রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেন– “আবু সুফিয়ান! তুমি জান আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই; তিনিই একমাত্র মা’বুদ এবং তিনিই সকলের সাহায্যকারী?”
আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, এতদিন যে সমস্ত মূর্তির পূঁজা করতাম তারা প্রতিমা ছাড়া আর কিছুই নয়।” আবু সুফিয়ান বলে– “তারা আমাকে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না।”
তাহলে কেন তুমি স্বীকৃতি দিচ্ছ না যে, আমি ঐ আল্লাহর রাসূল, যিনি একমাত্র মাবুদ?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন।
“আমার দ্বারা হয়ত এটা স্বীকৃত দেয়া সম্ভব হবে না যে, তুমি আল্লাহর রাসূল।” আবু সুফিয়ান অপারগতার সুরে বলে।
হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্রোধকম্পিত কণ্ঠে বলেন– “আবু সুফিয়ান! তুমি আমার তরবারিতে তোমার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাও?” এরপর হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেন– “হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান একটি জাতির সরদার সে প্রভাবশালী এবং সম্ভ্রান্তও বটে সে স্বেচ্ছায় এসেছে।”
হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথায় আবু সুফিয়ানের মধ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তার জবান থেকে সহসা বেরিয়ে যায়– “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল!… আমি স্বীকৃতি দিলাম আমি মেনে নিলাম।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন– “যাও। মক্কায় গিয়ে ঘোষণা করে দাও যে, যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে তারা মুসলমানদের তরবারি থেকে নিরাপদ থাকবে। যারা বাইতুল্লায় প্রবেশ করবে তারাও নিরাপদ। এমনকি যারা নিজ নিজ ঘরে দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে তারাও নিরাপদ।”
“হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে মক্কায় রওনা হয়ে যান। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-কে নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল, আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করলেও ইকরামা এবং সফওয়ানের মত প্রখ্যাত সেনাপতি এখনও মক্কায় রয়েছে। তারা কি যুদ্ধ ছাড়া মক্কার পতন মেনে নিবে? সাহাবায়ে কেরাম নির্ধারিত এ বিষয়ে স্বাধীন মতামত ও বিজ্ঞ পরামর্শ পেশ করতে থাকেন।
উট বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে আসছিল। মক্কার কাছাকাছি পৌঁছলে উষ্ট্রারোহী চিৎকার করে বলতে থাকে– “উযযা এবং হুবলের কসম! মদীনার বাহিনী ‘মাররুজ্জাহরায় ছাউনী ফেলেছে। আমাদের নেতাকে আমি সেখানে যেতে দেখেছি।… কুরাইশরা! সাবধান! মুহাম্মাদের সৈন্যরা আসছে।” সে উট বসিয়ে তার পিঠ থেকে নামার পরিবর্তে লাফ দিয়ে নিচে অবতরণ করে।
যেই এ আওয়াজ শুনে সেই দৌড়ে আসতে থাকে। সে কারো দিকে না তাকিয়ে ভয়ার্ত ভাবে বলে যাচ্ছিল, মদীনার সৈন্য মাররুজ্জাহরান পর্যন্ত চলে এসেছে। আবু সুফিয়ানকে সেদিকে যেতে দেখেছি। মক্কার জনগণ তার চারপাশে জড়ো হতে থাকে।
এক প্রবীণ লোক তাকে বলে– “আবু হাসান। হয়ত তোমার মাথা ঠিক নেই নতুবা তুমি মিথ্যা কথা বলছ।”
“আমার কথা মিথ্যা মনে করলে অচিরেই এর পরিণতি দেখতে পাবে।” উষ্ট্রারোহী আবু হাসান বলে– “কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখ, আমাদের নেতা সেদিকে যাওয়ার কারণ কী? সে একথা বলে আবার জোরে জোরে বলতে থাকে, “কুরাইশরা। মুসলমানরা ভাল নিয়তে আসেনি।”
আবু হাসানের চিৎকার এ গলি-ও গলি অতিক্রম করে এক সময় আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী হিন্দার কানে গিয়ে পৌঁছে। সে জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জ্বলে উঠে বাইরে বের হয়ে আসে। আবু হাসানকে ঘিরে রাখা জনতার সারি ভেদ করতে করতে সে আবু হাসানের কাছে আসে।
হিন্দা আবু হাসানের জামার কলার ধরে বলে– “আবু হাসান। আমার তরবারি মুহাম্মাদের রক্ত পান করতে উদগ্রীব। তুই কেন নিজের গর্দান আমার তরবারিতে কাটাতে এলি? তুই জানিস না যার উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস সে আমার স্বামী এবং কুরাইশ জাতির নেতা?”
আবু হাসান বলে– “আপনার তরবারি ঘর থেকে নিয়ে আসুন। কিন্তু আপনার স্বামী এলে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, সে কোথা থেকে এসেছে।
হিন্দা জিজ্ঞাসা করে–“মুহাম্মাদ সৈন্য নিয়ে এসেছে, একথাই তুই বলছিস?”
আবু হাসান বলে– “খোদার কসম! আমি নিজ চোখে যা দেখেছি মুখে তা বলছি।”
হিন্দা বলে– “তোর কথা সত্য হলে মুসলমানরা মৃত্যু সাথে করেই এনেছে।”
এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আসতে দেখা যায়।
♣♣♣
মক্কার জনগণ এখন এক ময়দানে দাঁড়ানো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভিযানের খবর আর গোপন থাকে না। কিন্তু এখন জানলেও কোন অসুবিধা নেই। বড় জোড় তারা নিজেরা প্রস্তুতি নিতে পারত। সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকার পথ ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ।
হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু আসছিলেন। নেতার আগমনে জনতার আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। হিন্দা জনতাকে ডানে-বামে ধাক্কা দিতে দিতে আগে চলে যায়। তার চেহারা ছিল বিস্ফোরণোন্মুখ। তার চোখ থেকে আগুন ঠিকরে পড়ছিল। হযরত আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু জনতার মাঝে এসে ঘোড়া থামান। স্ত্রী হিন্দাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত ছুটে আসতে দেখেও তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেন না।
