“এমনটি হবে না উবায়েদ।” যারিয়া আবেগের আতিশয্যে উবায়েদের মাথা নিজের বক্ষে টেনে নিয়ে বলে– “যা ভেবেছ তা কস্মিন কালেও হবে না। তারা ওঁৎ পেতে বসে থাকবে। আজ রাতের শেষ প্রহর কিংবা আগামী কাল প্রত্যুষে আবু সুফিয়ানের নিকট এ বার্তা পৌঁছে যাবে যে, তোমাদের অগোচরে মুসলমানরা তোমাদের ধ্বংস করতে আসছে।… তুমি যেয়ো না উবায়েদ। কুরাইশ এবং তাদের মিত্ররা সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকবে।”
‘একি বলছ যারিয়া!” উবায়েদ বিদ্যুতের শক খাওয়ার মত তার বক্ষ থেকে মাথা উঠিয়ে জিজ্ঞাসা করে– “আবু সুফিয়ানের নিকট কে বার্তা পাঠিয়েছে?”
“এক ইহুদী।” যারিয়া সব কিছু ফাঁস করে দেয়– “আর বার্তা বয়ে নিয়ে গেছে আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী।… এখন আমার ভালবাসার গভীরতা অনুমান কর উবায়েদ। যে তথ্য ফাঁস করার কথা ছিল না, তা আমি তোমাকে জানিয়ে দিলাম। এর একমাত্র উদ্দেশ্য, যেন কোন বাহানায় তুমি থেকে যাও। কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মুসলমানদের এমন মার দিবে যে, একান্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই শুধু জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে।”
উবায়েদ যারিয়ার নিকট হতে জেনে নেয় যে, তার ভাবী কিভাবে এবং কখন রওনা হয়েছে। উবায়েদ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং যারিয়ার আন্তরিক ভালবাসা উপেক্ষা করে মদীনা পানে ছুটে চলে। পেছন দিক থেকে যারিয়ার এই আহবান তার কর্ণকুহরে বেজে উঠে বারবার “উবায়েদ।… দাঁড়াও উবায়েদ।” অতঃপর একসময় উবায়েদ যারিয়ার দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
♣♣♣
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সবিস্তারে জানানো হয় যে, এক মহিলা দ্রুতগামী উটনীতে চড়ে আবু সুফিয়ানের বরাবর একটি পত্র চুলের বেণীতে করে লুকিয়ে নিয়ে গেছে। মহিলাটি এখন সম্ভবত রাস্তাই আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে ঐ মহিলা এবং তার উটনীর নমুনা সম্পর্কে বলে দিয়ে ঐ মহিলাকে পথেই গ্রেপ্তার করতে প্রেরণ করেন।
হযরত আলী এবং হযরত জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আরবের উন্নত জাতের তেজি ঘোড়া ছিল। তারা তখনই প্রস্তুত হয়ে মক্কা অভিমুখে উল্কা বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দেন। এ সময় সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। মদীনা থেকে তারা অনেক দূরে চলে যাওয়ার পর সূর্য পুরোপুরি ডুবে যায়। আঁধারের পর্দা ভেদ করে তারা এগিয়ে চলে মহিলাকে গ্রেফতার এবং পত্র উদ্ধারের উদ্দেশে।
পরের দিন পূর্বাকাশে সূর্য উদয়ের সাথে সাথে তারাও মদীনায় এসে উপস্থিত হন। তাদের দু’অশ্বের সাথে একটি উটনী রয়েছে। উটনীর পিঠে বসা ছিল এক মহিলা। কয়েকজন লোক ঐ মহিলাকে দেখেই চিনতে পারে। মহিলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে হাজির করা হয়। তার চুলের বেণীতে লুক্কায়িত পত্রটিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে হস্তান্তর করা হয়। পত্র পাঠ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা রক্তিম হয়ে যায়। পত্রের বিবরণ ছিল অত্যন্ত ভয়ানক। মহিলা নিজের অপরাধ স্বীকার করে এবং এর মূল হোতা যে ইহুদী তার নামও বলে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে ঐ মহিলাকে হত্যার নির্দেশ দেন। কিন্তু ঐ ইহুদী বিপদের আভাস পেয়ে পূর্বেই সটকে পড়ে। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ পত্র মক্কায় পৌঁছলে মুসলমানদের পরিণাম হত অত্যন্ত ভয়াবহ। মক্কা অভিযানের নেতৃত্ব দেন স্বয়ং আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাত্রার নির্দেশ দেন।
এ অভিযানে অংশগ্রহণ করে দশ হাজার পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য। এ বাহিনীতে মদীনার পার্শ্ববর্তী বসতির নও মুসলিমরাও ছিল। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, মুসলিম বাহিনী পথ অতিক্রমকালে আরো দুতিন গোত্র তাদের সাথে যোগ দেয়। প্রায় সকল মুসলিম-অমুসলিম ঐতিহাসিকের মন্তব্য হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনীর চলার গতিতে ছিল অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা এবং এ যুদ্ধাভিযানে সৈন্যসংখ্যা ছিল দশ হাজার।
মুসলিম বাহিনী মক্কার উত্তর-পশ্চিমে ‘মাররুজ্জাহরান’ নামক উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছে। এটা ছিল মক্কা থেকে আনুমানিক দশ মাইল দূরে। এই উপত্যকার একাংশের নাম ফাতেমা উপত্যকা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আন্তরিক ইচ্ছা অত্যন্ত সফলতার সাথে পূরণ হয়। তিনি চেয়েছিলেন, মক্কাবাসীদের ঘুমে রেখে তাদের ঘাড়ে চেপে বসবেন। মক্কার এত কাছে পৌঁছার পরও মক্কাবাসীদের কোন খবর ছিল না। এখন জানলেও কোন সমস্যা নেই। কারণ, কুরাইশদের পক্ষে এখন পার্শবর্তী গোত্রকে সাহায্যের আহ্বানের কোন সুযোগ ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অবস্থা এবং জনগণের গতিবিধি জানতে বিভিন্ন বেশে কয়েকজন লোক মক্কার আশেপাশে পাঠিয়ে দেন।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মদীনাবাহিনী আবার চলতে থাকে। যু’ফা নামক স্থানে এসে মক্কার দিক হতে একটি কাফেলাকে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। কাফেলাকে আরো নিকটে আসার সুযোগ দেয়া হয়। নিকটে এলে দেখা যায় তারা আর কেউ নয়; খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা ও তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ।
