বৃদ্ধ নিজের অপারগতা তুলে ধরে বলে– “মক্কা অনেক দূরের পথ। ঘোড়া বা উটে চড়ে এত দীর্ঘ সফর করা সম্ভব নয়। আর করলেও মুসলমানদের আগে মক্কায় পৌঁছতে পারব বলে মনে হয় না। গুরুত্বপূর্ণ এ কাজ কোন শিশু বা মহিলা দ্বারাও অসম্ভব। আমার পুত্র ছিল; কিন্তু সে অসুস্থ।”
“আমার দেয়া পুরস্কারের দিকে একবার তাকাও”-আগন্তুক বলে, “এ কাজটি করে দিতে পারলে পুরস্কার ছাড়াও আমরা তোমাকে আমাদের মাজহাবের অন্তর্গত করে আমাদের নিরাপত্তায় নিয়ে নিব।”
আধা বয়স্কা মহিলা বলে– “আমাকে এ কাজের ভার দেয়া যেতে পারে? তোমরা আমার উটনী দেখতে পাওনি? উটনীর পিঠে তোমরা কখনও আমাকে দেখনি? এত দ্রুতগামী উটনী মদীনায় কারো নেই।”
ইহুদী বলে– “তুমিই পার একাজটি করতে। উট এবং বকরীর পাল বাইরে নিয়ে যাবে। কেউ তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে না। এমন ভাব দেখাবে যে, তুমি প্রতিদিন এ সমস্ত পশু চরাতে নিয়ে যাও। আজও সেই নিয়ম অনুযায়ী নিয়ে যাচ্ছ। পশু চরাতে চরাতে মদীনা থেকে কিছু দূর গিয়ে তোমার উটনীর উপর চেপে বসবে।
ইহুদী একটি চিরকুট মহিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে– “চিরকুটটি চুলের বেনীর ভিতর লুকিয়ে ফেল। উটনী দ্রুত হাঁকিয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে এই চিরকুটটি তাকে হস্তান্তর করবে।
চিরকুটটি নিয়ে মহিলা বলে যাবতীয় পুরস্কার আমার অপর হাতে তুলে দাও এবং এই নিশ্চয়তায় আমার ঘর থেকে বের হও যে, মুসলমানরা যখন মক্কা থেকে ফিরবে তখন তাদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে। তাদের মস্তক থাকবে অবনত এবং সকলের কপালে থাকবে পরাজয়ের কলংক।
ইহুদী তিন টুকরা স্বর্ণ মহিলার হাতে তুলে দিয়ে বলে– “এটা ঐ পুরস্কারের অর্ধেক চিরকুটটি আবু সুফিয়ানকে দিয়ে ফিরে এলে যা আমি তোমাকে দিব।”
“আমি কাজ সম্পন্ন করে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে না পারলে কি হবে?” মহিলা জিজ্ঞাসা করে।
“অবশিষ্ট পুরস্কার তোমার অসুস্থ স্বামী পাবে।”
পত্রবাহক মহিলা উট-বকরী চরাতে মাঠের দিকে যায়। সে পশুগুলো হাঁকাতে হাঁকাতে নিয়ে যাচ্ছিল। কেউ এদিকে খেয়াল করে না যে, অন্যান্য উটের পিঠ শূন্য থাকলেও একটি উটনীর পিঠ আরোহণের জন্য তৈরী ছিল। উটনীর পিঠে পানির মশক এবং খাদ্যভর্তি একটি থলেও ছিল। মহিলা পশুপাল শহর থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ সময়ের পর ইহুদী গৃহে অবস্থানরত অপর তরুণীকে বলে– “সে বোধহয় চলে গেছে। তুমি গিয়ে পশু গুলো গৃহে নিয়ে আস।”
তরুণী হাতে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু সে শহরের বাইরে যাবার পরিবর্তে শহরের ভিতর যায়। কাউকে খোঁজ করার মত সে এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে যাচ্ছিল। সে একটি গলি দিয়ে যেতে যেতে একটি খালি মাঠে এসে দাঁড়ায়। ময়দানে মুসলমানরা ঢাল-তলোয়ার নিয়ে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। ময়দানের অপর প্রান্তে উট দৌড়ের কসরত চলছিল। দর্শকদের প্রচণ্ড ভীর ছিল।
তরুণী দর্শকদের চারপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে। সে কাউকে খুঁজছিল। তরুণীর এই অস্বাভাবিক আচরণ অপর এক তরুণের নজরে পড়ে। সে দ্রুত পায়ে তার পিছু নেয় এবং নিকটে গিয়ে চাপা গলায় ডাক দেয়– “যারিয়া।” তরুণী চমকে উঠে তাকায় এবং তার চেহারা থেকে পেরেশানীর ছাপ মুহুর্তে চলে যায়।
“সেখানে যাও কথা আছে।” তরুণী ঝটপট বলে দ্রুত সামনের দিকে যেতে থাকে।
‘সেখানে’র দ্বারা চারণভূমির প্রতি ইঙ্গিত ছিল। তরুণ পূর্ব হতে এ ইঙ্গিত সম্পর্কে জানা থাকায় কথা না বাড়িয়ে পূর্বের জায়গায় ফিরে আসে এবং মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে।
যারিয়ার ঐ ইঙ্গিতকৃত স্থানে যেতে অনেক সময় লেগে যায় যেখানে পত্রবাহক মহিলা পশু চরাতে নিয়ে যেত। যারিয়া উট-বকরী নির্দিষ্ট চারণভূমিতেই দেখতে পায়। তবে ছিল না সেখানে পত্রবাহক মহিলা আর তার উটনী। যারিয়া চারণভূমির পাশে গিয়ে এমন নাটকীয় ভঙ্গিতে বসে যে সে এখানে বকরী চরাতেই এসেছে। তরুণী স্থির হয়ে বসে না। বারবার দাঁড়িয়ে শহরের দিকে চায়। তাকে উদ্দেশ্য করে কেউ আসতে সে দেখতে পায় না। সে আবার উদ্বিগ্ন হয়। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য অস্ত যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তাকে আসতে দেখা যায়। যারিয়া তাকে আসতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বসে যায়।
“উহ্ উবায়েদ।” যারিয়া তাকে কাছে টেনে বসাতে বসাতে বলে– “তুমি বেশ দেরী করে ফেলেছ আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলাম।”
‘আমি তোমাকে উদ্বেগের দাওয়াই বলে দিইনি?” উবায়েদ বলে– “আমার ধর্ম গ্রহণ করলে তোমার যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে। ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করতে পারি না। চিন্তা করে বলতো, এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে আর কতদিন আমাদের সাক্ষাৎ হতে পারে।”
যারিয়া বলে– “আমার ভালবাসা ধর্মের অধীন নয়। আমি তোমার সত্তার পূঁজা করি। স্বপ্নেও তোমার দেখা পাই। কিন্তু আজ আমার অন্তরে জগদ্দল পাথর এসে পড়েছে।”
উবায়েদ উৎসুক হয়ে জানতে চায়– “কেমন করে?”
মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছে।” যারিয়া বলে– তুমি যেয়ো না উবায়েদ। তোমার ধর্মের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করি তুমি যেয়ো না।… ঘটনাক্রমে এমন না হয়…।”
মক্কাবাসীদের দেহে এখন আর এমন শক্তি নেই যে, তারা আমাদেরকে মোকাবিলা করবে।” উবায়েদ বলে– কিন্তু যারিয়া। তাদের মধ্যে শক্তি থাক আর না থাক আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলেন তাহলে আমি সে নির্দেশও যথাযথ পালন করব।… অন্তরে ব্যথা নিওনা যারিয়া। আমাদের এই আক্রমণ এমন গোপনীয় হবে যে, মক্কাবাসী আক্রমণ সম্পর্কে তখন জানতে পারবে যখন আমাদের তরবারি তাদের মস্তকের উপর ঝিলিক দিয়ে উঠবে।
