দুর্গফটকের কমান্ডার বলল, তোমরা দুর্গের ভিতরের দিকে চলে যাও, গিয়ে জেনে নাও, এখানে কোথায় পান্থশালা আছে। সেখানে গিয়ে থাকো। পান্থশালায় মুসাফিরদের থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্তু আছে। আচ্ছা, তোমাদের ধর্ম কি? জিজ্ঞেস করল কমান্ডার।
আমরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। জবাব দিলো বয়স্ক লোকটি। এখন গিয়ে মুসাফিরখানায় থাকো। দিনের বেলায় এখানকার বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে ভিক্ষুর
সাথে সাক্ষাত করো, সেই তোমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। শহরে বেশ কয়েকটি বাড়ি খালি পড়ে রয়েছে। এগুলো এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া। হিন্দুদের ঘর বাড়ি। ওগুলোতে তোমরা নির্বিঘ্নে থাকতে পারবে। আগন্তুকরা মাথা নীচু করে দুর্গরক্ষী কমান্ডারকে কুর্নিশ করে সামনে অগ্রসর হলো।
ঠিক সেই সময়ে দুর্গপ্রাচীরে দাড়িয়ে এক সৈনিক মাগরিবের আযান দিচ্ছিল। আযানের বিস্ময়কর ও মুগ্ধকর আওয়াজে থমকে দাঁড়াল মুসাফির দল। তারা দেখতে পেল আযানের সাথে সাথে বিক্ষিপ্ত সৈন্যরা সারিবেঁধে পাশা পাশি দাঁড়াচ্ছে পার্শ্ববর্তী খোলা জায়গায়। মুসাফির দল মোহনীয় আযানের ধ্বনি শেষে অবাক বিস্ময়ে একটু দূরে সরে গিয়ে দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল সৈন্যরা কি করে? তারা গভীরভাবে লক্ষ্য করল, এতো সৈন্যদের উপস্থিতিতেও আযান শুরু হওয়ার সাথে সাথে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কোথাও কারো মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত শোনা যায় নি। আযানের পরপরই দেখা গেল, সবাই সারিবদ্ধ হয়ে গেছে এবং একজন লোক সামনে দাঁড়িয়ে গেছে আর বাকীরাও তার মতোই একই দিকে মুখ করে তার অনুসরণ করে উঠবস করছে। তৎকালীন সময়ের রীতি অনুযায়ী নামাযে ইমামতি করলেন সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম। বিন কাসিমের তেলাওয়াতের মধ্যে ছিল দারুণ আকর্ষণ। তাঁর তেলাওয়াতে পথিকেরা আরো বেশি বিমুগ্ধ হলো। ঐতিহাসিক মাসুমী লিখেছেন, সেই দিনের মাগরিবের জামাতের নামায যেসব পথিক দেখেছিল তারা এতোটাই বিমোহিত হয়েছিল যে, তারা ভুলে গিয়েছিল ভ্রমণের ক্লান্তি। অভিযাত্রীদের মধ্যে উঠের উষ্ট্রারোহী একটি পরিবারে ছিল একজন বৃদ্ধ একজন বয়স্কা মহিলা ও দুজন তরুণী। এরা এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে তারা সওয়ারী থেকে নেমে পড়েছিল। বয়স্কা মহিলা তরুণীদের উদ্দেশ্যে বিন কাসিমকে লক্ষ্য করে বলছিল, দেখো, কেমন মায়াবী চেহারা। আর দুই তরুণির দৃষ্টি বিন কাসিমের ওপর এভাবে নিবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তারা বিন কাসিমের অস্তিত্বে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল।
নামায শেষে সৈন্যরা নিজেদের তাবুতে ফিরে যাচ্ছিল কিন্তু বিন কাসিম ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোন কোন সৈনিক পরম শ্রদ্ধা ভরে বিন কাসিমের
সাথে মোসাফাহা করছিল। এভাবে অনেক সৈনিক মাসাফাহা করে ফিরে গেলে এক পর্যায়ে বিন কাসিমের পাশে মাত্র কয়েকজন উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা গোয়েন্দা প্রধান শা’বাব ছাকাফী আর তার একান্ত গুটি কয়েক নিরাপত্তানরক্ষী তখনো রয়ে গিয়েছিল.
অতি উৎসাহী, সেই পথিক পরিবার সামনে অগ্রসর হলো। অগ্রসর হয়ে তারা এক অমুসলিমের দেখা পায় তার কাছ থেকে জেনে নিলো, সৈন্যরা এতোক্ষণ কি করছিল। অমুসলিম-লোকটি জানালো সৈন্যরা এতোক্ষণ ইবাদত করছিল। তারা এও জেনে নিয়ে ছিল সবার সামনে দাঁড়ানো লোকটি কে? তাদের জানানো হলো, সবার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি এই সৈন্য দলের প্রধান সেনাপতি। হিন্দুস্তানে সেনা প্রধানকে যেমন শাসক ও সেনার হর্তাকর্তা মনে করা হয়, মুসলমানদের মধ্যে সেনা প্রধান শুধু প্রশাসনিক প্রধানই থাকে না, সে প্রার্থনা ও উপাসনার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান করে: মুসাফির দল এক সৈনিকের কাছে জানতে চাইলো, আমরা কি তোমাদের প্রধান সেনাপতির সাথে সাক্ষাত করতে পারব? আমরা অনেক দূর থেকে তোমাদের বাহিনীর এবং তোমাদের সেনাপতির প্রশংসা শুনে এসেছি। তাহলে সামনে এগিয়ে যাও; সামনে গেলেই তুমি জানতে পারবে তোমাদের পক্ষ্যেতার সাক্ষাত পাওয়া সম্ভব কিনা? বলল সৈনিক।
সাফিররা বিন কাসিমের দিকে অগ্রসর হলো। দুই পুরুষের পিছু পিছু তাদের মা ও দুই বোনও অগ্রসর হচ্ছিল। বিন কাসিম আগন্তুক দলকে তার দিকে আসতে দেখে নিজেই ধীরে ধীরে তাদের প্রতি অগ্রসর হলেন। অভিঞ্জ দুই পুরুষ বিন কাসিমের কাছে এসে হাটু গেড়ে এভাবে নমস্কার করল যে কে সিজদা করছে। দুই তরুণী বিন কাসিমের পাশে গিয়ে পুরুষদের মতোই হাটু গেড়ে বসে তার জামা ধরে চুমু দিলো।
বিন কাসিম দূভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন, এরা কি চায় জিজ্ঞেস করো? দূভাষী তাদের আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে সে কথাই তারা পুনর্ব্যক্ত করল, যা তারা এদিকে আসার সময় প্রহরী সৈন্যকে বলেছিল। তরুণীয় যখন তার নিকাব খুলে দেখালো, তখন সবাই লক্ষ্য করল দুজনই খুব সুন্দরী+উক্তয় তরুণী দুভাষীর দিকে হাত জোড় করে আবেদন করল, তুমি তোমার রাজাকে বলল, তার প্রাসাদে আমাদেরকে সেবিকার চাকরি দিতে, আমরা তার প্রাসাদেই নিরাপদ থাকতে পারব।
যেহেতু বিন কাসিম নিজে এখানে উপস্থিত তাই তার উপস্থিতিতে তার পক্ষ হয়ে আর কারো জবাব দেয়ার সুযোগ ছিল না। তরুণীদ্বয় কি আবেদন করছে, হুবহু দুভাষী আরবীতে বিন কাসিমের কাছে ব্যক্ত করুন।
বিন কাসিম শা’বান ছাকাফীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, রাজত্ব সব দেশেই বিদ্যমান। সাধারণ মানুষ মনে করে এর রাজা বাদশাকে আল্লাহ্ তাআলা রাজা বাদশা করেই দুনিয়াতে প্রেরণ করেছে। আমরা এসব লোককে কি করে বোঝার সারা দুনিয়ার রাজা আল্লাহ তাআলাই। এরা আমাকে তাদের রাজার সাথে তুলনা করছে। রাজা ভাবছে। তিনি দুভাষীর মাধ্যমে তরুণীদের বললেন, আমাদের সমাজে কেউ রাজা বাদশা নেই। কোন প্রজাও নেই। আমরা কোন নারীকে কর্মচারী রাখি না। রনাঙ্গনেই আমাদের জীবন কেটে যায়? তোমরা তোমাদের পুরুষদের সাথে মুসাফিরখানায় চলে যাও। সেখানে তোমরা সসম্মানে থাকতে পারবে, তোমাদের ইজ্জতের ওপর কোন ধরনের আক্রমণ হবে না। তোমাদের সব প্রয়োজনই সেখানে বিনা মূল্যে পূরণ করা হবে।
