“তোমরা যে দুর্গের ভিতর থেকে এসেছ, এটা কিভাবে বিশ্বাস করব?” ধৃতদের জিজ্ঞেস করলেন শাবান ছাকাফী। শুধু তোমরা দু’জনের জন্যই কি দুর্গফটক খুলে দেয়া হয়েছে?
তোমাদের কি ধারণা শুধু ফটক দিয়েই দুর্গের বাইরে আসা যায়, আর কোন রাস্তা নেই? বলল এক আগন্তুক। দুর্গের ওই দিকটা পাহাড় টিলা ও জঙ্গলাকীর্ণ। ওদিকে দুর্গের বর্জ পানি বের হওয়ার জন্য দুর্গপ্রাচীরের নিচ দিয়ে একটি ড্রেন আছে। যেহেতু ওদিকটা জঙ্গলাকীর্ণ ও ময়লা আবর্জনার স্তুপে দুর্গন্ধময়। এ জন্য ওদিকে তেমন কেউ যায় না। ওখানকার রাস্তাও লোকজন চেনে না। আমরা দু’জন সেই ড্রেনের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দেয়ালের নীচের সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে এসেছি। বের হওয়ার কাজটি সহসাধ্য ছিল না।
কি উদ্দেশ্যে তোমরা বেরিয়ে এসেছো? জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী।
আমরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী বলল অপরজন। সিস্তান ও মৌজের অধিবাসীরা তোমাদেরকে কি বলেনি সিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসী বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। এখানে আমাদের ধর্মগুরু ভিক্ষু রয়েছেন। বৌদ্ধরা কারো সাথে সংঘাত সংঘর্ষ ও যুদ্ধ করে না, এটা তোমরা ইতোমধ্যেই জেনেছ। আমরা জানি, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে না, তাদেরকে তোমরা ভালো জানো। নিরূনে আমাদেব শাসক সুন্দরী বিনা বিবাদে তোমাদের কি স্বাগত জানায় নি? এখানে দুর্গভ্যন্তরে তোমরা যেসব পাথর নিক্ষেপ করছে, সেগুলো আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা শান্তি প্রিয় মানুষ। আমরা এখানে নির্বিবাদে জীবন যাপন করছি। আমাদের কোন লোক দাহিরের সেনাবাহিনীতে নেই।
আমরা এ অবস্থায় তোমাদের কি ধরনের সাহায্য করতে পারি? জানতে চাইলেন গোয়েন্দা প্রধান। তোমাদের লোকজন দুর্গের ভিতরে বসবাস করছে, কি করলে তোমাদের বাচানো যাবে?
তোমাদের সাহায্যের জন্য নয়, আমরা এসেছি তোমাদের সহযোগিতা করতে। বলল এক বৌদ্ধ। যে পথে আমরা দুর্গের বাইরে এসেছি এ পথ দিয়ে তোমরা দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করতে পারো। কিন্তু এ পথটিকে সুড়ঙ্গ করে আরো প্রশস্ত করতে হবে। সেখানকার নীচে মাটি নরম। তোমরা রাতারাতি সুড়ঙ্গ বড় করে সকাল হওয়ার আগেই দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়ে। আমাদের ভিক্ষুরা বলেছেন, দুর্গের ভিতরে তোমাদের সহযোগী লোকের অভাব হবে না। আমরা তোমাদেরকে ভিতরে প্রবেশের পথ দেখিয়ে দিতে এসেছি।
শাবান ছাকাফী তাৎক্ষণিকভাবে এদেরকে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে গেলেন এবং এদের সামগ্রিক অবস্থা সবিস্তারে সেনাপ্রধানকে অবহিত করলেন।
বিন কাসিম বর্ণনা শোনা মাত্র সেই স্থানটি দেখার জন্য বের হলেন। গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন জায়গাটা এতোটাই পুতি দুর্গন্ধময় যে সেখানে দাঁড়ানোই সম্ভব নয়, ময়লা আবর্জনা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে একাকসার। তিনি ময়লা পানি সেখান থেকে সরানোম পথ খুঁজতে লাগলো। সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেই তিনি একটা পরিকল্পনা করলে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যোদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন। যে দিক দিয়ে দুর্গের পানি
বাইরে বের হচ্ছিল এদিকে বেশি করে পাথর নিক্ষেপের জন্য মিনজানিক চালকদের তিনি নির্দেশ দিলেন কিন্তু কোন মিনজানিককে এ দিকে এগিয়ে আনতে নিষেধ করলেন। সেই সাথে সৈন্যদের বললেন, যেকোন মূল্যে ভোর হওয়ার আগেই সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। যে পথে দুর্গের পানি বের হচ্ছিল সেটিকেই খনন করে বড় করার কাজ শুরু হলো। সেখানকার মাটি ছিল কাদা পানিতে একাকসার। কিন্তু পানি আটকিয়ে খনন কাজ শুরু করতেই খননকৃত জায়গায় পানি এসে ভরে যাচ্ছিল। এতে খনন কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিন কাসিম সেখানেই দাড়িয়ে খনন কাজ তদারকি করছিলেন। সৈন্যরা কোমর পানিতে শরীর ডুবিয়ে খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। জায়গাটি জঙ্গলাকীর্ণ বিধায় ছিল প্রচণ্ড অন্ধকারাচ্ছন্ন। এদিকে মিনজানিক থেকে দুর্গের এ পাশে অবিরাম পাথর নিক্ষেপের ফলে দুর্গের এ পাশে কেউ আসার সাহস করল না। আরব সৈন্যদের মধ্যে এ ধরনের সুড়ঙ্গ তৈরিতে পারদর্শী লোকের অভাব ছিল না। তারা জীবনবাজী রেখে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ দ্রুততার সাথে সমাপ্ত করতে জানপ্রাণ দিয়ে লেগে গেল।
ভোর হওয়ার আগেই সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ সমাপ্ত হয়ে গেল। সময়ের অভাবে সুড়ং পথটি খুব বেশি বড় করা সম্ভব হয়নি। ভোর হওয়ার আগেই মুসলিম বাহিনীর জানবাজ কিছু সংখ্যক সৈন্যকে সুড়ঙ্গ পথে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। দু’জন সৈন্য গায়ে গা মিশিয়ে কোন মতে ভিতরে প্রবেশ করার মতো সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছিল। দু’জন ভিতরে প্রবেশ করেই পিছনে আশা সাথীকে বলল, এদিকে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করতে বলল। সাথীরা পরস্পর একথা দুর্গের বাইরের সাথীদের মাধ্যমে দ্রুত বিন কাসিম পর্যন্ত পৌছে দিলো।
দুর্গ থেকে আগত বৌদ্ধ দু’জনও প্রবেশকারী সৈন্যদের সাথে ছিল। এদেরই অপর এক সাথী দুর্গের ভিতরে তাদের দেখার অপেক্ষায় ছিল। মুসলিম সৈন্যদের কয়েকজন ভিতরে প্রবেশ করলে বৌদ্ধরা তাদেরকে সবচেয়ে নিকটবর্তী দুর্গফটকের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে তখন কয়েকজন হিন্দু সৈন্য পাহারা দিচ্ছিল। হিন্দু সৈন্যরা কল্পনাও করেনি, কোন মুসলিম সৈন্য রাতের অন্ধকারে সেখানে পৌছে যাবে। এ দিক থেকে ওরা ছিল অনেকটাই নিশ্চিন্তে। মুসলিম জানবাজরা অতর্কিতে হিন্দু প্রহরীদের ওপর হামলে পড়ে অল্পক্ষণের মধ্যে সবপ্রহরীকে ধরাশায়ী করে দ্রুত দুর্গের দরজা খুলে দিল।
