফীর মতো অভিজ্ঞ গোয়েন্দার পক্ষে বুঝতে মোটেও অসুবিধা হলো না, এদের এই কাকুতি মিনতির মধ্যে কোন ভয় শঙ্কা নেই, বরং আছে সচেতন সতর্ক লক্ষ্যভেদী আক্রমণের প্রয়াস। গোয়েন্দা প্রধান উভয় তরুণির চুল, হাত, পায়ের গঠন দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন এরা পশ্চাদপদ কোন দলিত শ্রেণির হিন্দু পরিবারের মেয়ে নয়। এরা সেনা প্রধানের সাথে যেভাবে কথা বলছিল তাতেও প্রমাণ হয় এরা কোন আনাড়ী অশিক্ষিতা অবলা মেয়ে নয়, বরং খুব পটু ও প্রশিক্ষিত। কোন পশ্চাদপদ দলিত শ্রেণির কৃষাণ কন্যার পক্ষে এভাবে সেনা প্রধানের সাথে জড়তাহীন কথা বলা একেবারেই অসম্ভব।
তাছাড়া এদের হাত পা চেহারা শরীরে বিন্দুমাত্র অভাব দারিদ্র্য দুঃখ যন্ত্রণার ছাপ নেই। ওরা আসলে খুব নির্বোধ, যারা তোমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে, বক্র হাসি দিয়ে বললেন গোয়েন্দা প্রধান। ওরা তোমাদেরকে গরীব কৃষাণ কন্যার বেশে পাঠালেও ভেবে দেখেনি, আসলে তোমাদেরকে কৃষাণ কন্যাদের মতো দেখায় কি না। তোমরাই বলো, কি উদ্দেশ্যে তোমরা এখানে এসেছ? আমাদের সেনাপতিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে এসেছিলে, না গোয়েন্দাগিরি করে আমাদের ভিতরকার অবস্থা জেনে তথ্য পাচার করার জন্যে এসেছো? তরুণীদ্বয় একথার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার আগেই শা’বান ছাকাফী এক তরুণীকে কাছে টেনে এক হাতে তাকে নিজের পাজরের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। ভাবটা এমন যেন তিনি তরুণির প্রতি অতিশয় আগ্রহের আতিশয্যে তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করেছেন। তিনি ডান হাতে তরুণির গালে আলতু করে টোকা দিয়ে গভীরভাবে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেললেন।
