যান। শত্রুরা খুবই গভীর ফাদ তৈরী করেছে। আপনার এখানে থাকা ঠিক হবে না। নিরূনে আমাদের আর অবস্থান করাটাই ঠিক হবে না, বললেন বিন কাসিম। আমাদেরকে এখন দ্রুতগতিতে অভিযানে নামতে হবে। শত্রুরা আমাদের মিনজানিক এজন্যই চুরি করেছে, যাতে এটা দেখে তারা মিনজানিক বানিয়ে নিতে পারে। আমি তাদেরকে মিনজানিক তৈরি করে প্রতিরোধ করার সুযোগ দিতে চাই না। হতে পারে আমি চোরকে পথিমধ্যে পাকড়াও করবো, বললেন গোয়েন্দা প্রধান। মিনজানিক এতোছোট জিনিস নয় যে, তাড়াতাড়ি এটিকে যে কোন দিকে নিয়ে পালিয়ে যাবে।
এ এলাকা থেকে আপনার চলে যাওয়া উচিত। এমন না হয় যে, লুকিয়ে থাকা কোন শত্রুর তীর আপনাকে বিদ্ধ করে। বিন কাসিম মৃত সৈন্যদের লাশগুলোকে তুলে আনবার জন্য কয়েকজন সেনাকে নির্দেশ দিলেন।
রাতের কোন সময় মিনজানিক এখান থেকে নিয়ে গেছে এ ব্যাপারটি কারো পক্ষে জানার উপায় ছিল না। এটাও জানার উপায় ছিল না, কোন দিকে নিয়ে গেছে এগুলো। শা’বান ছাকাফীর একান্ত নিরাপত্তারক্ষীদের কয়েকজন তার সাথে ছিল। তাছাড়া বিন কাসিমের একান্ত নিরাপত্তারক্ষীদের থেকে আরো দু’জনকে তিনি সাথে নিয়ে গেলেন। গোয়েন্দা প্রধান সৈন্যদের নিয়ে নদীতীর দিয়ে ভাটির দিকে অগ্রসর হয়ে এমন একটি জায়গায় গিয়ে থামলেন সেখানে নদীটা বেশ চওড়া। সেখানে তিনি সবাইকে ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাপিয়ে পড়তে নির্দেশ দিলেন এবং সাথীদের নিয়ে ঘোড়াসহ সাতরিয়ে নদী পার হলেন। নদী পার হয়ে সহযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি ভাটিতীর ধরে ভাটির দিকে বহুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হলেন। তীরের এক জায়গায় একটি নৌকার অর্ধেকটা ডাঙ্গায় উঠানো অবস্থায় দেখতে পেলেন। এগিয়ে গিয়ে দেখলেন এটিই সেই হারিয়ে যাওয়া নৌকা যেটাতে সবচেয়ে ছোট মিনজানিকটি বোঝাই করা ছিল। নৌকাটি তখন ছিল খালি। নদীতীরে মিনজানিক নৌকা থেকে টেনে নামানোর স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পেলেন গোয়েন্দা প্রধান। মিনজানিকটির চারটি চাকা ছিল। এগুলোর চিহ্নগুলো মাটিতে স্পষ্ট রয়ে গেছে। গোয়েন্দা প্রধান দেখতে পেলেন সেখানে হাতি ও ঘোড়ার পদচিহ্নও রয়েছে। শাবান ছাকাফী বুঝতে পারলেন শত্রু বাহিনী মিনজানিকটি চুরি করে এখানে এসে হাতি দিয়ে টেনে তুলে হাতি ব্যবহার করে সেটিকে টেনে নিয়ে
গেছে। হাতির শক্তি সামর্থ ও গতি সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ। তদুপরি পদচিহ্ন ধরে কয়েক মাইল অগ্রসর হলেন তিনি। কিন্তু মিনজানিক বহণকারী কোন দলকে দেখতে পেলেন না। অনেকদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে মিনজানিক কোথায় নিয়ে যেতে পারে শত্রু সেনারা তা আন্দাজ করতে পারলেন তিনি। তাই যাত্রা বিরতি দিয়ে ফিরতি পথ ধরলেন সহযোদ্ধাদের নিয়ে। ফিরে এলেন নিরূন।
সম্মানিক সেনাপতি! তল্লাশী অভিযান থেকে ফিরে এসে বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বললেন গোয়েন্দা প্রধান। আমাদের মিনজানিকটি শত্রু সেনারা নিয়ে গেছে। ওরাই প্রহরীদের হত্যা করেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি মিনজানিকটি ওরা সিস্তান নিয়ে গেছে। এখন আমাদের দ্রুত অগ্রাভিযান চালাতে হবে। আপনি গতকাল ঠিকই বলেছেন, অনুরূপ মিনজানিক তৈরি করার সুযোগ আমরা শত্রুদের দেবো না। এতো দ্রুত আমরা ওদের ওপর আক্রমণ করব, মিনজানিক বানানো দূরে থাক জিনিসটি ওরা ভালোভাবে দেখার সুযোগও পাবে না। নিরূন থেকে বিন কাসিম সিস্তান অভিযানেরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু এতো শীঘ্র অভিযানের সংকল্প তাঁর ছিল না। যতোটাই সিন্ধু অঞ্চলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল মুসলিম বাহিনী, বিন কাসিমকে ততোটাই ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে হচ্ছিল। রাজা দাহিরের রণকৌশল আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বিন কাসিম। দাহির ভেবে ঠিক করেছিল আরব সৈন্যরা একেরপর এক অভিযান চালিয়ে দুর্গের পর দুর্গ জয় করে শক্তিক্ষয় ও অংশ বিশেষকে বিজিত এলাকার নিয়ন্ত্রণে রেখে যখন সামরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন প্রবল প্রতাপে এক আক্রমণেই মুসলিম বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দেবে দাহির বাহিনী। তাই প্রতিটি অগ্রাভিযানের আগে সঠিক পরিকল্পনা এবং জনশক্তি ক্ষয়ের জন্য গভীরভাবে ভাবতে হতো বিন কাসিমকে। কিন্তু বেশি ভাবনার সুযোগ তার হলো না। পরিস্থিতি দ্রুত অভিযান চালাতে বাধ্য করল। নিরূন শাসক সুন্দরী তার অনুগত এক বৌদ্ধকে সিস্তানের বৌদ্ধ শাসকের কাছে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। যাতে সেখানকার শাসক বিন কাসিমের মোকাবেলা না করে স্বাগত জানায়। বিন কাসিম এই দুতের ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। ইতোমধ্যে সেই দূতও ফিরে এলো।
দূত এসে সুন্দরীর উপস্থিতিতে বিন কাসিমকে জানালো, সিস্তান এখন শুধু একটি দুর্গ নয়, সেটি পাহাড়ের মতো দুর্ভেদ্য হয়ে গেছে। রাজা দাহির
সিস্তানের বৌদ্ধ শাসককে রাজধানীতে তলব করেছেন আর তার পরিবর্তে তার ভাতিজা বিজয় রায়কে সেখানকার শাসক বানিয়েছেন। বিজয় রায় এসেই সেনাবাহিনীর মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সে সেনাদেরকে নতুনভাবে তৈরি করেছে। এমনিতেই সিস্তান দুর্গ মজবুত। তদুপরি বিজয় রায় দুর্গটিকে আরো দুর্ভেদ্য বানিয়ে ফেলেছে। সিস্তান দুর্গ অবরোধ করে জয় করা সহজসাধ্য হবে না। তাছাড়া দুর্গ রক্ষার জন্য তারা কোথেকে জানি একটি মিনজানিক নিয়ে এসেছে।
