এখন তুমি চলে যেতে পারো? তবে যাবে কোথায়? বললেন বিন কাসিম। প্রধান মন্দিরে যাব। বলল শিমু। ঠিক আছে, আমি তোমার সাথে দু’জন প্রহরী পাঠাচ্ছি।
আমি একাকীই যাব। শিমু আর দেরী না করে বিন কাসিমের কক্ষ থেকে বেরিয়ে প্রধান মন্দিরের দিকে চলে গেল।
মৃত্যুর আগে আমি সব কিছু উগড়ে দেবো’ উজির বুদ্ধিমান ও মায়ারাণীর কাছে বিন কাসিমকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার বর্ণনা শেষে দৃঢ় কণ্ঠে বলল শিমু। শিমু আরো বলল, বিন কাসিমের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তিনি যখন আমাকে মুক্ত করে দিলেন, আমি সোজা প্রধান মন্দিরের দিকে রওয়ানা হলাম। তখন আমার মনে হচ্ছিল, আরব সেনাপতি আমার পিছু পিছু আসছেন। হয়তো বা তিনি শক্তিশালী যাদুকর। যাদুর সাহায্যেই আমার মিশন ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং আমার মনোভাব বদলে দিয়েছেন। আমি যাদুগ্রস্তের মতোই অবচেতন মনে মন্দিরে পৌছলাম। আসার পথে মনে হয়েছিল আংটির বিষ নিজের মুখে দিয়ে মৃত্যুবরণ করব কিন্তু মন্দিরে পৌছে পাথরের নিপ্রাণ মূর্তিগুলো দেখে আমার মন বিদ্রোহ করল। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম মূর্তিগুলোর কার্যকারিতা ব্যর্থ প্রমাণ করেই আমি মরবো।
একথা শুনে উজির বুদ্ধিমান খুব জোরে শিমুর গালে একটা চপেটাঘাত করল।
হতভাগী, তুই ওই স্নেচ্ছের প্রভাবে এতটাই মাতাল হয়েছিলে যে, মন্দিরে এসে দেবদেবীদের অমর্যাদা করতেও তোর বিবেকে বাধলো না। দাঁতে দাঁত পিষে বলল উজির। আমি ওর শরীরের একেকটি রগ কেটে কেটে ওকে হত্যা করবো, বলল মায়ারাণী। শয়তানীটা এই লুটেরা সেনাপতির বধূ সাজতে চেয়েছিল, তা না পেরে শেষতক দাসী হয়ে থাকতে চেয়েছিল।
অ্যাহ! রাজরাণী সাজার সখ হয়েছিল? বল, এরপর কি হলো? রাগে ক্ষোভে গজরাতে গজরাতে বলল উজির বুদ্ধিমান।
ওদের কথায় শিমুর হাসি পেলো। মুচকি হাসিটা আর চেপে রাখতে সক্ষম হলো না সে। খিক করে হেসে ফেলল। অতঃপর বলল, এরপর আমি মন্দিরে প্রবেশ করলাম। অন্যান্য তরুণিরা মন্দিরের মাতাল কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অন্যান্য পুরোহিতরা যার যার কক্ষে শুয়ে পড়েছিল। শুধু প্রধান পুরোহিত জাগ্রত ছিল। বুদ্ধিমান আবারো শিমুর মুখে একটা চপেটাঘাত করে বলল, বেতমিজ বল, পণ্ডিতজী মহারাজ। আমি যা একবার বলেছি শতবার বললেও তাই বলবো। আমার মন থেকে যার শ্রদ্ধা শেষ হয়ে গেছে, তার বেলায় সম্মানজনক ভাষা আমার মুখে আনা সম্ভব নয়। তার নাম আমি ঘৃণা ভরেই উচ্চারণ করব।
উজির! ও যা বলতে চায় বলতে দিন।
এই কুলাঙ্গীনী যা বকছিলে বকে যা। বলল মায়ারাণী। শিমু বলতে শুরু করল,
বড় পণ্ডিত আমার অপেক্ষায় তখনো জেগে ছিল। আমাকে দেখেই সে বলল, কাজ সেরে এসেছ? আমি বললাম করে এসেছি। পণ্ডিত আনন্দে জয়ধ্বনী দিলো এবং দুহাত আমার দিকে প্রসারিত করে এগিয়ে এসে আমাকে পাজাকোলা করে তার শয়ন কক্ষে নিয়ে গেল। তার মুখের লালার দুর্গন্ধ এখনো আমার মুখে লেগে রয়েছে। সে আমাকে বিছানার ওপর ফেলে পাগলা ষাড়ের মতো ঘুতাতে লাগল। পণ্ডিতের এই উন্মত্ততা দেখে আমার ইচ্ছা সম্পূর্ণ বদলে গেল। পুরুষের শয্যাসঙ্গী হওয়াটা আমার জীবনে আশ্চর্যজনক কিছু না। এই পণ্ডিতের কাছেও ইতোপূর্বে দু’বার আমি কাটিয়েছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মধ্যকার বোধ ও বিবেক সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। আমি আর আগেকার মতো পণ্ডিতের সান্নিধ্যকে পবিত্র মনে করতে পারছিলাম না। কারণ এমন এক যৌবনদীপ্ত সুঠাম যুবকের কাছে আমাকে পাঠানো হয়েছিল, যে কোন সুন্দরী নারীর সংস্পর্শে এলে এমন যুবকের পক্ষে নিজেকে সামলে রাখা মুশকিল কিন্তু শত চেষ্টা করা সত্ত্বেও আমি তার পৌরুষ নাড়াতে পারিনি। সে আমাকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও অস্পর্শ অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছে। অপরাধের আহবানকেও সে কঠিন অপরাধ মনে করে। আমি তাকে বিষপানে হত্যা করতে চেয়েছিলাম তা ধরতে পেরেও সে আমাকে কোন শাস্তি
দিয়ে সসম্মানে বিদায় করেদিল। আমি তাকে হত্যা করার কথা স্বীকার করার পরও সে আমাকে কোন শাস্তি না দিয়ে নিরাপদে আমার মন্দিরে পৌছার জন্য আমার সাথে দু’জন সিপাহী পাঠানোর প্রস্তাব করল। আর পণ্ডিত এমন এক ব্যক্তি দেবালয়েও অবৈধ নারী সম্ভোগে বিন্দুমাত্র পরওয়া করে না। যার অন্তরে মন্দিরের এতটুকু সম্মান নেই…।
আমি মনে মনে পণ করেছিলাম, মিশনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তোমরা হয়তো আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে, তাতে কি আমি নিজেই এই বিষপানে আত্মহত্যা করবো। কিন্তু হঠাৎ আমার ইচ্ছা বদলে গেল। পণ্ডিতের প্রতি আমার মনে প্রচণ্ড ঘৃণার উদ্রেক হলো। আমি অনেক কষ্টে একথা বলে বিছানা থেকে তার পাঞ্জা মুক্ত হলাম যে, আমি একটু পানি পান করবো। আপনিও পান করে নিন। সে আমার কথায় লাফিয়ে উঠে বলল, আরে আজ রাত কি শুধু পানি পান করার নাকি? সে লাফিয়ে উঠে তাক থেকে একটি সুরাহী ও দুটি পেয়ালা নামিয়ে এনে বললো, এটা পান করো, আমাকেও পান করাও।
আমি উভয় পানপাত্রে সুরাহী থেকে অল্প অল্প শরাব ঢেলে দিলাম এবং পণ্ডিতের দিকে পিঠ দিয়ে তাকে আড়াল করে খুব দ্রুত আংটির বিষ তার পানপাত্রে ঢেলে দিয়ে একটু নাড়িয়ে পণ্ডিতের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। সে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু শরাব নিঃশেষ করে ফেলল। অবশ্য তখনো আমার জানা ছিল না এই বিষ এতটা শক্তিশালী, এতো অল্প সময়ে…।
