ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ানের দিকে ফিরেও তাকান না এবং তার সাথে কোন কথাও বলেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নীরবতা আবু সুফিয়ানের মধ্যে খুব আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সে ভয়ে সেখানে বেশিক্ষণ বসার সাহস পায় না। নীরবে উঠে এসে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে দেখা করে।
“মুহাম্মাদ আমার কোন কথাই শুনতে আগ্রহী নয়।” আবু সুফিয়ান আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে গিয়ে বলে– “আবু বকর! তোমরা তো আমাদেরই গোত্রের লোক। খোদার কসম! আমরা বাড়ীতে আগত মেহমানের সাথে এমন আচরণ করি না যে, সে কি বলতে এসেছে তাও শুনি না। আমি বন্ধুত্বের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। আমি যুদ্ধ-বিগ্রহ বর্জনের চুক্তি করতে এসেছি।”
“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার কথার কোন জবাব না দিয়ে থাকলে আমিও তোমার কথার কোন জবাব দিতে পারি না।” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– আবু সুফিয়ান। তুমি শোননি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-আল্লাহর প্রেরিত রাসূল! তুমি আল্লাহ্র রাসূলের এ আহবানও শোননি যে, আল্লাহ্ এক। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই?… তুমি শুনে থাকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুশমন হলে কেন?”
“তুমি আমাকে কোন সাহায্য করবে না আবু বকর?” আবু সুফিয়ানের কণ্ঠে বিনয়ের সুর।
“না।” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর দৃঢ় কণ্ঠ– “আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হুকুমের তাবেদার।
আবু সুফিয়ান হতাশ হয়ে মাথা নিচু করে চলে যায়। এবং হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঠিকানা সংগ্রহ করে তার সামনে গিয়ে বসে।
“ইসলামের শীর্ষ দুশমনকে মদীনায় দেখে আমি হতবাক।” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলেন– “আল্লাহর কসম! তুমি ইসলাম গ্রহণ করে আসনি।”
আবু সুফিয়ান মদীনায় আগমনের উদ্দেশ্য হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে খুলে বলে এবং তাকে এটাও জানায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কথা পর্যন্ত বলেননি এবং হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে কোন প্রকার সহযোগিতা করেননি।
“আমার অধীনে পিপিলিকার ন্যায় দুর্বল সৈন্য থাকলেও তবুও আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “তুমি আমার একার নও; আমার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমার ধর্মের শত্রু। আমার পদক্ষেপও তাই হবে যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেন।”
আবু সুফিয়ান হযরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা এবং হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাক্ষাৎ করেও কারো করুনা ভিক্ষা পায়না। সে ব্যর্থ-হতাশ হয়ে মদীনা ত্যাগ করে। তার ঘোড়ার গতি ছিল শ্লথ। ঘোড়ার মস্তকও ছিল অবনত।
আবু সুফিয়ান চলে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক হারে সৈন্য সমাবেশের নির্দেশ দেন। তিনি আরও বলেন, এত বিশাল পরিসরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও, যেন কুরাইশরা চিরকাল আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তারা যেন মাথা তুলে দাড়াতে না পারে। তিনি আরো নির্দেশ দেন, সৈন্যরা অতি দ্রুত ক্ষিপ্রতার সাথে যাবে এবং সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে যাতে তাদের অগোচরেই মক্কা ঘিরে ফেলা যায় অথবা মক্কার নিকটে এত দ্রুত পৌঁছে যেতে হবে, যাতে কুরাইশরা সাহায্যের জন্য তাদের মিত্রগোত্রকে আহবানের সুযোগ না পায়।
♣♣♣
মদীনাবাসীরা রাতের বিছানা ছেড়ে দেয়। তীর-বর্শা তৈরীতে সবাই ব্যস্ত। ঘোড়া, উটও প্রস্তুত করা হয়। পুরনো তলোয়ারে শান এবং নতুন তলোয়ার তৈরীর ধুম পড়ে যায়। নারী-শিশুও প্রস্তুত হয়। সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং প্রস্তুতির চালচিত্র সরেজমিনে দেখার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ ছুটোছুটি করতে থাকেন।
মদীনার ঘরে ঘরে যুদ্ধ প্রস্তুতি চললেও একটি মাত্র ঘরে ভিন্ন প্রকৃতির প্রস্তুতি চলছিল। এই ঘরটি অমুসলিমের। একজন মেহমান সেখানে এসেছিল। ঘরে লোকজন বলতে এক বৃদ্ধ, এবং আধা বয়সী এক পুরুষ, এক যুবতী, আধা বয়স্কা এক মহিলা এবং দু’তিনটি শিশু ছিল।
‘আমি মুসলমানদের মনোভাব বুঝে এসেছি।” আগন্তুক বলে– “তাদের অভিপ্রায় অগোচরে মক্কা ঘেরাও করা। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ যুদ্ধ-বিদ্যায় পাকা। সে যা বলেছে তা বাস্তবে পরিণত করে দেখাবে।”
বৃদ্ধ চোখ কপালে তুলে জানতে চায় তা আমরা কি করতে পারি?”
আগন্তক বলে– “জনাব আমরা কিছু না পারলেও অন্তত মক্কাবাসীকে তো সাবধান করতে পারি। তাদেরকে এই পরামর্শ দিয়ে উপকার করতে পারি যে, প্রস্তুতি নাও। এতে মুসলিম বাহিনী মক্কায় পৌঁছলেও তাদের শক্তি কমে যাবে, ভাটা পড়বে আবেগে।
“আমার উপাস্যের কসম!” বৃদ্ধ আবেগময় কণ্ঠে বলে– বুদ্ধিমান। ইহুদীবাদের সত্য পূজারী। খোদা তোমাকে যথেষ্ট বিচক্ষণতা দান করেছেন। তুমি কি নিজে মক্কা যেতে পার না?”
আগন্তুক বলে– “না” মুসলমানরা এখন যে-কোন অমুসলিমকে সন্দেহ করছে। আমি ইহুদী এ কথা তারা জানে আমি গেলে তারা সন্দেহ করবে।… তখন আমার জীবন নিয়ে টানাটানি দেখা দেবে। অথচ আমার বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে। মুসলমানরা যাদের হত্যা করেছে আমাকে ঐ ইহুদীদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে। আমার শিরা-উপশিরায় বনু কুরাইযার রক্ত বহমান। মুসলমানদেরকে টার্গেট করা আমার ফরজ। এই ফরজ পালনে নাকাম হলে খোদা আমাকে ঐ কুকুরের ন্যায় মৃত্যু দিবেন যার সমস্ত শরীরে দগদগে ঘা এবং বিষাক্ত। প্রতিশোধ অত্যন্ত গোপনে নিতে চাই। ধরা পড়তে চাই না। মুসলমানদেরকে মরণ কামড় এবং বিষাক্ত দংশনের জন্য আমার বাঁচার প্রয়োজন আছে।”
