কিছু বুঝে ওঠার আগেই শত্রু সেনাদের খঞ্জরাঘাতে নিহত হলো তারা। পাহারাদারদের হত্যার পর বিজয় রায়ের সৈন্যরা নদীতীরে জড় হয়ে সর্বশেষ মিনজানিক বোঝাই নৌকাটির বাধন খুলে সেটিকে বেয়ে কিছুটা ভাটিতে নদীর অপর পাড়ে নিয়ে এলো। এ পাড়ে প্রশিক্ষিত দু’টি জঙ্গী হাতিসহ কয়েজন তাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল। সবাই মিলে মিনজানিক বোঝাই নৌকাটিকে টেনে কিছুটা ডাঙ্গায় উঠিয়ে মিনজানিকটি রশি দিয়ে হাতির সাথে বেঁধে দিলো। জঙ্গী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতিগুলো দু’টি মিনজানিক দ্রুত টেনে নিয়ে রাতারাতি এতোদূর অগ্রসর হলো যে তাদের আর মুসলিম বাহিনী ধরতে পারল না।
ধৃত হিন্দু সৈন্যরা বিন কাসিমকে জানালো, রাজা দাহিরের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মিনজানিকটি রাজধানী উরুটে পৌছে দেয়ার জন্য কিন্তু বিজয় রায় গোয়ার্তুমী করে মুসলিম সৈন্যদের অবরোধ ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য দুর্গপ্রাচীরের ওপরে মিনজানিক স্থাপন করে। সে গর্ব ভরে বলছিল, আরব বাহিনী যদি সিস্তান দখল করতে আসে তাহলে এই মিনজানিক দিয়েই সে আরবদের পরাস্ত করে দেবে। কিন্তু দেখা
গেল, আরব সৈন্যরা এসে মাত্র দুটি পাথর নিক্ষেপ করেই সেই মিনজানিক বেকার করে ফেলল। বিজয় রায় হয়তো জানতোই না, রাজা দাহির কেন এ মিনজানিকের প্রতি এতোটা আগ্রহী ছিলেন। রাজা তার কারিগরদেরকে এটি দেখিয়ে তাদের দিয়ে অনুরূপ বহু সংখ্যক মিনজানিক তৈরি করিয়ে নিতে চাচ্ছিলেন। একথাও জানা গেছে যে, দাহির যেসব দেশত্যাগী আরবকে মাকরানে আশ্রয় দিয়েছিল, তাদের ডেকে এনে জানতে চেয়েছিল, এই আরবদের মধ্যে কেউ মিনজানিক তৈরির কাজ জানে কি-না। কিন্তু আশ্রিত মুসলমানদের সর্দার আলাফী রাজাকে জানান, তাদের এখানে মিনজানিক তৈরি জানে এমন কেউ নেই।
অথচ বাস্তবে আলাফীর সাথীদের মধ্যে দু’জন মিনজানিক তৈরির কাজে পারদর্শি ছিল। কিন্তু তারা এ কাজ জানে এমনটি স্বীকার করেনি, কারণ তারা জানতো, স্বীকার করলে তাদেরকে ব্যবহার করে রাজা দাহির তাদেরই জ্ঞাতি, ও জাতি ভাইদের বিরুদ্ধে এ অস্ত্র ব্যবহার করবে। বিন কাসিম মিনজানিক চোরাই কাজে জড়িত দলনেতাসহ সবাইকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন।
০৮. রক্ষিত তশতরিতে
ঝিলপাড়ে রক্ষিত তশতরিতে বিন কাসিমের দ্বিখণ্ডিত মাথা রেখে আমার কাছে নিয়ে এসো….
হিন্দুস্তানে ইসলামের আগমন ও বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের জন্য সিস্তানের বিজয় ছিল একটি মাইল ফলক। আরব সৈন্যরা সিন্ধু অববাহিকার পলিমাটিতে নিজেদের রক্তে তৈরি করেছিল ইসলামের মহাপথ। সে পথেই সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল ইসলাম। কিন্তু সে সময়ে এ কাজটি অতোটা সহজ ছিল না, যতোটা সহজে আজ আমরা কথামালায় সেদিনের বিজয় ও মুসলিম সৈন্যদের কীর্তির চিত্র আঁকতে চেষ্টা করছি। পৌত্তলিক হিন্দস্তানের বুকে ইসলামের ঝাণ্ডা উড্ডীন ও আল্লাহর তকবীর ধ্বনী ছড়িয়ে দিতে অসংখ্য আরব মায়ের বুক খালি করতে হয়েছে, মা হারিয়েছে আদরের ছেলে, বোন হারিয়েছে ভাই আর সোহাগিনী স্ত্রী হারিয়েছে প্রেমময় স্বামী আর কলিজার টুকরো শিশুরা হারিয়েছে প্রাণপ্রিয় পিতা। এক সাগর রক্ত ও অসংখ্য নারী পুরুষ, কন্যা-জায়া, জননী ও এতীম শিশুদের ত্যাগ ও কুরবানীর বদৌলতে পৌত্তলিকতার স্বর্গরাজ্য হিন্দুস্তানের বাতাসে গুঞ্জরিত হয়েছে আযানের ধ্বনি। বিন কাসিমের সহযোদ্ধাদের দেহ সিন্ধু অঞ্চলের কতো জায়গায় দাফন করতে হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাদের এই আত্মত্যাগ ভারতের। ধনরত্ন লুটতরাজের জন্য ছিল না, ছিল না সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশা। প্রতিটি বিজিত এলাকায় তারা সাধারণ মানুষকে যে স্বাধীনতা ও শান্তির ছায়া দিতো, জিজিয়া হিসাবে তা ছিল খুবই নগণ্য। মুসলিম সৈন্যদের সদ্ব্যবহার হিন্দুস্তানের পৌত্তলিক শাসকদের হাতে নির্যাতিত নিষ্পেষিত সাধারণ জনতার হৃদয় জয় করেছিল, ফলে মুসলিম বাহিনী যতোই অগ্রসর হচ্ছিল হিন্দুস্তানের মাটিতেই তাদের অনুসারী ও ভক্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তারা দুর্গজয়ের পাশাপাশি গণমানুষের অন্তরও জয় করে নিচ্ছিল।
মমতা দিয়ে জয় হয় অন্তর তরবারী দিয়ে নয়। বিজিত মানুষেরা তাকেই বিজয়ী বীর বলে অভিহিত করে যে তাদের অন্তর জয় করে নিতে পারে।
বিন কাসিমের সৈন্যরা হিন্দুস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য ছিল পরমবন্ধু, রেশমের মতোই কোমল কিন্তু রাজা দাহিরের মতো ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের জন্য বিন কাসিমের প্রতিটি সৈনিক ছিল আকাশের বজ্রের মতো আতঙ্ক। মুসলিম ইতিহাসের গর্ব সবচেয়ে অল্প বয়ষের বিজয়ী সেনাপতি বিন কাসিম তখনো বিজিত দুর্গ শহর সিস্তানে অবস্থান করছিলেন। তার গন্তব্য ছিল আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার কিন্তু মুসলিম সৈন্যদের নীতি ছিল, তারা যখন কোন শহর দুর্গ বা অঞ্চল জয় করতো তখন সেই অঞ্চল বা শহরের মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা আগে সুসংহত করতো। তারা এই নীতি অবলম্বন করত যে, শাসন কাজে তারা যাতে বিজিতদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য করও ঠিকমতো আদায় করতে পারে এবং বিজিত অঞ্চলের জনগণেরও যাতে কর দিতে কষ্টের মুখোমুখি না হতে হয়। সর্বাগ্রে তারা গণমানুষের আতঙ্ক দূর করে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করতো। বলার অপেক্ষা রাখে না যুদ্ধ-বিধ্বস্ত কোন এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি সময় সাপেক্ষ হয়ে থাকে। সিস্তানে শান্তি শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিন কাসিমকেও কিছু দিন সেখানে অবস্থান করতে হলো।
