তাহলে কি তুমি মুসলমানদের মোকাবিলা করতে চাও?” ফাখিতা স্বামীকে প্রশ্ন করে।
শত্রু দরজার সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরবে আর তোমার স্বামী ঘরের কোণে স্ত্রীর আঁচলের নিচে বসে থাকবে– এটা তুমি ভাবলে কি করে? আমার হাত কি ভেঙ্গে গেছে? আমার তরবারি কি দ্বিখণ্ডিত? ঐ লাশ দেখে তুমি গর্ব করবে না, যা তোমার ঘরের দরজায় জনগণ একথা বলে পৌঁছে দিয়ে যাবে যে, এই তোমার স্বামীর লাশ; দেশ ও জাতির জন্য বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে? না কি ঐ স্বামী তোমার অতি প্রিয়, যে তোমার আঁচলের নীচে লুকিয়ে থাকবে আর মানুষ তোমাকে ভর্ৎসনা করে বলবে, এ এক কাপুরুষ এবং আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তির স্ত্রী, যে স্বীয় বসতি এবং উপাসনালয় শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছে।… তুমি আমাকে কোন্ অবস্থায় দেখতে চাও?”
“তোমাকে নিয়ে চিরকাল গৌরব করি সফওয়ান।” ফাখিতা বলে, “মহিলারা আমাকে বলে তোমার স্বামী জাতির নয়ন তারা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তোমার পাশে এসে দাঁড়াবার লোক নেই বললেই চলে। শুনেছি মদীনাবাসীদের সংখ্যা অনেক। আমার ভাই খালিদও এখন তাদের দলে। সে কেমন বাহাদুর তা তুমি ভাল করেই জান।”
সফওয়ান বলে– “তোমার ভাইয়ের ভয় আমাকে দেখাচ্ছ ফাখিতা?”
“না, প্রিয়। ফাখিতা বলে– “তার সাক্ষাৎ পেলে তাকেও আমি ঐ কথাই বলতাম যা তোমাকে বলছি।…সে আমার ভাই। তোমার হাতে নিহত হতে পারে। তার হাতে তুমিও নিহত হতে পার। আর যাই কর, তোমরা একে অপরের মোকাবিলা করো না। আমি তার বোন আর তোমার স্ত্রী। তোমার লাশ হোক কিংবা খালিদের আমার জন্য উভয় শোক সমান হবে।”
“এ কথার মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই ফাখিতা!” সফওয়ান বলে– বিভেদের মাত্রা এত প্রকট যে, তা পিতা-পুত্র এবং ভাই-ভাইয়ের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছে। যদি আমি তোমার রক্তের সম্পর্কের প্রতি খেয়াল রাখি তাহলে…।”
“আমার রক্তের সম্পর্ক বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই।” ফাখিতা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে– “গোত্রের সর্দারের ইচ্ছা লড়াই না হোক। তিনি মুহাম্মাদের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার পক্ষপাতী। তাহলে তুমি কেন লড়াইয়ের ইচ্ছা ত্যাগ করছ না? তোমার পাশে খুব কম লোকই পাবে।”
সফওয়ান সিদ্ধান্তের ভঙ্গিতে জানায় “আমি আনুগত্য স্বীকার করব না।”
“তাহলে আমার এই কথাটি অন্তত রাখ যে, তুমি খালিদের সামনা-সামনি হবে না। আমার মা তাকে প্রসব করেছে। আমরা উভয়ই একই মায়ের দুধ পান করেছি। সে যেখানেই থাক, বোন এটাই শুনতে চায় যে, তার ভাই বেঁচে আছে।… আমি বিধবা হতে চাই না সফওয়ান!”
সফওয়ান তিরস্কার করে বলে– ভাইয়ের প্রতি এত মায়া থাকলে তাকে গিয়ে বল, সে যেন মক্কার ধারে কাছেও না আসে। সে আমার সামনে এলে আত্মীয়তার বন্ধন চিরদিনের জন্য ছিন্ন হয়ে যাবে।”
ফাখিতার নয়ন-জল সফওয়ানের ইচ্ছায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে কতক লোককে তিনি বিভিন্ন বেশে মক্কার চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের কাজ ছিল, মক্কা থেকে কেউ বেরিয়ে কোথায় যেতে দেখলে তাকে তৎক্ষণাৎ বন্দি করা। এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কুরাইশরা যেন তাদের মিত্রগোত্রকে সাহায্যের জন্য আহবান করতে না পারে।
দ্বিতীয় দিনই দুই উষ্ট্রারোহীকে বন্দি করে নিয়ে আসা হয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদেরকে সাধারণ মুসাফির মনে হচ্ছিল। তাদেরকে মুসলিম সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সামান্য হুমকিতেই তারা নিজেদের পরিচয় জানিয়ে দেয়। একজন ছিল ইহুদী আর অপরজন কুরাইশী। তারা মক্কা থেকে কয়েক মাইল দূরে বনূ বকরকে এটা জানাতে যাচ্ছিল যে, মুসলমানরা ‘মারকুজ্জাহরান’ নামক স্থানে এসে শিবিরে অবস্থান করেছে। গ্রেপ্তারকৃত দু’বন্দির মারফত বনু বকরের উদ্দেশে এ বার্তা পাঠানো হচ্ছিল যে, তারা যেন রাতের অন্ধকারে মুসলমানদের উপর গেরিলা আক্রমণ চালায় এবং এর জন্য আরো দু’এক গোত্রকে নিজেদের সাথে নিয়ে নেয়। বার্তায় একথা উল্লেখ ছিল যে, মুসলমানরা মক্কা ঘেরাও করলে তারা যেন অন্যান্য গোত্র সাথে নিয়ে পেছন দিক হতে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে।
ধৃত গোয়েন্দাদের নিকট জানতে চাওয়া হয়, মক্কায় যুদ্ধের প্রস্তুতি কেমন চলছে? জবাবে তারা বলে, আবু সুফিয়ান যুদ্ধের পক্ষে নয়। অধিকাংশ লোক তাকে সমর্থন করছে। ইকরামা এবং সফওয়ানই কেবল লড়তে চায়। তবে তাদের পক্ষে খুব কম লোক রয়েছে। তাদেরকে ইকরামা এবং সফওয়ান পাঠিয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাপতিসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে জানিয়ে দেন যে, মক্কাবাসী তাদের শহর রক্ষায় অস্ত্রধারণ করবে-এমন মানসিকতা নিয়েই আমাদের মক্কায় প্রবেশ করতে হবে। তিনি মোট সৈন্যদেরকে চারটি গ্রুপে ঢেলে সাজান। কেননা, তৎকালে মক্কা প্রবেশের রাস্তা ছিল চারটি। প্রতিটি রাস্তা পাহাড় অধ্যুষিত। প্রতি গ্রুপের জন্য একটি রাস্তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। মক্কা যাওয়ার আদেশ হলে এ রাস্তা দিয়েই তাদের যেতে হবে।
সৈন্যদেরকে চারটি গ্রুপে বিভক্ত করলেও একটি গ্রুপে সৈন্যসংখ্যা কিছু বেশি রাখা হয়। এ গ্রুপের কমান্ডিং থাকে হযরত আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে।
