কয়েক ঢোক শরাব গলধঃকরণের পরই পণ্ডিত দু’হাতে মাথা চেপে ধরল। অতঃপর সে দু’হাতে বুক মালিশ করতে শুরু করল। খুব কষ্টে সে শুধু এতোটুকুই বলতে সক্ষম হলো, তুমি আমাকে কি পান করিয়েছো? আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, পণ্ডিতজী মহারাজ! এটা কাউকে না কাউকে তো পান করতেই হতো…। এরপর আমি মন্দির থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলাম। সদর দরজার কাছে পৌছলে মন্দিরে অচেনা এক লোককে প্রবেশ করতে দেখলাম। তখনো পণ্ডিতের কক্ষে প্রদীপ জ্বলছিল আর পণ্ডিত এক হাতে বুক চেপে ধরে বুকে ঘোঙাচ্ছিল। পণ্ডিতের ঘোঙানীর শব্দ শুনে লোকটি দৌড়ে পণ্ডিতের কক্ষে প্রবেশ করল। এদিকে তখন আমি মন্দিরের প্রধান ফটক পেরিয়ে রাস্তায় নেমে গেছি। পণ্ডিত হয়তো মরতে মরতে লোকটিকে বলেছিল, আমিই তাকে বিষ পান করিয়ে পালাচ্ছি। তুমি কোথায় যেতে চাচ্ছিলে? জিজ্ঞেস করল মায়ারাণী। কোথায় যাব কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি। আমার কোন বোধই তখন কাজ করছিল না।
পরে আমি বুঝেছি আমি আনমনে মুসলিম সেনাপতি যে দিকে থাকে সে দিকেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি বেশী দূর এগুতে পারলাম না। পিছনে অনেক লোকের দৌড়ানোর আওয়াজ পেয়ে আমি পথ বদল করে ফেললাম। আমি একটি গলিতে ঢুকে পড়লাম। কিন্তু গলিটির পথ এক জায়গায় গিয়ে শেষ হয়ে গেল। সামনে অগ্রসর হওয়ার মতো আর কোন পথই ছিল না, ফলে পিছু ধাওয়াকারীরা আমাকে গলির মাথায় ধরে ফেলল। এরা আমাকে ধরে মন্দিরে নিয়ে গেল। এর আগেই পণ্ডিত মরে গেছে। এর পরের ঘটনা তোমরা জানো, আমাকে কিভাবে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
সেই রাত শেষে ভোর বেলায় বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাকারীণী মহিলা দলের দলনেত্রীসহ অন্যান্য তরুণীদেরকে কাঠের বেষ্টণীতে ভরে উটের ওপর তুলে নগর ফটক পেরিয়ে আনা হলো। ওদের শহর থেকে নিরাপদে বের করে দিয়ে শহরময় প্রচার করা হলো কে বা কারা মন্দিরের প্রধান পণ্ডিতকে
বিষ পান করিয়ে হত্যা করেছে। আর সেই তরুণী শিমুকে চরম অমানবিক যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করল উজির। সেই দিন সকাল বেলায় গোয়েন্দা প্রধান বিন কাসিমের কক্ষে গিয়ে বললেন, খবর পেলাম, গত রাতে বড় মন্দিরের প্রধান পণ্ডিতকে অজ্ঞাত লোকে বিষ পানে হত্যা করেছে? গোয়েন্দা প্রধান তাকে আরো জানালেন, আমি নিজে মরদেহ দেখে এসেছি। মরদেহ ও তার মুখের লালা দেখে নিশ্চিত হয়েছি, তাকে বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হ্যাঁ তাকে বিষ পানেই হত্যা করা হতে পারে। আর আমি তোমাকে একথাও বলে দিতে পারি কে তাকে বিষ পান করিয়েছে? বললেন বিন কাসিম। আমি তোমাকে ডেকে পাঠাতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক সময়েই তুমি এসে গেছে। গতকাল আমার এখানে কিছু মেহমান এসেছিল। …বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে রাতের পূর্বাপর পুরো ঘটনা শোনালেন। শিমুর প্রতিটি কথা ও আচরণ সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। আমি তোমাকে বলবো বলে মনস্থ করেছিলাম, এসব মন্দির বন্ধ করে দিতে হবে। মন্দিরগুলো রাজা দাহিরের চক্রান্তকারীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পণ্ডিতকে সেই তরুণীই বিষ পান করিয়েছে, যে গতরাতে আমার কাছে এসেছিল।
বিন কাসিমের কথা শুনে দ্রুত সেখান থেকে উঠে গোয়েন্দা প্রধান মন্দিরের সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন। তিনি গভীর নিরীক্ষা করে দেখতে পেলেন পণ্ডিতের কক্ষে একটি পান পাত্রে তখনো কিছুটা পানীয় অবশিষ্ট রয়ে গেছে। এই অবশিষ্টটুকু আসলে শরাব ছিল পানি নয়। শা’বান ছাকাফী সেখানে অবস্থানরত সৈন্যদেরকে একটি লা ওয়ারিশ কুকুর ধরে আনতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা একটি কুকুর ধরে আনলো। কুকুরটিকে অবশিষ্ট পানীয় খাইয়ে দেয়া হলো। দেখতে দেখতে কুকুরটার মাথা কয়েকবার ঝাকুনী দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। অতঃপর গোয়েন্দা প্রধান যে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন তা ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে।
মন্দির থেকে সেনাপ্রধানের কাছে এসে গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী বললেন। সম্মানিত সেনাপতি। আমাদের ও আপনার চার পাশে যেসব বিপদ ও আশঙ্কা ভিড় জমেছে আপনি হয়তো এসবকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আপনি রণাঙ্গনে পারদর্শী বটে কিন্তু আমাদের শত্রুতা অদৃশ্য যেসব আক্রমণ আমাদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করছে এসব হয়তো পুরোপুরি আপনার
বোধগম্য নাও হতে পারে। আমি এখানে এমন কিছু বিপদাশঙ্কা করছি। যেগুলোর খুঁটিনাটি আপনার গোচরীভূত নাও হতে পারে। আমি আপনাকে পরিষ্কার বলে দিতে চাই, আজ থেকে সরাসরি আপনার সাথে কাউকে দেখা করতে দেয়া হবে না।
যুদ্ধ ছাড়াই নিরূন জয় করেছিলেন বিন কাসিম। নিরূন পর্যন্ত নৌকা করে মিনজানিকগুলো বহণ করা হয়েছিল। নিরূন অবরোধ করার সময়ও সব মিনজানিক সেখানে ব্যবহার করা হয়নি। মাত্র কয়েকটি মিনজানিক অবরোধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অধিকাংশই রয়ে গিয়েছিল নৌকায়। নৌকাগুলো ছিল সাকিরা নদীতে। আর সাকিরা নদী নিরূন থেকে কয়েক মাইল দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিন কাসিম জানতেন, নিরূনের শাসক সুন্দরী বিন কাসিমের মোকাবেলা করবেন না, তিনি প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। তিনি দৃঢ় আশাবাদী ছিলেন নিরূনে তাকে কোন আক্রোশের মুখোমুখি হতে হবে না। বাস্তবেও তাই ঘটল। যেহেতু নিরূন অঞ্চল বিন কাসিমের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল গুপ্ত হামলার সম্ভাবনা তেমন ছিল না সেই সাথে যেসব মিনজানিক নৌকায় রাখা ছিল সেগুলোর মধ্যে কোন হামলার আশঙ্কাও কম ছিল। এরপরও নদীর তীরে রাতের বেলায় পাহারা ও টহলের ব্যবস্থা রাখা হলো। নদীতে যারা মাছ ধরতো তাদের সবাইকে বলা হলো, তোমরা ক’দিন রাতের বেলায় মাছ ধরা বন্ধ রাখবে এবং নৌকাগুলো আমাদের কাছে জমা থাকবে।
