তারা উভয়ই পালিয়ে গেছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আক্রমণের প্রচণ্ডতা তারা সহ্য করতে পারে না। এবং হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে পড়ার আগেই তারা লাপাত্তা হয়ে যায়। কুরাইশ সৈন্যদেরও হদিস পাওয়া যায় না। বারটি লাশ ফেলে তারা পালিয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত এই সংঘর্ষে হযরত যায়েশ বিন আশআর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত কুয বিন যাবির ফিহরী রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হন।
মুসলিম বাহিনীর তিনটি অংশ অনেক আগেই মক্কায় প্রবেশ করেছে। অথচ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীর এখনও পর্যন্ত কোন খবর নেই। সকলেই চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। মক্কার জনগণ কোনরূপ বাধার সৃষ্টি করেনি। তাহলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর বাহিনী কেন আসছে না? এমন জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে সেনাবাহিনীতে। সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশে এক লোককে পাঠানো হয়। সে ফিরে এসে জানায়, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দু’জন মুসলমানের লাশ নিয়ে আসছেন। তার বাহিনীর হাতে কুরাইশদের বারজন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ শুনে খুবই রাগান্বিত হন। তিনি ভাল করেই জানতেন যে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধ-প্রেমিক। তাই তিনি মনে করেন যে, কোনরূপ প্রতিরোধ ছাড়াই সে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে উভয় পক্ষের এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিনয়ের সাথে বলেন যে, ইকরামা ও সফওয়ানের সাথে কুরাইশদের কতক লোক ছিল। তারা উপর্যুপরি তীর ছুড়ে তাদের গতিরোধ করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরো জানান যে, তিনি তাদেরকে একবার সুযোগ দিয়েছিলেন কিন্তু তারা জবাবে আরেক ঝাঁক তীর বর্ষন করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করেন, ইকরামা এবং সফওয়ান কোথায়? হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তারা মক্কা রক্ষা করতে যুদ্ধের জন্য কোথায় যেন গিয়েছে। হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এ জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশ্বাস হয় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের সূচনা করে নি; বরং আত্মরক্ষার জন্য তাকে হাতিয়ার তুলে নিতে হয়।
মক্কার চুড়ান্ত পতন ঘটে। আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ মুসলমানদের পূর্ণ অধিকারে চলে আসে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ীর বেশে মক্কাতে প্রবেশ করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন হযরত উসামা বিন যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন প্রায় সাত বছর পূর্বে। দীর্ঘ সাতটি বছর পরে নয়ন ভরে মক্কার চতুর্দিক দেখেন। এলাকাবাসীর দিকে তাকান দরজায় দরজায় এবং ছাদে দাঁড়ানো নারী-শিশুর প্রতি দৃষ্টি দেন। এর মধ্যে অনেকে চেনা, পরিচিত মুখ ছিল। তিনি চারদিকে নজর বুলাতে বুলাতে সামনে অগ্রসর হন। দীর্ঘদিন পর স্বাধীনভাবে বাইতুল্লাতে প্রবেশ করেন। এবং সাত বার কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করেন। অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এ সময় মক্কার জনগণ ছিল নির্বাক। চোখে-মুখে ভরপুর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আজ তাদের বিরুদ্ধে কি হুকুম জারী হয় এই দুশ্চিন্তায় তাদের ঘুম হচ্ছিল না। যারা এতদিন মুসলমানদের নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে তাদের দুশ্চিন্তা ছিল তুঙ্গে। আজ সমগ্র মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাদুকর বলার দুঃসাহস কারো নেই।
কুরাইশরা হাতিয়ার সমর্পণের সাথে সাথে পরিণতি ভোগের জন্য খুবই আতঙ্কিত অবস্থায় ছিল। তখনকার আরবে অবমাননা এবং হত্যার শাস্তি বড় মর্মন্তুদ হত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও ঘোষণা করেছিলেন যে, যারা মুসলমানদের কিছু বলবে না তাদেরকে কিছু বলা হবে না; এরপরেও কুরাইশদের মধ্যে বিরাজ করছিল ভয়ানক আতঙ্ক।
“কুরাইশ জাতি!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতশীরে দণ্ডায়মান জনতার উদ্দেশে দাঁড়িয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করেন– “তোমরাই বল, আজ তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে।”
উপস্থিত সকলে সমস্বরে বলে তারা উত্তম আচরণ এবং ক্ষমার আশাবাদী।
স্ব স্ব ঘরে ফিরে যাও।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে বলেন– “তোমাদেরকে ক্ষমা করা হল।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের ঐতিহাসিক মুহূর্তের একটি হলো, বাইতুল্লায় সংরক্ষিত মূর্তিগুলোর প্রতি মনোযোগ প্রদান। পবিত্র কাবায় মোট ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। এর মধ্যে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম-এর প্রতিকৃতির ছিল একটি। এ মূর্তির হাতে ছিল তীর। মন্দিরের পুরুহিত এ তীরের মাধ্যমে শুভাশুভ নির্ণয় করত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে ছিল মোটা এবং মজবুত একটি লাঠি। তিনি এ লাঠি দ্বারা মূর্তিগুলো চূর্ণ করতে শুরু করেন। এ সময় তিনি হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর রীতি অনুসরণ করেন। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর মত তিনি মূর্তি ভাঙ্গার সময় যবানে বলতে থাকেন–“সত্য সমাগত মিথ্যা বিতারিত… মিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী।” ঐতিহাসিকগণ লেখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লাঠির প্রতিটি আঘাতে কা’বার চার দেয়াল থেকে যেন এই আওয়াজের প্রতিধ্বনি হচ্ছিল। কা’বার ভিতর থেকে মূর্তির ভগ্নাংশ উঠিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করা হয়। কা’বা চিরদিনের জন্য ইসলামী জগতের ইবাদাত খানায় পরিণত হয়।
