বিন কাসিমের পরবর্তী গন্তব্য ছিল সিহুন। পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দুর্গ ছিল কিন্তু এগুলোর ব্যাপারে কোন আশঙ্কা ছিল না। কারণ সুন্দরী তঁাকে এসব ছোট ছোট দুর্গের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছিলেন। এগুলোর শক্তি সৈন্যবল ও নিয়ন্ত্রকের অবস্থা জেনে নিয়েছিলেন বিন কাসিম। সিহুনের শাসকও ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধরা যুদ্ধ সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডকে খুবই অপরাধ বলে বিশ্বাস করতো, তাই আশা করার যথেষ্ট কারণ ছিল যে, সিহুনও সংঘর্ষ ছাড়াই কব্জা করা যাবে। কিন্তু সেখানকার সেনাবাহিনীর সিংহভাগ ছিল হিন্দু। এদিক থেকে একটা আশঙ্কা রয়েই গিয়েছিল হিন্দু সৈন্যরা বিনা বাধায় দুর্গ বিন কাসিমের হাতে তুলে দেবে না। নিরূন শাসক সুন্দরী এক দূতকে সিহুনের শাসকের কাছে আগেই এই খবর দিয়ে পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি যেন লড়াই থেকে বিরত থাকেন এবং
মুসলিম বাহিনীকে দুর্গফটক খুলে স্বাগত জানান। কিন্তু তখনো সুন্দরীর দূত ফিরে আসেনি, এজন্য বিন কাসিম যাত্রা বিলম্বিত করছিলেন। সেই সাথে আরো রসদ ও জরুরি সামগ্রী এসে পৌছার জন্যও কিছুটা অপেক্ষার প্রয়োজন ছিল।
হঠাৎ একদিন খবর এলো, যেসব সৈন্য নদী তীরে মিনজানিক পাহারায় দিচ্ছিল, এদের মধ্যে দু’জনকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে পাওয়া গেছে আর দু’জনের কোন খোঁজ নেই।
পাহারা দেয়ার জন্য এক সপ্তাহের জন্য চারজন সৈন্য পাঠানো হতো। তাদের দু’জন সেখানে তাঁবুতে বিশ্রাম করত আর দুজন নদীতীরে বাঁধা নৌকাগুলো পাহারা দিতে টহল দিতো। এভাবে পর্যায়ক্রমে কিছুক্ষণ পরপর পালা বদল করে কর্তব্য পালন করতো। নদীর তীরের প্রায় এক মাইলের মতো জায়গায় সামরিক সরঞ্জাম ভর্তি নৌকাগুলো বাঁধা। বিন কাসিমের কাছে সংবাদটি ছিল খুবই দুশ্চিন্তার। দু’জন মৃত আর দুজন নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপাটি মোটেও স্বাভাবিক কোন ঘটনা ছিল না। মৃতদেরকে খঞ্জরাঘাতে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল।
সংবাদ পেয়েই বিন কাসিম ও গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তাদের একান্ত নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে অকুস্থল পরিদর্শন করলেন।
তারা দেখতে পেলেন, উভয়ের মৃতদেহ নদীতীরে পানি থেকে কিছুটা দূরত্বে পড়ে রয়েছে। শা’বান ছাকাফী সেখানকার মাটিতে মানুষের পদচিহ্ন নিরীক্ষা করলেন, পদচিহ্ন দেখে বুঝতে পারলেন এখানে সংঘর্ষ তেমন হয়নি। উভয়ের তরবারী ছিল কোষবদ্ধ, তাতে বোঝা যায় মোকাবেলা করার মতো সুযোগ তারা পায়নি।
আকষ্মিক আক্রমণ করা হয়েছে এদের ওপর, বললেন শাবান ছাকাফী। ধোকা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এদেরকে। তাহলে যে দু’জন নিখোঁজ হয়েছে, এরাই এদের ঘাতক? জানতে চাইলেন বিন কাসিম।
আল্লাহর কসম? এটা আমি বিশ্বাস করব না! বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
গভীরভাবে সেখানকার মাটি পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন শাবান ছাকাফী। এলাকাটি ছিল অনাবাদী ও বালুকাময়। পায়ের ছাপ পরিষ্কার বোঝা যায়। পায়ের ছাপ দেখে দেখে শাবান ছাকাফী নদীতীর থেকে অনেক দূর অগ্রসর হলেন। এক পর্যায়ে তিনি নিখোঁজ প্রহরীদের মৃতদেহও পেয়ে গেলেন। নদীতীর থেকে অনেক দূরে তাদের খরাঘাতে হত্যা করে ফসলী খেতের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল।
সেই জায়গা থেকে পদচিহ্ন দেখে দেখে শা’বান ছাকাফী আবার নদীর তীরের দিকে অগ্রসর হয়ে একেবারে সর্বশেষ মিনজানিক বহণকারী নৌকার কাছে পৌছলেন। ঘাতকের পদচিহ্ন তাকে এই পর্যবেক্ষণে বাধ্য করল। এখানে এসে তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, মিনজানিক কতগুলো আছে তা এক্ষুণি গুণে দেখো। সব মিনজানিক ও সামরিক সরঞ্জাম তল্লাসী করা হলে জানা গেল, মিনজানিকের সংখ্যা একটি কম এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র মিনজানিকটি নেই। শাবান ছাকাফী বিন কাসিমকে রিপোর্ট দিলেন, “এই হত্যাকাণ্ড শত্রুপক্ষের কাজ শক্ত ঘাতকরা এদের হত্যা করে ছোট্ট মিনজানিকটি নিয়েগেছে।”
অবশ্য এটা জানা সম্ভব হয়নি, কি করে মিনজানিকটি হিন্দুরা এখান থেকে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিল। শা’বান ছাকাফী আশঙ্কা করলেন, রাজা দাহির এখন তার কারিগরদের দিয়ে দ্রুত মিনজানিক তৈরি করার চেষ্টা করবে। তখনকার দিনে মিনজানিক ছিল এক বিস্ময়কর সামরিক অস্ত্র। আরবরা যখন মিনজানিক ব্যবহার করতে শুরু করে হিন্দুস্তানে এর কোন নামগন্ধও ছিল না। মিনজানিকের অদ্ভুত কার্যকারিতা দেখে রাজা দাহির তার উজির বুদ্ধিমানকে বলল, যে কোনভাবে অন্তত একটা মিনজানিক হাত করার চেষ্টা করো। যাতে আমরাও এমন মিনজানিক তৈরির চেষ্টা করতে পারি। মিনজানিক নিয়ে ওরা যেভাবে আমাদের দুর্গের ভিতরে বিরাট বিরাট পাথর নিক্ষেপ করছে, তাতে দুর্গ রক্ষা করা মুশকিল।
বিন কাসিমের নিরাপত্তারক্ষীদের নদীর তীরবর্তী এলাকায় তল্লাশী করে দুর্ঘটনার সূত্র উদঘাটনের নির্দেশ দেয়া হলো। নির্দেশ পাওয়া মাত্র দ্রুত ঘোড়া দৌড়াল চৌকস বিশেষ বাহিনী। বিন কাসিম ও গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফীও দু’দিকে ঘোড়া দৌড়ালেন। নদীর যে তীরে নৌকাগুলো বাধা ছিল সেই তীরবর্তী বহু দূর পর্যন্ত গোটা এলাকা তারা তন্ন তন্ন করে তল্লাশী করলেন কিন্তু কোন দুষ্কৃতিকারীর কোন চিহ্নও খুঁজে পেলেন না। অবশেষে হতাশ হয়ে উভয়েই অকুস্থলে ফিরে এলেন।
সম্মানিত সেনাপতি। বললেন গোয়েন্দা প্রধান। আমি নদীর অপর তীরে যাচ্ছি। আপনার দুজন নিরাপত্তারক্ষী আমাকে দেন আর আপনি শিবিরে চলে
