রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ গ্রুপের সাথে ছিলেন। এক গ্রুপের অধিনায়ক ছিলেন হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি গ্রুপের হযরত যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং চতুর্থ গ্রুপটির অধিনায়ক ছিলেন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু।
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই পরিকল্পনায় অসাধারণ বিচক্ষণতার প্রমাণ ছিল। চারটি রাস্তা দিয়ে মক্কার দিকে এগিয়ে যাবার মূল লক্ষ্য ছিল, মক্কা প্রতিরক্ষা বাহিনীকে চার অংশে বিক্ষিপ্ত করে দেয়া। যদি তারা মুসলমানদের অগ্রযাত্রা কোন এক বা দু’রাস্তায় প্রতিরোধ করে তাহলে অন্য গ্রুপ এগিয়ে গিয়ে শহরে ঢুকে পড়বে। এ পরিকল্পনার আরেকটি লাভ হলো, মক্কাবাসী যুদ্ধ না করলেও কোন রাস্তা দিয়ে পালাবার উপায় ছিল না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিকল্পনার সাথে সাথে এ নির্দেশও দেন যে, কুরাইশরা প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে না নিলে তাদের উপর আক্রমণ করা যাবে না। নিরাপত্তার জবাব নিরাপত্তার মাধ্যমেই দিতে হবে। কোথাও সংঘর্ষ হলে আহতদের হত্যা করা যাবে না; বরং তাদের চিকিৎসা করতে হবে। যারা বন্দি হবে তাদের উপর কঠোর হওয়া যাবে না, তাদের হত্যা করা যাবে না, তাদেরকে যুদ্ধবন্দিও মনে করা যাবে না। এমন কি তাদের কেউ পলায়ন করতে চাইলে সে সুযোগ দিতে হবে।
সার্বিক নির্দেশনা দেয়ার পর চার গ্রুপকে নির্ধারিত নিজ নিজ পথে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়।
♣♣♣
৮ম হিজরীর রমযানের ২০ তারিখ, ১২ ই জানুয়ারী ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ। মুসলিম বাহিনীর তিনটি গ্রুপ নিজ নিজ রাস্তা দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে। এ তিন পথে চলতে গিয়ে মুজাহিদদের প্রতি একটি তীরও বর্ষিত হয় না। শহরের প্রতিরক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। কুরাইশদের একটি তরবারিও খোলা ছিল না। জনগণ যার যার ঘরে অবস্থান করছিল। কোন ঘরের ছাদে নারী, শিশু দাড়িয়ে ছিল। মুসলিম বাহিনী ছিল সর্বোচ্চ সতর্ক। শহরের নীরবতা সন্দেহজনক ছিল। অবস্থা বলছিল, এ নীরবতা ঝড়ের পূর্বাভাস।
কিন্তু শহর থেকে কোন ঝড় ওঠে না। ঝড় তোলার মত লোক ছিল ইকরামা ও সফওয়ান। এ সময় তারা শহরে ছিল না। আরো কিছু লোক শহরের বাইরে ছিল। নিকটবর্তী কোথাও লুকিয়ে ছিল।
এ সমস্ত লোক রাতের অন্ধকারে শহরের বাইরে গিয়েছিল। তাদের সাথে তীরন্দাজও ছিল। তারা একটি ক্ষুদ্র বাহিনীতে পরিণত হয়। যে পথে খালিদ বাহিনীর মক্কা যাবার কথা ছিল এই ক্ষুদ্র দলটি সেই পথে এক পাহাড়ি স্থানে ওঁৎ পেতে বসে থাকে। ইকরামা এবং সফওয়ানের জানা ছিল না যে, এ পথে আসা মুসলিম দলটির কমান্ডার হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। কুরাইশদের একজন পাহাড়ের উঁচুতে উঠে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। সে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে চিনে ফেলে। লোকটি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখেই দৌড়ে নিচে নেমে আসে।
লোকটি পেরেশান হয়ে ছুটে এসে বলে– “সফওয়ান! তুমি অনুমতি দিলে তোমার স্ত্রীর ভাইকে হত্যা করতে পারি।… আমার চোখ ধোঁকা দিতে পারে না। আমি খালিদকে স্বচক্ষে দেখেছি।”
সফওয়ান বলে– “জাতির মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে আর কোন কিছুই আমার নিকট প্রিয় নয়। খালিদ যদি আমার ভগ্নিপতিও হত তবুও আজ আমি আমার বোনকে বিধবা করে দিতাম।”
কে কার ভাই এটা আজ দেখার সময় নয়। কে কার স্বামী, কে কার পিতা এ প্রশ্নও আজ অর্থহীন।” ইকরামা বলে– খালিদ যদিও আমার ভাই কিন্তু সে আজ আমার দুশমন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী আরো সামনে অগ্রসর হলে তাদের লক্ষ্যে তীরের প্রথম ঝাঁকটি উড়ে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের থামতে নির্দেশ দেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জোর কণ্ঠে বলেন–“কুরাইশ সম্প্রদায়। আমার পথ ছেড়ে দাও সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। আমাদের রাসূলের নির্দেশ আছে, কেউ হাতিয়ার না ধরলে তাকে কিছু না বলার।… নিজের জীবনটা তোমাদের নিকট প্রিয় না? আমি তোমাদের মাত্র একটি সুযোগ দিতে চাই।”
তীরের আরেকটি ঝাঁক উড়ে আসে।
“আমরা তোমার রাসূলের নির্দেশ মানতে বাধ্য নই খালিদ।” ইকরামা গর্ব করে বলে– “সাহস থাকলে আরো একটু এগিয়ে এস। আমরা তোমারই পুরাতন সাথি যোদ্ধা… সফওয়ান এবং ইকরামা…। তুমি জীবিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তীরের দ্বিতীয় ঝাঁক থেকে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অধীনস্থ বাহিনীকে কিছুটা পেছনে সরিয়ে আনেন এবং কিছু সৈন্যকে পাহাড়ের উপর দিয়ে সামনে এগিয়ে শত্রুর উপর হামলা করতে প্রেরণ করেন। ইকরামা এবং সফওয়ান হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক পাহাড়ের উপর দিয়ে প্রেরীত দলটি দেখতে পায় না।
শত্রুর অজান্তে এই দলটি তাদের ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে। নিচ থেকেও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দুর্বার হামলা চালান। এ হামলা এত তীব্র গতির ছিল যে, কুরাইশরা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উপর দিক থেকে আক্রমণ করান এবং নিচের দিক থেকেও। ফলে অতি সহজে এবং অতি দ্রুত কুরাইশরা পালাতে বাধ্য হয়।
২.৩ সফওয়ান কোথায়
“ইকরামা কোথায়?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চিৎকার করে ডাকতে থাকেন– “সফওয়ান কোথায়?”
