হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চকণ্ঠে বলেন– “প্রিয় কুরাইশ জাতি। প্রথমে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন এরপর কোন কথা থাকলে বলবে। আমি তোমাদের নেতা। তোমাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা আমার পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।… মুহাম্মাদ এত বেশি সৈন্য নিয়ে এসেছে যে, তাদের মোকাবিলা করতে গেলে তোমরা নির্ঘাত ধ্বংস হয়ে যাবে। নারী ও দুর্বল শিশুদের রক্ষা কর। আসন্ন বাস্তবতা মেনে নাও। পালিয়ে যাবার পথও তোমাদের জন্য বন্ধ।”
‘সম্মানিত নেতা। আপনিই বলে দিন, এখন আমরা কি করব?” জনতার পক্ষ থেকে আওয়াজ আসে।
“মুহাম্মাদের আনুগত্য স্বীকার করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই।” হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
‘খোদার কসম! এরপরেও মুসলমানরা আমাদেরকে ক্ষমা করবে না।” জনগণের ভয়ার্ত আওয়াজ আবার শোনা যায়– “তারা নিহতদের প্রতিশোধ নিবে। তারা প্রথমেই আপনাকে হত্যা করবে। কারণ, উহুদে আপনার স্ত্রীই তাদের লাশের বিকৃতি ঘটিয়েছিল।
হিন্দা একাকী দাঁড়িয়ে কালনাগিনীর মত ফুঁসছিল।
“আমি তোমাদের সকলের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে এসেছি।”
হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“আমি মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছি। তিনি বলেছেন, যারা আমার ঘরে আশ্রয় নিবে তারা মুসলমানদের তলোয়ার থেকে নিরাপদ থাকবে।”
“মক্কার সকল মানুষের ঠাঁই আপনার ঘরে হবে? একজন প্রশ্ন করে।
হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন যে, যারা নিজ নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে অবস্থান করবে তারাও নিরাপদ। যারা কাবা ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিবে তাদেরকেও কিছু বলা হবে না। তারা শত্রু হিসেবে শুধু তাদেরকেই গণ্য করবে, যারা অস্ত্র নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে।” এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে আসেন এবং বলেন, “তোমাদের নিরাপত্তা এবং সম্মান তাতেই নিহিত যে, তোমরা তাদেরকে প্রিয় বন্ধু এবং সহোদরের মত অভ্যর্থনা জানাবে।
কুরাইশদের জনৈক সেনাপতি গর্জে উঠে বলে– “আবু সুফিয়ান! আমাদের হত্যাকারীদের অভ্যর্থনা আমরা তরবারি এবং বর্শা দ্বারা জানাব।”
“আমাদের তীর মক্কার অদূরেই তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে।” কুরাইশদের অপর অভিজ্ঞ সেনাপতি সফওয়ান বলে, “দেবতাদের কসম! দরজা বন্ধ করে আমরা ঘরে বসে বসে মাছি মারব না।”
হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “পরিস্থিতি বিবেচনা কর ইকরামা। বিচক্ষণতার সাথে কথা বল সফওয়ান। তারা তো আমাদেরই লোক। খালিদ তাদের সাথে যোগ দিলেও এটা তো এড়াতে পারবে না যে, তার বোন ফাখিতা তোমার স্ত্রী। তোমার স্ত্রীর ভাইকে তুমি কতল করতে পারবে? … তোমার মনে নেই যে, আমার মেয়ে উম্মে হাবীবা মুহাম্মাদের স্ত্রী? তুমি বিশ্বাস করতে চাইবে না যে, কুরাইশ জাতির ইজ্জত ও সম্মানের খাতিরে আমি মদীনা গেলে আমার ঔরসজাত সন্তানই আমার কথা শুনতে অস্বীকার করেছিল। আমি মুহাম্মাদের ঘরের খাটে বসতে গেলে উম্মে হাবীবা বিছানার চাদর টেনে ফেলেছিল।… পিতা কখনো মেয়ের দুশমন হতে পারে না সফওয়ান।”
ইকরামা, সফওয়ান এবং আরো দুই-তিনজন লোক ছাড়া উপস্থিত সকলেই নীরব ছিল। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, তাদের এই নীরবতাই বলে দিচ্ছিল যে, তারা হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু এর পরামর্শ গ্রহণ করে। এতে হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু এর চেহারাতে স্বস্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে। কিন্তু তার স্ত্রী হিন্দা এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে এবার ছোঁ মারতে দ্রুতগতিতে হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু এর দিকে এগিয়ে যায়। সবাইকে বিস্ময়ের ঘোরে ঠেলে দিয়ে সে সোজা গিয়ে হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কেশ জোরে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে।
“সকলের আগে তোকে হত্যা করব।” হিন্দা হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গোঁফ ধরে হেঁচকা টান দিয়ে বলে-কাপুরুষ বুড়ো কোথাকার! তুই আজ জাতির ইজ্জত মাটিতে মিশিয়ে দিলি?” এরপর সে আবু সুফিয়ান এর গোঁফ ছেড়ে দিয়ে তার মুখে জোরে থাপ্পড় কষে জনতাকে বলে– “তোমরা এই বুড়োকে হত্যা করছ না কেন, যে মুসলমানদের হাতে তোমাদের লাঞ্ছনা-অবমাননার কথা বলছে?”
ইবনে সা’দ লিখেন, হিন্দা তার স্বামীর সাথে এমন অপমানজনক আচরণ করায় জনতার মাঝে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু জ্যান্ত মূর্তি হয়ে যান। ইকরামা এবং সফওয়ান তাদের মাঝখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
“আমরা যুদ্ধ করব হিন্দা।” সফওয়ান বলে – তাকে ছেড়ে দাও। মুহাম্মাদের জাদুতে সে আক্রান্ত।”
দুপুরের আগে আগে কুরাইশ জাতি দু’শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অধিকাংশ ছিল লড়াই না করার পক্ষে। বাদ বাকীরা ইকরামা, সফওয়ান ও হিন্দার পক্ষ অবলম্বন করে।
সন্ধ্যার পর সফওয়ান ঘরে ফেরে। তার স্ত্রী ফাখিতা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বোন, সেও হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথা শুনছিল।
“তুমি গোত্রপতির প্রধানের বিরুদ্ধাচরণ করেছ বলে যে খবর শুনছি তা কি সত্য?” ফাখিতা স্বামী সফওয়ানকে জিজ্ঞেস করে।
“তার আনুগত্য করলে পুরো জাতির ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায়।” সফওয়ান বলে, “গোত্রপতি কাপুরুষ হলেও গোত্রের কাপুরুষ হওয়া উচিত নয়। সে গোত্রের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিলেও তারা কখনও গোত্রের বন্ধু হতে পারে না।”
