বিজয় রায় বৌদ্ধদের এই পয়গাম শুনে তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, এদেরকে অপমান করে দুর্গ থেকে বের করে দাও। বিজয় রায়ের কাছ থেকে অপমাণিত হয়ে ফিরে এসে বৌদ্ধদের একটি দল বিন কাসিমের কাছে হাজির হয়। তারা বিন কাসিমকে প্রস্তাব করে, আপনি যদি এই বসতি দখল করতে চান তাহলে করতে পারেন, আপনাকে কোন প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে না।
আপনি যদি এখান থেকে আপনাদের ঘোড়া ও উটের খাবার সংগ্রহ করতে চান, করতে পারেন, আপনি ইচ্ছা করলে সৈন্যদের জন্য খাবার ও তরিতরকারীও সংগ্রহ করতে পারেন। আপনি যদি নগত টাকা পয়সা নিতে আগ্রহী হন তাহলে তাও আমরা আপনার দরবারে হাজির করতে প্রস্তুত। ‘শান্তি ও বন্ধুত্বের চেয়ে আর কিছুই বেশি দামী হতে পারে না।’ ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম। আপনারা যেহেতু বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করেছেন, তাই আমরাও আপনাদের ধন সম্পদ ও জীবনের ‘ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এখন থেকে আমরাই হবো আপনাদের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত সম্ভ্রমের পাহারাদার।
বিন কাসিম সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে সিস্তানে পৌছে দেখলেন দুর্গের। সব ক’টি ফটক বন্ধ। দুর্গপ্রাচীরের প্রশস্ত দেয়ালের ওপর সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। মুসলিম সৈন্যদের আসার খবর পেয়েই বিজয় রায় দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করেছিল।
মুসলিম সৈন্যরা দেখলো একটি মিনজানিক দুর্গের সদর দরজার ওপরের দেয়ালে রাখা হয়েছে। বিন কাসিমের নির্দেশে এক ডেপুটি সেনাপতি ফটকের কাছে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, কোন ধরনের প্রতিরোধের চেষ্টা না করে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গের ফটক খুলে দাও। না হয় আমাদেরকে যদি দুর্গ দখল করতে হয় তাহলে তোমাদের কাছ থেকে আমরা অধীনতামূলক জিজিয়াসহ যাবতীয় যুদ্ধ ব্যয় আদায় করবো এবং তোমাদের সম্পদ গনীমতের সম্পদে পরিণত হবে, আর সেনাবাহিনীর কোন কর্মকর্তাকেই জ্যান্ত রাখা হবে না।
“যদি সাহস থাকে তাহলে হামলা করে দেখো, শক্তি থাকলে দুর্গ দখল করেই দেখিয়ে দাও।” জবাব এলো দুর্গপ্রাচীর থেকে।। দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি মিনজানিক স্থাপন করতে মিনজানিক ইউনিটকে নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। মিনজানিক এগিয়ে নিতে গেলে দেয়ালের ওপর
থেকে শত্রু বাহিনী তীর বৃষ্টি বর্ষণ করতে শুরু করল। সেই সাথে দুর্গফটকের ওপরে স্থাপনকৃত মিজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করল হিন্দু সৈন্যরা। তবুও মুসলিম সৈন্যরা দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি চলে গেল কিন্তু দুর্গপ্রাচীরের – এমন কোন জায়গা দেখা গেল না, যেখানে মিনজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করে ভাঙ্গন সৃষ্টি করা যাবে।
দুর্গের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বিজয় রায় ও তার অনুগত সেনাদের অনুকূলে ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ অধিবাসীদের একটি প্রতিনিধিদল মুসলিম সেনারা অবরোধ করার পরপরই বিজয় রায়ের কাছে গিয়ে আবেদন করল, “মহামান্য শাসক! আপনি দুর্গফটক খুলে দিন। শহরের অধিবাসীরা যুদ্ধ চায় না। আপনি তাদের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সহযোগিতা পাবেন না। বিজয় রায় তাদেরকে হুমকি ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে জেলখানায় বন্দি করে রাখার নির্দেশ দিলো। অতঃপর দুর্গব্যাপী হুকুম জ্বারি করল, যারা যুদ্ধ করতে চায় না, তারা যেন নিজ নিজ বাড়িঘরে দরজা বন্ধ করে অবস্থান করে আর যারা যুদ্ধ করতে চায় তারা যেন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দুর্গপ্রাচীরে এসে হাজির হয়।
বিজয় রায়ের সৈন্যরা মুসলিম বাহিনী যে দিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করে দেয়ালে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা করছিল, সে দিকে তীরের তুফান বইয়ে দিচ্ছিল। তাছাড়া বিজয় রায়ের সৈন্যরা হঠাৎ কোন দরজা খুলে শত শত অশ্বারোহী ঝড়ের বেগে এসে মুসলিম সৈন্যদের ওপর আক্রমণ করে আবার ঝড়ের বেগে দুর্গে প্রবেশ করে পরিস্থিতি সংকটময় করে তুলছিল।
অবস্থা দেখে বিন কাসিম সর্বশ্রেষ্ঠ মিনজানিক উরূস এর পরিচালক জাউনা সালমীকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাকে বললেন, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না, আমাদের কাছ থেকে চুরি করে আনা মিনজানিক দিয়ে শত্র সেনারা আমাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করছে। ছোট মিনজানিকগুলো দিয়ে ওটাকে আঘাত করা যাচ্ছে না। তুমি ডাভেল মন্দিরের চূড়া ভেঙে সেখানকার ঝাণ্ডা গুড়িয়ে দিয়েছিল। আজও এই মিনজানিকটাকে উড়িয়ে দাও।
এটি উড়িয়ে দেবো ইনশাআল্লাহ। সম্মানিত সেনাপতি! আপনি চিন্তা করবেন না। এতে আমার মাত্র তিনটি পাথর ব্যবহার করতে হবে। জাউনা সালমী উরুসকে এগিয়ে নিয়ে সুবিধা মতো স্থানে স্থাপন করে তিনটি বিরাটকায় পাথর সেটিতে রাখল। পাঁচশ সৈন্য তার নির্দেশে মিনজানিক উৎক্ষেপণ করলে লক্ষভেদী নিক্ষিপ্ত পাথর গিয়ে দুর্গফটকের ওপরে শত্রু
সেনাদের স্থাপিত মিনজানিকের একপাশে আঘাত হানলো। এতে শত্রুদের মিনজানিকটি এক দিকে কাত হয়ে গেল। এরপর আরেকটি পাথর নিক্ষেপ করলে সেটি গিয়ে মিনজানিকের মাথায় আঘাত করলে সেটি ধ্বসে গিয়ে স্থান থেকে সরে গেল। তৃতীয় পাথরটির আঘাতে শত্রুদের মিনজানিক দুর্গপ্রাচীরের নিচে নিক্ষিপ্ত হলো। … :
এরপর মুসলিম সৈন্যদের আর শত্রুদের নিক্ষিপ্ত পাথরের মোকাবেলা করতে হলো না। শুরু হলো এক তরফা মুসলিম বাহিনীর মিনজানিক থেকে শত্রুদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ। বিজয় রায় মুসলিম সৈন্যদের অবরোধ ভাঙার জন্য দুর্গফটক খুলে হঠাৎ ঝটিকা আক্রমণ করে আবার দুর্গে ফিরে আসার নির্দেশ দিলো। যথেষ্ট সাহসিকতার সাথে বিজয় রায়ের সৈন্যরা ঝটিকা আক্রমণ করে ফিরে যেত। মুসলিম সেনারা ওদের তাড়া করতেই তারা দুর্গপ্রাচীরের ভিতরে চলে যাচ্ছিল। এভাবে চলে গেল এক সপ্তাহ। উল্লেখযোগ্য তেমন কোন অগ্রগতি মুসলিম সৈন্যরাও সাধন করতে পারল না। এমন সময় রাতের বেলায় মুসলিম বাহিনীর প্রহরীদল দু’লোককে পাকড়াও করে নিয়ে এলো। তাদের শরীর কাদাপানিতে একাকসার। তারা সৈন্যদের বলল, আমরা দুর্গের ভিতর থেকে এসেছি, মুসলিম বাহিনীর সেনাপতির সাথে আমরা সাক্ষাত করতে চাই। সৈন্যরা এদেরকে সেনাপতি বিন কাসিমের কাছে না নিয়ে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর কাছে নিয়ে এলো। কারণ এদেরকে শত্রু সেনাদের গোয়েন্দা হওয়ার আশঙ্কা করছিল তারা।
