ইতোমধ্যে তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে সিস্তান বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে পয়গাম পাঠালেন। সেই পয়গামে তার সেনাবাহিনীর অবস্থাসহ সার্বিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিলেন। জানালেন, তার সৈন্যদের কতোজন শাহাদাতবরণ করেছে, কতোজন পঙ্গু হয়ে বেকার হয়ে গেছে, আসবাব ও রসদপত্র কি পরিমাণ রয়েছে এবং সামনে কি প্রয়োজন হতে পারে। সেই সাথে শত্রুদের অবস্থাও জানালেন, সামনে কোন্ জায়গায় শত্রুরা কোন্ অবস্থায় আছে এবং কোথায় কি পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করেছে।
ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বসরায় বসে সিন্ধু এলাকার যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। মাঝে মধ্যে তিনি এমন নির্দেশও পাঠাতেন, যা এখানকার পরিস্থিতি অনুধাবন করে বিন কাসিমের তৈরি পরিকল্পনার বিপরীত হতো। যেমন বিন কাসিম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক দিকে অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু হাজ্জাজের পয়গাম এলো উল্টো দিকে যাও, সেখানে শত্রুদের তুমি এমন অবস্থায় পাবে।
ঐতিহাসিকগণ জোর দিয়েই একথা লিখেছেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের এসব নির্দেশ শুধু আন্দাজ ও অনুমান নির্ভর ছিল না। শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলেছিলেন। সেই গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তিনি রণাঙ্গনের সার্বিক তাজা সংবাদ জানতে পারতেন। সেই সাথে সরোদ প্রেরণের এমন গতিশীল ব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলেছিলেন যে, ভারতের এই অঞ্চল থেকে সুদূর বসরায় মাত্র সাত দিনে খবর পৌছে যেত এবং সেই বসরা থেকে মাত্র সাতদিনে বিন কাসিম যখন যেখানে অবস্থান করতেন সেখানে সংবাদ চলে আসতে। এ জন্য তিনি সময় মতো সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে যে দিকনির্দেশনা দিতেন তার প্রায় সিংহভাগই বাস্তব সম্মত হতো।
বিন কাসিম তখনো সিস্তান দুর্গে অবস্থান করছিলেন। শহরের শান্তি শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। অগ্রাভিযানের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে ছিল। সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের কাজও সমাপ্ত হয়েছিল। শহরের অধিবাসীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল। ঘরে ঘরে সেখানকার মানুষ পরম শান্তিতে বসবাস করছিল। বিজয়ী মুসলমানরা দুর্গে প্রবেশের পর অধিবাসীদের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল তার অবসান হয়েছিল। মুসলমান সৈন্যরা শহরের অধিবাসীদের মধ্যে এ ধারণা জন্মাতে সক্ষম হয়েছিল যে, তারা বিজিত বটে কিন্তু পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার তাদের আছে।
বিকেলের সূর্য শেষ আলোক বিকিরণ করে তলিয়ে যাচ্ছিল। দুর্গের ফটক বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ফটক রক্ষীরা। দুর্গের বাইরে ক্ষেত খামারে কর্মরত সকল মানুষ দুর্গের ভিতরে চলে এসেছিল। ফটক রক্ষীরা যখন দুর্গফটক বন্ধ করতে যাবে তখন সেখানে উপস্থিত হলো দু’জন লোক। প্রধান দুর্গফটকের কাছে এসে তারা থামল তাদের সাথে ছিল দুটি উত্নী। একটি উষ্ট্ৰীতে ছিল একজন বয়স্কা মহিলা আর অপর উস্ত্রীর ওপর দু’জন তরুণী। পুরুষ দুজন হেটে এসেছে। মহিলাদের পরিধেয় বস্ত্র ছিল মলিন। পুরুষদের পরিধেয় কাপড় ছিল ময়লা। দেখে মনে হচ্ছিল অনেক দূর থেকে এসেছে।
তোমরা কে, কোথেকে এসেছ? দুর্গফটকের ওপর থেকে আগন্তুকদের জিজ্ঞেস করল এক নিরাপত্তারক্ষী। অনেক দূর থেকে এসেছি। আমরা একটু আশ্রয়ের সন্ধান করছি। ওপরের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো আগন্তুক এক পুরুষ।
ঠিক আছে, ভিতরে প্রবেশ না করে, তবে দেউড়ীতে দাড়াও। নির্দেশের সুরে বলল নিরাপত্তারক্ষী। তাড়াতাড়ি ভিতরে ঢুকো। ফটক বন্ধ করে দেয়া হবে। আগন্তুক উভয় পুরুষ আরোহীদের নিয়ে দুটি উটসহ দুর্গফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। দুর্গরক্ষী দলের কমান্ডার তাদের আবারো জিজ্ঞেস করল, তারা কোথেকে এসেছে এবং কেন এসেছে? অজ্ঞাতনামা একটি জায়গার নাম বলে আগন্তুক এক পুরুষ বলল, তারা সেখান থেকে এসেছে, সেখানকার সৈন্য ও শাসকরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলেছে, ফলে বাঁচার তাকিদে তারা সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। আমরা গরীব মানুষ, আমাদের কাছে কোন ধন সম্পদ নেই, বলল বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ আগন্তুক। আমাদের কাছে এমন কোন সম্পদ নেই যা দিয়ে খোশহালে কোথাও জীবন যাপন করবো। আমাদের সাথে আছে যুবতী দুই বোন। দুর্ভাগ্য বশত এরা যুবতী এবং রূপসী। জালেম সৈন্যদের অত্যাচার থেকে এদেরকে বাঁচানোর জন্য আমাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এরা আমাদের সম্পদ, এরাই আমাদের সম্মানের বস্তু। কোন মুসলিম সৈন্য কি তোমাদের হয়রাণী করেছে? না, সেখানে যদি মুসলিম সৈন্যরা পৌছে যেত তাহলে তো আমাদের আর কোন ভয় থাকতো না।
মুসলমানরা মানুষকে সম্মান করে নারীকে ইজ্জত দেয় একথা শুনেই আমরা এখানে এসেছি। শুনেছি, মুসলমানরা নারীর ইজ্জতকে খুব সম্মান করে, কারো ধন সম্পদে হস্তক্ষেপ করে না। আপনি প্রয়োজনে আমাদের দুর্গ থেকে বের করে দিতে পারেন কিন্তু দয়া করে এই দুই যুবতী ও এদের বয়ষ্কা মাকে আশ্রয় দিন। পথ হারিয়ে আমরা অনেক দিন মরুভূমিতে এবং অচেনাপথে ঘুরে ঘুরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছি। আর সূর্যের তাপে দিনের বেলায় পুড়েছি। দুঃখ কষ্টের কথা এরা এভাবে পাহারাদারকে শোনালো যে, তাদের কষ্টের বর্ণনা শুনে দুর্গফটকের কমান্ডার ও তার সহকর্মীদের মধ্যে দয়ার উদ্রেক হলো।
