হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিজনদের নিয়ে মদীনা যাচ্ছিলেন। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
“কি আব্বাস!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “মক্কায় মহাপ্রলয় হতে যাচ্ছে বলেই কি তুমি মক্কা থেকে পালিয়ে যাচ্ছ?”
“খোদার কসম! এ ব্যাপারে মক্কাবাসীদের কোন খবরই নেই যে, মুহাম্মাদের বাহিনী তাদের মাথার উপর খাড়া।” হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “আমি তোমার আনুগত্য মেনে নেয়ার উদ্দেশ্যে মদীনায় যাচ্ছিলাম।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ভুল ভেঙ্গে দিয়ে বলেন– “আমার না আব্বাস! আনুগত্য ঐ সত্তার কর, যিনি এক এবং যার কোন অংশীদার নেই। তিনিই একমাত্র ইবাদাতের উপযুক্ত। আমি তাঁর প্রেরিত নবী মাত্র।
হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বুকে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হন যে, মক্কাবাসী নিশ্চিন্তে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, কুরাইশরা তো আমাদেরই রক্ত। দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর পদতলে কুরাইশদের নারী এবং শিশুরাও পিষ্ট হয়ে যাবে। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরো জানান যে, কুরাইশদের বর্তমান মানসিকতা পূর্বের মত নেই। তাদের মাঝে ইসলাম গ্রহণের এক ঢেউ জেগেছে। তাদেরকে ইসলাম কবুলের একটি শেষ সুযোগ দিলে হয় না?”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে বলেন, তাহলে তুমি নিজেই মক্কা যাও এবং আবু সুফিয়ানকে গিয়ে জানাও যে, মুসলমানরা মক্কা দখল করতে আসছে। মক্কাবাসী বাধা দিলে একজনকেও জ্যান্ত ছাড়া হবে না। বিনা রক্তপাতেই সে যেন মক্কা নগরী মুসলমানদের হাতে দিয়ে দেয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মক্কা যেতে কেবল অনুমতিই দেন না; তাকে নিজের খচ্চরটিও বাহন হিসেবে দিয়ে দেন।
আবু সুফিয়ান মদীনা থেকে বড় উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া নিয়ে মক্কায় গিয়েছিল। সে ছিল যথেষ্ট অভিজ্ঞ। মুসলমানদের বীরত্ব এবং দৃঢ়তা সম্পর্কেও সে ভাল করে জানত। সে সর্বক্ষণ আশঙ্কা করত যে, এই বুঝি মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করল। স্ত্রী হিন্দা, সেনাপতি ইকরামা ও সফওয়ান তার সাহস বাড়াতে চেষ্টা করত কিন্তু এবং জাতির ধ্বংসই কেবল তার চোখে ভাসতে থাকে। তার দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না।
একদিন সে এত বিচলিত হয়ে পড়ে যে, সহ্য করতে না পেরে ঘোড়ায় চড়ে মক্কার বাইরে চলে আসে। তার মন বারবার বলছিল যে, অচিরেই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এই চিন্তা তাকে আতঙ্কের আরো গভীরে নিক্ষেপ করে। সে মনকে এই বলে সান্ত্বনা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যে, এই মুহূর্তে একমাত্র ঘটার যা আছে তা হলো মুসলমানরা মক্কা দখল করতে আসবে। এই ধারণা তার মনে এমন ঝড় তোলে যে, সে মদীনার পথে একাকী এটা দেখতে বেরিয়ে পড়ে যে, মদীনা বাহিনী এসে তো পড়েনি? বাতাসেও এক ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস তার কাছে প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। যতই সে এগিয়ে যায় এ বাতাস ততই ভারী মনে হতে থাকে।
এহেন গভীর এলোপাথাড়ি চিন্তার মধ্য দিয়ে তার ঘোড়া তাকে কয়েক মাইল দূরে নিয়ে আসে। বহু দূরের একটি দৃশ্য দেখে তার চিন্তায় ছেদ পড়ে। খচ্চরের পিঠে চেপে হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আসতে দেখে সে। আবু সুফিয়ান বিস্মিত হয়ে অশ্ব থামায়। তার চোখে হাজার প্রশ্ন। চেহারায় উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
আবু সুফিয়ান দূর থেকেই প্রশ্ন করে– “আব্বাস! তুমি পুরো পরিবার নিয়ে গিয়েছিলে না? তাহলে আবার একা ফিরে এলে কেন?”
“আমার পরিবার নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।” হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “পদাতিক, অশ্বারোহী এবং উষ্ট্রারোহী মিলে দশ হাজারের এক বিশাল বাহিনী মক্কার এত নিকটে এসে গেছে যে, তাদের নিক্ষিপ্ত তীর মক্কার যে কোন দরজা নিশানা করতে পারে। এ বিশাল বাহিনীর আক্রোশ থেকে মক্কা রক্ষা করা তোমার পক্ষে কি সম্ভব? সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকার সুযোগ আছে? সন্ধিচুক্তি তোমার সেনাপতি ভঙ্গ করেছে। মুহাম্মাদকে আমি আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকৃতি দিয়েছি। তারা সর্বপ্রথম তোমাকে হত্যা করবে। তুমি আমার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলে একটা রক্ষা পেতে পার।”
“খোদার কসম! আমি জানতাম, এমন একটা মুহূর্ত অবশ্যই আসবে।” আবু সুফিয়ান বলে– “চল, আমি তোমার সাথে যাচ্ছি।”
সন্ধ্যার পর হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে নিয়ে মুসলিম সেনা ক্যাম্পে প্রবেশ করে। এ সময় হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রহরীদের সাবধানতা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলেন। তিনি আবু সুফিয়ানকে দেখে অগ্নিগোলা হয়ে উঠেন এবং বলেন, আল্লাহর দ্বীনের এই দুশমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ব্যতীরেকে আমাদের ক্যাম্পে প্রবেশ করেছে। হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে কতল করার অনুমতি চাইতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁবুর দিকে দ্রুত যান। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুও তখন সেখানে গিয়ে পৌঁছান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যার অনুমতি না দিয়ে আবু সুফিয়ানকে সকালে আসতে বলেন। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে রাতে নিজের সাথে রাখেন।
