ইঙ্গিত পেয়ে মুসলিম সৈন্যরা বাধ ভাঙা শ্রাবনের মতো দুর্গভ্যন্তরে প্রবেশ করে। সেই সাথে মুসলিম সৈন্যরা আরেকটি দরজা খুলে দেয়। রাজা দাহিরের ভাতিজা বিজয় রায় ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারার মতো প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করতে লাগল এবং পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে সে পালানোর পথ খুঁজছিল। ভোরের অন্ধকার ফুড়ে সকালে প্রথম আলোতেই দুর্গের অধিবাসীরা দেখতে পেল, প্রধান ফটকের ওপরে ইসলামী ঝাণ্ডা উড্ডীন।
বিজয়ী মুসলিম সৈন্যরা বিজয় রায়ের সৈন্যদের গ্রেফতার করতে শুরু করলে দুর্গব্যাপী তালাশ করেও বিজয় রায়কে কোথাও পাওয়া গেল না। বিজয় রায়ের ধৃত সৈন্যরা বিন কাসিমকে জানালো, মুসলিম বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করতে দেখেই বিজয় রায় তার বিবি বাচ্চা ও আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে রাতের অন্ধকার থাকতেই প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। বিন কাসিম তার সৈন্যদেরকে বিজয় রায়ের পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দিলে বিজয় রায়ের এক কমান্ডার জানালো, তাকে এখন আর পাওয়া যাবে না। এতোক্ষণে সে সিসিম দুর্গে পৌছে গেছে।
বিন কাসিম বিজয় রায়ের সৈন্যদের মধ্য থেকে ধৃত কমান্ডারদের জড়ো করার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে আরো বললেন, এদেরকে বলো, যারা আমাদের মিনজানিক চুরি করেছিল এবং আমাদের চারজন সাথীকে হত্যা করেছিল, তাদেরকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করতে। এরা যদি ওদের চিহ্নিত করতে গড়িমসি করে তাহলে এদের প্রত্যেকের মাথা উড়িয়ে দাও এবং এদের ঘরবাড়ির সকল সহায় সম্পদ গণীমতের সম্পদ হিসেবে নিয়ে এসো। শাবান ছাকাফী বিজয় রায়ের ধৃত কমান্ডারদের একত্রিত করে বিন কাসিমের নির্দেশের কথা জানালেন। সেই সাথে তিনি এই হুমকিও দিলেন, তোমরা যদি ওদের চিহ্নিত করতে গড়িমসি কিংবা অজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে সবাইকে হাত পা বেধে জমিনের ওপর শুইয়ে ওপর দিয়ে ঘোড়া দৌড়িয়ে দেয়া হবে। ধৃত কমান্ডাররা আতঙ্কিত হয়ে মিনজানিক চোরাই কাজে জড়িতদের নাম বলে দিলো এবং তাদের দেখিয়ে দিলো। বিজয় রায়ের সকল সৈন্যই ছিল যুদ্ধাপরাধী। সবাইকে বেধে এক জায়গায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তন্মধ্যে চিহ্নিত দশজনকে উঠিয়ে বিন কাসিমের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। মিনজানিক চুরি করার সময় এই দলের লোকছিল চৌদ্দজন কিন্তু তাদের মধ্য
থেকে চারজন বিজয় রায়ের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে যে দলনেতা ছিল সে নিজ থেকেই বিন কাসিমের কাছে এসে আত্মস্বীকৃতি দিলো। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, মূলত মিনজানিক চুরির পরিকল্পনা করেছিল রাজা দাহির ও তার উজির বুদ্ধিমান। এ কাজটি সম্পাদন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বিজয় রায়ের ওপর। বিজয় রায় মুসলিম বাহিনীর মিনজানিক চুরি করার জন্য তার সৈন্যদের মধ্য থেকে অত্যন্ত দুর্ধর্ষ চৌদ্দ জনকে নিয়োগ করে এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন কমান্ডারকে এদের দলনেতা নিযুক্ত করে। এর আগে বিজয় রায় গোয়েন্দার মাধ্যমে খবর নিয়ে। ছিল মুসলিম বাহিনীর কয়েকটি মিনজানিক এখনো নৌকায় রয়ে গেছে এবং সেই নৌকাগুলো নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা আরো জানালো, সেখানে প্রতি রাতে চারজন সৈন্য পালাক্রমে পাহারা দেয়। একটি তাঁবুতে সৈন্যরা অবস্থান করে। বিজয় রায়ের নির্দেশে চৌদ্দজন সৈনিক শক্তিশালী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে অনেকটা পথ ঘুরে সাকিরা নদীর তীরবর্তী মিনজানিক বোঝাই করা নৌকাগুলোর কাছে পৌছে গেল।
নদীর তীর থেকে কিছুটা দূরে অপেক্ষা করে তাদের মধ্য থেকে দু’জন সৈনিক ঘেঁড়া ফাটা মলিন পোশাক পরিধান করে পাহারারত মুসলিম সৈন্যদের কাছে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফরিয়াদ করল, “আমরা আপনাদেরকে আপনাদের প্রভুর দোহাই দিয়ে বলছি, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আরো বলল, আমরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। সফরে বের হয়েছি, আমাদের সাথে দুটি যুবতী মেয়ে ছিল। এখান থেকে একটু দূরে ডাকাতরা আমাদের কাছ থেকে তাদের কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ডাকাতরা আমাদের কাছ থেকে সহায় সম্পদ অর্থকড়ি সোনাদানা সবই নিয়ে গেছে। আমাদের সাথে বয়স্ক দু’জন ছিল, ডাকাতরা তাদের মেরে ফেলেছে। আমরা প্রাণ নিয়ে এদিকে পালিয়ে এসেছি। আমরা যেহেতু মহাত্মা বৌদ্ধের অনুসারী, এজন্য আমরা সাথে কোন অস্ত্র রাখি না। কারো সাথে আমরা মারামারিও করতে পারি না।
ডাকাতরা কি ঘোড়া বা উটের ওপর সওয়ার? সাহায্য প্রার্থীদের জিজ্ঞেস করল এক পাহারাদার। না, এরা পায়দল। দয়া করে আপনারা আমাদের সাহায্য করুন। এখনতো এখানে আপনারাই রাজা বাদশা।
বিজয় রায়ের পাঠানো সৈন্য দু’জন মুসলিম পাহারাদারদের সাথে নির্যাতিত ও অসহায়ত্বের এমন নিপুণ অভিনয় করল যে, মুসলিম সৈন্যরা
অত্যাচারিতের সাহায্যের জন্য আবেগে উদ্বেলিত হয়ে গেল। হাতে তরবারী তীর বর্শা নিয়ে পাহারাদার দু’জন সাহায্য প্রার্থীদের নিয়ে তাদের দেখানো জায়গার দিকে দৌড়াতে শুরু করল। এ দিকে তাদের গন্তব্য স্থলের দিক থেকে ভেসে আসছিল নারী কন্ঠের আর্তনাদ ও আর্তচিৎকার, ফলে সাহায্যকারীগণ নির্যাতিতদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আরো বেশি আবেগ উত্তেজনা নিয়ে দৌড়াতে লাগল। এলাকাটি ছিল ঘন ঝোপ ঝাড়ে পরিপূর্ণ। সাহায্যকারীগণ দৌড়ে যাচ্ছিলো কল্পিত ডাকাতদের ধরতে আর মজলুম নারীদের উদ্ধার করতে কিন্তু গোটা ঘটনাটাই যে ছিল পরিকল্পিত নাটক তা ঘূর্ণাক্ষরেও তারা ভাবতে পারেনি। এদিকে ওৎপেতে থাকা চার পাঁচজন হিন্দু সৈন্য হঠাৎ দৌড়ে আসা মুসলিম প্রহরীদের ওপর খঞ্জর নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করল। এদিকে আরো কয়েকজন হিন্দু সৈন্য চুপি চুপি নদীর তীরবর্তী তাঁবুর দিকে অগ্রসর হলো। পাহারাদারদের দু’জন তখন তাবুতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হিন্দু ঘাতকরা পা টিপে টিপে তাবুতে ঢুকে অতর্কিতে তাদের বুকে খঞ্জর ঢুকিয়ে দিলো। মুসলিম সৈন্য দুজন প্রতিরোধের কোন অবকাশই পেল না।
