মিনজানিক ওখানে কখন এনেছে ওরা? দূতকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
আমি সেখানে থাকাবস্থায়ই মিনজানিকটি এনেছে তারা। দুর্গের ভিতরে সেটিকে নিয়ে আসার দৃশ্যও আমি দেখেছি, বলল দূত। দুটি হাতি সেটিকে টেনে নিয়ে আসছিল, আর বারো তোরোজন অশ্বারোহীও সেটির সাথে ছিল। আমিতো দেখে অবাক। মিনজানিক কোথেকে আনলো এরা। কারণ এই অঞ্চলে এমন যন্ত্র বানানোর কোন কারিগর নেই।
দুর্গের প্রধান ফটকের ওপরের দুর্গপ্রাচীরে সেটিকে স্থাপন করেছে। মিনজানিকের পাশে পাথরের বিশাল স্তুপ করেছে।
দূতের কথা শুনে স্মিত হেসে বিন কাসিম বললেন, আল্লাহর কসম। এরা আসলে বোকা। এরা এক দিকে দারুণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, এখানে এসে আমাদের চার সিপাহীকে হত্যা করে মিনজানিক চুরি করে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছে, কিন্তু এরা এটা জানা ও বোঝার চেষ্টা করেনি, মিনজানিক কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে হয়। ঠিক আছে তুমি আর কি দেখে এসেছ বলো…। ‘সিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলল দূত। আমি ওখানে গিয়ে যখন জানতে পারি শাসক বদলে গেছে, তখন আত্মপরিচয় গোপন করে শহরে ঘুরতে থাকি। শহরের সাধারণ মানুষ যুদ্ধে আগ্রহী নয় কিন্তু বিজয় রায় তাদেরকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করছে। বিজয় রায় তাদেরকে মুসলমানদের সম্পর্কে ভয় দেখাতে বলছে, মুসলিম সৈন্যরা এতোটাই হিংস্র যে, ওরা শহরে প্রবেশ করলে নির্বিচারে গণহত্যা চালাবে, শহর তছনছ করে ফেলবে, তাছাড়া শহরে সকল যুবতীদের ধরে নিয়ে সৈন্যরা ভাগাভাগি করে তাদের সাথে…?
বিজয় রায়ের এ অপপ্রচার ছিল সকল অমুসলিমদের অপপ্রচারেরই একটা অংশ। সেও মুসলিম বিদ্বেষীদের প্রচলিত রীতি অনুসরণ করেই সিস্তানের
অধিবাসীদেরকে মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছিল। কিন্তু বিজয় রায়ের এই অপপ্রচার ছিল বিন কাসিমের বাহিনীর কার্যক্রমের বিপরীত। বিন কাসিমের বাহিনী সিন্ধু এলাকার যেসব দুর্গ ও শহর জয় করেছিল সেখানকার অধিবাসী ও হিন্দু বাসিন্দারা পর্যন্ত বিন কাসিম ও মুসলিম সৈন্যদের সব্যবহারে ছিল মুগ্ধ। তারা রাজা দাহির ও হিন্দু শাসকদের অপপ্রচারের বিপরীত প্রত্যক্ষ করছিল মুসলিম সেনাদের মধ্যে। ফলে তাদের ইতিবাচক প্রচারণা হিন্দু শাসকদের মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডাকে অকার্যকর করে দিচ্ছিল। ডাভেল, নিরূন বিজিত হওয়ার পর সেখানকার বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ব্যবসায়ী নানা কাজে সিস্তানসহ অন্যান্য এলাকায় গিয়ে মুসলিম সৈন্যদের সব্যবহার ও তাদের সুশাসনের প্রচার করছিল। তারা যেখানেই যেত সর্বাগ্রে আলাপ আলোচনায় স্থান পেতো মুসলিম সৈন্যদের ন্যায়নীতি ও সুশাসনের প্রশংসা।
বিজিত শহর আরমান ভিলা, ডাভেল ও নিরূনের কিছু ব্যবসায়ী ও নাগরিক সিস্তানে এসে মুসলিম সৈন্যদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করায় বিজয় রায়ের অপপ্রচার হালে পানি পাচ্ছিল না। বিজিত এলাকার ব্যবসায়ীরা এসে সিস্তানবাসীদের জানালো, বিজয়ী সৈন্যরা ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে না, কোন বাড়িঘরে হামলা করে না, কারো ওপর জুলুম অত্যাচার করে না, বিশেষ করে কোন নারীর প্রতি তারা তাকিয়েও দেখে না। তারা নারীকে খুবই ইজ্জত ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে।
সুন্দশ্রীর দূত আরো বলল, সিস্তানের সাধারণ নাগরিক আর সৈন্যদের মধ্যে ঐক্য নেই। হিন্দু সেনাবাহিনী ও সেখানকার সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ নাগরিকদের মধ্যে আদর্শিক মত পার্থক্য প্রবল।
বিন কাসিম একজনকে নিরূনের শাসক নিযুক্ত করে এবং সেনাদের একটি ইউনিটকে নিরূনের প্রশাসনিক দায়িত্বে রেখে সিস্তানের দিকে অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিলেন। বিন কাসিম কোন সালের কোন মাসে কোন তারিখে নিরূন থেকে সিন্তানের দিকে অগ্রাভিযান শুরু করেছিলেন এর সুস্পষ্ট কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। মিনজানিক চুরি হওয়া এবং চারজন সৈন্য গুপ্তঘাতকের আক্রমণে মারা যাওয়ার পর বিন কাসিম খুবই সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। পূর্বের চেয়ে তিনি আরো বেশি সতর্ক ও সচেতনতার সাথে পা মেপে মেপে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কোন ধরনের ঝটিকা আক্রমণে যাতে শত্রু বাহিনী তাদের ঘায়েল করতে না পারে এজন্য সৈন্যদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করে অভিযান শুরু করলেন।
তিনি মধ্যভাগে অবস্থান নিলেন। সবার আগে পাঠিয়ে দিলেন অগ্রবর্তী – দল। আর দু’পাশের বাহুতে উষ্ট্রারোহী বাহিনীকে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিলেন, যাতে শত্রু বাহিনী হঠাৎ পিছন দিক কিংবা কোন বাহুতে ঝটিকা আক্রমণ করে সৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করতে না পারে। যথাসম্ভম যাত্রা বিরতি কম করে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হওয়ার জন্য সেনাদের নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। রাজা দাহিরের সৈন্যবাহিনীর তুলনায় বিন কাসিমের জনবল ছিল কম কিন্তু কম হলেও তারা প্লাবনের মতো দ্রুতগতিতে শত্রু ঘাটির প্রতি অগ্রসর হচ্ছিল। এদিকে রাজা দাহির সিস্তানের বৌদ্ধ শাসককে রাজধানীতে ডেকে নিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিস্তানের শাসক ও সেনাপ্রধানের ক্ষমতায় আপন ভাতিজা বিজয় রায়কে বসায়।
অভিযানের তৃতীয় দিনে বিন কাসিমের সৈন্যরা মৌজ নামক স্থানে পৌঁছে গেল। মৌজ সিস্তান শাসকের অধীনে ছিল। এলাকাটির অবস্থান ছিল একটি নদীর তীরে। নদীর তীরে বসতিও ছিল তবে এরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বিন কাসিমের বাহিনী যখন সেখানে শিবির স্থাপন করল, তখন সেখানকার বৌদ্ধদের একটি প্রতিনিধি দলকে নিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু বিন কাসিমের কাছে হাজির হলো। ভিক্ষুরা গিয়ে বিন কাসিমকে জানালো, আমরা আপনার কাছে শান্তির পয়গাম নিয়ে এসেছি। আমরা কোন সংঘাতে বিশ্বাস করি না। বৌদ্ধধর্ম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। হিংসা বিদ্বেষ রক্তপাত আমাদের ধর্মে নিষিদ্ধ ও মহাপাপ। আমরা আপনার কাছে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করছি। আপনি আমাদেরকে মিত্র হিসাবে গ্রহণ করুন। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, মৌজ এলাকার বৌদ্ধরা সিস্তানের পরিবর্তিত শাসক বিজয় রায়ের কাছে এক প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে এই আবেদন করেছিলেন যে, আপনি দুর্গভ্যন্তরে রয়েছেন আপনার হাতে রয়েছে সেনাবাহিনী। আমরা খুবই দুর্বল, আমাদের লড়াই করার সামর্থ নেই। লড়াই করতে চাইলেও আমরা তা পারব না, কারণ আমরা লড়াই ও সংঘাতে অভ্যস্ত নই। আমাদের ধর্ম যুদ্ধ সংঘাতের বিরোধী। আমাদের ধর্ম গুরু মহাত্মা বৌদ্ধ বলেছেন, সৈন্য দিয়ে কোন জনবসতিকে তোমার পযুদস্ত করে দিতে পারো, তরবারী দিয়ে করো দেহ দ্বিখণ্ডিত করে দিতে পারো, তীর চালিয়ে বুক ঝাজরা করে ফেলতে পারো কিন্তু অত্যাচার চালিয়ে কোন মানুষের মন জয় করতে পারবে না। আপনি যদি চান যে, আমরা মুসলিম সৈন্যদের আনুগত্য না করি, তাহলে আমাদের সাথে কিছু সৈন্য পাঠিয়ে দিন কিন্তু আমরা যুদ্ধ করতে পারবো না।
