এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ব্যবস্থাপনার প্রতি মনোযোগ দেন। কুরাইশ ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গোত্রের লোকেরাও ইসলাম কবুল করতে আসতে থাকে।
মূর্তি কেবল কাবা ঘরেই ছিল না। মক্কার আশে-পাশে বহু এলাকার মন্দিরে ছিল। সেখানেও যথাযোগ্য মর্যাদায় মূর্তি ছিল এবং মানুষ এগুলোর পূঁজা করত। তৎকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য মূর্তি ছিল উযযা। কয়েক মাইল দূরে নাখলার এক মন্দিরে এ মূর্তিটি ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মূর্তি ভাঙ্গার দায়িত্ব হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কে দিয়েছিলেন। তিনি ৩০ জন অশ্বারোহী নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাত্রা করেন। এভাবে অন্যান্য স্থানের মূর্তি ধ্বংস করতে বিভিন্ন দল প্রেরণ করা হয়।
উযযা শুধু একাই ছিল না। সে গুরুত্বপূর্ণ দেবী হওয়াতে তার সাথে আরো অনেক ছোট ছোট দেবী ছিল। মন্দিরের সামনে পৌঁছলে পুরোহিত সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। মূর্তি না ভাঙ্গতে সে অনেক অনুনয়-বিনয় করে।
“উযযা প্রতিমাটি আমাকে দেখাও।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উম্মুক্ত তরবারি হাতে পুরোহিতকে নির্দেশ দেন।
পুরোহিত মৃত্যুর ভয়ে আর কোন কথা না বাড়িয়ে মন্দিরের একটি সুড়ঙ্গ দ্বার দিয়ে সামনে এগিয়ে চলে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিছু পিছু যান। একটি কক্ষ পার হয়ে আরেকটি কক্ষে যান। সেখানে একটি চত্বরে সুন্দর আকৃতির একটি দেবীমূর্তি ছিল। পুরোহিত প্রতিমার প্রতি ইশারা করে এবং নিজে প্রতিমার সামনে বিছানো কার্পেটে শুয়ে পড়ে। মন্দিরের দাসীরাও চলে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তরবারির আঘাতে সুন্দর মূর্তিটি ভেঙ্গে চুরমার করে দেন। এবং সাথিদেরকে মূর্তির ভগ্নাংশ বাইরে নিক্ষেপ করতে বলেন।
মূর্তি ভাঙ্গার কারণে পুরোহিত চিৎকার করে আর দাসীরা সুর তুলে কাঁদতে থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছোট ছোট দেবীগুলোও মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। এরপর তিনি পুরোহিতের প্রতি গর্জন করে বলেন– “এখন তুমি তাকে দেবী বলে বিশ্বাস কর, যে নিজেকে একজন মানুষের হাত হতে রক্ষা করতে পারে না?”
পুরোহিত হু হু করে কাঁদতেই থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিজয়ীর বেশে ঘোড়ায় চড়ে বসেন। অন্যান্য অশ্বারোহীদেরও প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ৩০ অশ্বারোহী নিয়ে মন্দির থেকে বেশ দূরে চলে গেলে ক্রন্দনরত পুরোহিত জোরে অট্টহাসি দিয়ে ওঠে। মন্দিরের দাসীরাও হাসতে থাকে।
“উযযাকে অবমাননা করার দুঃসাহস কারো নেই।” পুরোহিত বিজয়ের ভঙ্গিতে বলে– “এককালের উযযার পূজারী খালিদ এই ভেবে বড় প্রসন্ন যে, সে উযযার প্রতিমা গুড়িয়ে দিয়েছে।… উযযা জীবিত চিরকাল জীবিত থাকবে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খবর দিয়ে বলেন– “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি উযযা মূর্তি ধুলিস্যাত করে দিয়ে এসেছি।”
“কোথায় ছিল এই মূর্তি” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চান।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সে মন্দির এবং তার কক্ষের বর্ণনা দেন, যেখানে তিনি মূর্তিটি দেখেন এবং পরে গুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “তুমি উযযা মূর্তি ভাঙ্গতে পারনি খালিদ। পুনরায় যাও এবং আসল মূর্তি ভেঙ্গে আস।”
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী উযযার দু’টি মূর্তি ছিল। একটি আসল, মানুষ এটির পূঁজা করত। দ্বিতীয়টি ছিল নকল। সম্ভবত মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিতে এটি তৈরি করা হয়েছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর রক্ত টগবগ করে ওঠে। তিনি অশ্বারোহীদের নিয়ে আবার নাখলায় যান। মন্দিরের পুরোহিত দূর থেকে অশ্বারোহীদের দেখে মন্দিরের পাহারাদারদের ডেকে পাঠায়।
“তারা আবার আসছে।” পুরোহিত বলে– “হয়ত কেউ তাদেরকে বলে দিয়েছে যে, আসল মূর্তি মন্দিরে এখনও রয়ে গেছে। তোমরা উযযার মর্যাদা রক্ষা করবে না? এটা করলে উযযা দেবী তোমাদের ধন-সম্পদে ভরপুর করে দেবেন।
“গুরুজী! চিন্তা করে কথা বলুন।” এক নিরাপত্তাকর্মী বলে– “এত অশ্বারোহীর মোকাবিলা আমাদের মত দু’তিনজন দ্বারা করা সম্ভব?”
উযযা বাস্তবে দেবী হয়ে থাকলে অবশ্যই সে নিজেকে রক্ষা করে নিবে।” আরেক প্রহরী বলে। “দেব-দেবী মানুষের হেফাজত করে। মানুষ কখনও দেবতাদের হেফাজত করে না।
পুরোহিত তাদের উস্কে দিতে ব্যর্থ হয়ে বলে– “ঠিক আছে, উযযা নিজের হেফাজত নিজেই করবে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘোড়া কাছে এসে পড়ে। মন্দিরের নিরাপত্তাকর্মীরা পূজারীদের সাথে নিয়ে পালিয়ে যায়। পুরোহিতের বিশ্বাস ছিল, তার দেবী নিজেকে মুসলমানদের হাত থেকে অবশ্যই বাঁচাতে পারবে। এই ভেবে সে এক তরবারি নিয়ে উযযার গলায় ঝুলিয়ে দেয়। পুরোহিত নিজেও মন্দিরের পশ্চাৎ দ্বার দিয়ে সটকে পড়ে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মন্দিরে প্রবেশ করে কক্ষে কক্ষে উযযা মূর্তি খুঁজতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে একটি চমৎকার কক্ষের প্রতি তার চোখ আটকে যায়। তিনি কক্ষের অভ্যন্তরে উঁকি দিয়ে দেখেন। সামনের চত্বরেই উযযার প্রতিমা স্থাপিত ছিল। তার গলায় ঝুলছিল একটি তরবারি। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রথমবার যে মূর্তিটি ধ্বংস করেছিলেন এটি ছিল হুবহু তার মত। মূর্তিটির পায়ের কাছে দামী আগরবাতি জ্বলছিল। কক্ষের চাকচিক্য এবং মোহিতকর সৌরভ থেকে যে কেউ বুঝতে পারে যে, এটি একটি উপাসনালয়।
